কিলার মিলার আর ‘চাচা’ ইফতিখার

২০১৩ সালের ৬ মে। আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের লড়াই। ১৯১ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ৬৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে পাঞ্জাব শিবিরে তখন হারের ঘোর শঙ্কা। এই অবস্থা থেকে কেউ ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন, হয়তো ভাবেননি পাঞ্জাবের কেউই। সেই অবিশ্বাস্য কাজটি করে দেখিয়েছিলেন ডেভিড মিলার। পাঁচ নম্বরে নেমে তুলেছিলেন ঝড়। বেঙ্গালুরুর বোলারদের ওপর তাণ্ডব চালিয়ে ৩৮ বলে অপরাজিত ১০১ রানের ইনিংসে পাঞ্জাবকে এনে দিয়েছিলেন ৬ উইকেটের জয়। মোহালিতে ওই দিন মিলারের খুনে ব্যাটিং দেখে গ্যালারির একপাশে কয়েকজন দর্শক প্ল্যাকার্ডে লিখেছিলেন ‘কিলার মিলার।’ জায়ান্ট স্ক্রিনে সেটা দেখানোর পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার এই বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানকে এই নামেই চেনে বিশ্ব ক্রিকেট। নামটির যথার্থতা প্রমাণ করে যাচ্ছেন তিনি এখনো।

তিন বছর বয়সে গলফ স্টিক দিয়ে খেলা মিলারের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে অভিষেক হয়ে যায় ১৪ বছর বয়সে। সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়ে ২০১০ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক আঙিনায় পা রাখেন মিলার টি-টোয়েন্টি দিয়ে। দুদিন পর ওয়ানডে অভিষেকও হয়ে যায়। নিজের চতুর্থ ওয়ানডেতে ৩১ বলে করেন ৫১ রান। এই সংস্করণে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেতে ৫ বছর অপেক্ষা করতে হয় তাকে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওই ইনিংসে অবশ্য দেখা যায়নি মিলারের বিধ্বংসী রূপ, করেন ১৩৩ বলে ১৩০। পরের মাসে ওয়ানডে বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জ্বলে ওঠেন তিনি আপন মহিমায়। ৯২ বলে খেলেন ১৩৮ রানের বিস্ফোরক ইনিংস।

প্রতিপক্ষের বোলারদের গুঁড়িয়ে দেওয়ার মনোভাব নিয়ে ক্রিজে যান মিলার। বিশাল বিশাল ছক্কা মারার জন্য পরিচিত বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের ওয়ানডেতে দ্রুততম সেঞ্চুরি ৬৯ বলে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে করা তার ৩৫ বলের সেঞ্চুরি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় দ্রুততম। ওই ম্যাচে মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের এক ওভারে টানা পাঁচ ছক্কা মেরেছিলেন মিলার। এসব ইনিংসেই প্রমাণ মেলে কতটা ভয়ংকর ৩৪ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।

আইপিএল খেলার সুবাদে ভারতের কন্ডিশন সম্পর্কে বেশ ভালো অভিজ্ঞতা আছে মিলারের। আর ক্যারিয়ারে তৃতীয় বিশ্বকাপে খেলছেন মিডল অর্ডার এই ব্যাটসম্যান। বিশ্বমঞ্চে কীভাবে খেলতে হয় জানা তার। বৈশ্বিক আসরে ১৯ ম্যাচে এক সেঞ্চুরিতে করেছেন ৫৯৮ রান। পাকিস্তানের বিপক্ষে পারফরম্যান্স খুব একটা আহামরি নয় মিলারের। ২৪ ওয়ানডেতে রান কেবল ৫০৭, ফিফটি আছে চারটি। তবে ওই যে অভিজ্ঞতা, সেটা কাজে লাগিয়ে যেকোনো সময় নিজেকে মেলে ধরতে পারেন তিনি। প্রতিপক্ষকে দিতে পারেন বিভীষিকাময় দিনের স্বাদ।

