রাজনীতিতে উত্তাল হাওয়া বইছে। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলোর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং সরকারের কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক ময়দানে ঝড় বইছে। যদিও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগে এসব ঝড় নতুন কিছু না। তবে এবারের পরিস্থিতিতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। এবার দেশীয় রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক মহলের তদারকি বিরোধী দলের আন্দোলনে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এ কারণে আজ ২৮ অক্টোবর বিরোধী দলগুলোর বড় ধরনের কর্মসূচিকে ঘিরে কিছুটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এই উদ্বেগের কারণ শুধু বিএনপি নয়, আজ রাজধানীতে সমাবেশ করবে বর্তমান সরকারের দল আওয়ামী লীগও। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী, হেফাজত এবং বিরোধী দলের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা ছোট ছোট দলগুলোও থাকছে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে। অর্থাৎ আজ ঢাকা শহর হয়ে উঠবে বড় রাজনীতির ময়দান। কিন্তু রাজনীতির মাঠে যে যার প্ল্যাটফরম থেকে কর্মসূচি পালন করবে, তাতে সমস্যা কোথায়?
বিএনপি বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সামনে রেখে আন্দোলন করছে। এরই মধ্যে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। কিছু কর্মসূচি সরকারের বাধায় প-ও হয়েছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে বড় সমাবেশ করতে চেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু দলের মহাসচিবসহ শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে আগের দিন গ্রেপ্তার ও নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশে বাধা দেয় সরকার। ওই বাধার একটা কারণ দেখিয়ে ছিল তারা। সরকারি দলের নেতারা ধারণা করছিলেন, বিএনপি ওই কর্মসূচির মাধ্যমে ‘বসে পড়বে’। এবারও ২৮ অক্টোবর কর্মসূচি ঘোষণার পর ‘বসে পড়া’ শব্দটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয়দের মুখে। যদিও বিএনপি পক্ষ থেকে বারবার আশ^স্ত করা হচ্ছে যে, তারা বসে পড়বে না। এই বসে পড়ার শঙ্কায় আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও। কারণ বিএনপি যদি বসে পড়ে তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। কিন্তু এই বসে পড়ার ভয়টা আসলে কী?
২০১৩ সালের ৫ মে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম সারা দেশ থেকে ঢাকামুখী লংমার্চ করে এবং রাজধানীর শাপলা চত্বরে তাদের প্রথম সমাবেশ হয়। এটা কোনো রাজনৈতিক সংগঠন না হলেও সমাবেশ করার অনুমতি পেয়েছিল সংগঠনটি। কিন্তু সরকার কেন, হয়তো কেউই ধারণা করতে পারেনি এই সংগঠনটি এত সমর্থকের সমাগম ঘটাতে পারবে। ওই দিন হেফাজতের কর্মীরা শাপলা চত্বরে বসে পড়েছিল। তাদের ১৩ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত উঠবে না জানিয়েছিল। দিনভর দেন দরবার শেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপে, ৬ মে ভোরে তাদের শাপলা চত্বর ছাড়তে বাধ্য করেছিল। ওই বসে পড়া কর্মসূচিটি ছিল সত্যিই অভিনব। তখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় বর্তমান সরকার ছিল। হয়তো ওই বসে পড়ার ট্রমা থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে পারেনি। এ কারণে বিরোধী দলের বড় কোনো কর্মসূচিতে সরকারের বসে পড়ার ভয় তাড়া করে। অবশ্য বিএনপি যদি বসে পড়ে, তবে কিছুটা শঙ্কা থেকেই যায়। কারণ হেফাজতকে বসে পড়া থেকে উঠাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে পদ্ধতি বা যতটুকু কঠোর হয়েছিল, বিএনপির সঙ্গে ততটা কঠোর হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হবে। তা ছাড়া নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিরোধী দলের সঙ্গে ততটা কঠোর হওয়া যায়ও না। এ কারণে বোধ করি আওয়ামী লীগের নেতারা ২৮ অক্টোবর কর্মসূচিতে বিএনপির বসে পড়ার শঙ্কায় ভুগছেন।
আসলে ২৮ অক্টোবর তারিখটির ছোট ইতিহাস আছে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ছিল বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন। সংবিধান অনুসারে তৎকালীন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান হওয়ার কথা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট তখন তুমুল আন্দোলন করছে, যাতে কেএম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিতে না পারেন। এমন অবস্থায় ২৮ অক্টোবর ঢাকায় সমাবেশের ঘোষণা দেয় জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। পল্টন ময়দানে সমাবেশের ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এবং জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশের ঘোষণা দেয়। পল্টন ময়দানে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল শ্রমিক দলও। আশঙ্কা করা হচ্ছিল, বড় ধরনের সংঘাতের। সংঘাতের আশঙ্কায় পল্টন ময়দান এবং আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ঢাকায় প্রায় ১৫ হাজারের মতো পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। আশঙ্কা ফলে যায়। সেদিন বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছিল। ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে অস্ত্র তুলে গুলি এবং মানুষ পিটিয়ে মারার মতো ঘটনা গভীর আলোড়ন তৈরি করেছিল। রাজনৈতিক সংঘাতে সারা দেশে ১১ জনের মতো নিহতের ঘটনাও ঘটে। সেদিন পল্টন-বায়তুল মোকাররম এলাকায় জামায়াতে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সকাল থেকেই বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে শুরু করে পল্টন এবং তোপখানা মোড়ে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও ছিল। যদিও তাদের সংখ্যা ছিল আওয়ামী লীগের তুলনায় নগণ্য। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ছিল তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। উভয়পক্ষই তখন বেশ মারমুখী অবস্থানে ছিল। যে কোনো সময় সংঘাত শুরুর আশঙ্কা ছিল সকাল থেকেই। জামায়াতে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগের কর্মীরা পরস্পরকে হটিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে।
আওয়ামী লীগ সমাবেশ করার জন্য পল্টন ময়দান দখল নিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশ বেধড়ক লাঠিপেটা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। আওয়ামী লীগ কর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ইট ছোড়ে। এ সময় ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণের আওয়াজে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘাত চলে। সংঘর্ষ সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করে দুপুর বারোটা থেকে দুইটা পর্যন্ত। আওয়ামী লীগ কর্মীরা দৈনিক বাংলার দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে সংঘর্ষ শুরু হয় জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের সঙ্গে। এ সময় একের পর এক বিস্ফোরণ হতে থাকে। পুরো এলাকায় তখন এমন অবস্থার তৈরি হয়েছিল যে, ককটেল এবং গুলি কোন দিক থেকে আসছে সেটি বোঝা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ ব্যাপক টিয়ার শেল এবং রাবার বুলেট ছুড়েছিল। এ সময় ইটের আঘাতে এক ব্যক্তি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে চারপাশ ঘিরে স্লোগান দিতে থাকে। তখনই ধারণা করা হচ্ছিল যে, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঘটনা পরিক্রমায় দেখা যায়, ওই দিনও মাঠে ছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও তাদের জোট সমর্থিত দলের নেতাকর্মীরা। এবারও মাঠে তারাই। পার্থক্য শুধু তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। যাদের দোসর ছিল জামায়াতে ইসলামী। এবার ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। আর আন্দোলনের মাঠে বিএনপি। ফলে শঙ্কা থেকেই যায় বড় কিছু ঘটার। তবে আশার বিষয় হলো, এবার বিরোধী দলের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বার্তমান পরিস্থিতির কিছুটা ভিন্নতাও রয়েছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের ইচ্ছা থাকলে যে সেটা সম্ভব, সেটা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কিছুদিন আগেই প্রমাণ দিয়েছে। গত জুলাইয়ে দুই দল মাত্র দেড় কিলোমিটার ব্যবধানে নয়াপল্টন ও গুলিস্তানে সমাবেশ করেছে। সেখানে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। এ ছাড়া গত প্রায় এক বছর ধরে বিএনপির সমাবেশের দিন আওয়ামী লীগ পাল্টা শান্তি সমাবেশ করছে। কিন্তু সহিংস কোনো ঘটনা ঘটেনি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা হয়, তবে বলা যায়, আজকের সমাবেশেও কোনো সহিংস ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম। এর আরও একটি কারণ থাকতে পারে যে, এবারের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য বিদেশি তৎপরতা ব্যাপকহারে রয়েছে। অন্তত এ কারণে হলেও দুদলই শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে চাইবে। তা ছাড়া আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এ মুহূর্তে সংঘাতে যেতে চাইবে না কোনো দলই। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এবারের কর্মসূচি দাবি আদায়ের মহাযাত্রা। বিএনপি এও বলছে, দাবি আদায় না করে তারা ঘরে ফিরবে না। যেটা ক্ষমতাসীনদের ভাবনায় ফেলেছে। বিএনপি আবার এটাও বলেছে, তারা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার পক্ষে। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি দাবি আদায়ের জন্য শান্তির পক্ষে থাকবে না সংঘাতের পথে যাবে।
আজকের দিনটি ঘিরে জনমনে রয়েছে অনেক শঙ্কা। কী হবে আজ? অতীতের মতো সহিংসতার ঘটান ঘটবে, না শান্তিপূর্ণ হবে। রাজনৈতিক সংঘাত মানেই তো বোমাবাজি, যানবাহন ভাঙচুর, আগুন, পথে পথে বাধা। এবারও কি এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে? বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক বৈরিতা সংঘাতের মধ্যেই শেষ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেটা কাম্য নয়। বর্তমানে আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক বৈরিতা চলছে তার শান্তিপূর্ণ সমাধানে দুদলের কাছেই আছে। এখনো সময় আছে, আলোচনার মাধ্যমে বৈরিতা দূর করার। আমরাও চাই মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট জনগণ আর রাজনৈতিক জাঁতাকলে পিষ্ট হবে না।
লেখক: সাংবাদিক
zakpol74@gmail.com