১৬৫ ওয়ানডে খেলা মিলারের মতো অতটা অভিজ্ঞ নন ইফতিখার আহমেদ। এখন পর্যন্ত খেলেছেন কেবল ২৪ ওয়ানডে। তবে যেকোনো সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন তিনি একাই। বাঁহাতি মিলারের মতোই বিধ্বংসী এই পাকিস্তানি। ওয়ানডেতে দুজনের স্ট্রাইক রেটও প্রায় কাছাকাছি, মিলারের ১০৪ ও ইফতিখারের ১০৯। আহত পাকিস্তানের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ইফতিখার হবেন বড় অস্ত্র। তার কাছ থেকে আগ্রাসী বড় ইনিংসের আশায় আছে দলও। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪০ বলে তিন অঙ্ক ছুঁয়ে বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন ম্যাক্সওয়েল।

২০১৫ সালে ওয়ানডে অভিষেক হলেও কেবল দুই ম্যাচ খেলে বাদ পড়েন তিনি। পরে ২০১৯ সালে ফের দলে ডাক পান মিডল অর্ডার এই ব্যাটসম্যান। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে দ্রুত রান এনে দেওয়ার সামর্থ্যরে জন্যই তাকে যোগ করা হয় দলে। সঙ্গে অফ স্পিনে বল হাতেও ভূমিকা রাখতে পারেন ৩৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। যদিও নিজের অভিষেক বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত কিছু করতে পারেননি তিনি। পাকিস্তানের হয়ে পাঁচটি ম্যাচেই একাদশে ছিলেন। যেখানে দুইবার তিনবার যেতে পেরেছেন দুই অঙ্কে, সর্বোচ্চ আফগানিস্তানের বিপক্ষে হেরে যাওয়া ম্যাচের ৪০ রান।

বিশ্বমঞ্চে জ্বলে উঠতে না পারলেও চলতি বছরে সব মিলিয়ে ওয়ানডেতে ভালোই পারফরম্যান্স তার। ১৪ ম্যাচে ৪৯.৮৮ গড় ও ১১৯ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ৪৪৯ রান। ক্যারিয়ারের একমাত্র সেঞ্চুরিটি এই সময়ে পেয়েছেন তিনি, নেপালের বিপক্ষে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩ টি-টোয়েন্টি খেললেও ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা হয়নি তার। নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে তাই পড়তে হবে এই পাকিস্তানিকে। তবে তার যে ব্যাটিং সামর্থ্য, যেকোনো বোলিং লাইন আপকে এলোমেলো করে দিতে পারেন তিনি।

ইফতিখারের ক্রিকেট মস্তিষ্কও ক্ষুরধার। এই জন্য তো পাকিস্তান দলে ‘চাচা-এ-ক্রিকেট’ নামে ডাকা হয় তাকে। ক্রিকেট বিশ্বেও ‘চাচা’ নামে পরিচিত তিনি। নামটি উপভোগও করেন ইফতিখার। নতুন নাম নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন তিনি এভাবে, ‘আমি এখন নামটি উপভোগ করছি। ব্র্যান্ড হয় না? মানুষ কোটি কোটি টাকা ঢালে তাতে। আমিও অমন একটা ব্র্যান্ড হয়ে গেছি।’ টানা তিন ম্যাচ হেরে খাদের কিনারে থাকা পাকিস্তানের কক্ষপথে ফিরতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারেন ‘চাচা’, সেটা দেখা যাবে চেন্নাইয়ে আজ।

ডেভিড মিলার-ব্যাটসম্যান

এক যুগের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ১৬৫ ম্যাচ খেলে করেছেন ২২৮ রান। ৫ সেঞ্চুরি পাশে ফিফটি ২৩টি। ব্যাটিং গড় ৪২.৭০ ও স্ট্রাইক রেট ১০৪। খেলছেন তৃতীয় বিশ্বকাপে।

ইফতিখার আহমেদ-ব্যাটসম্যান

৮ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ২৪ ম্যাচ খেলে করেছেন ৫৭৩ রান। সেঞ্চুরি ও ফিফটি একটি করে। ব্যাটিং গড় ৪০.৯২ ও স্ট্রাইক রেট ১০৯.১৪। প্রথমবার খেলছেন বিশ্বকাপে।