কচুরিপানা দুই বোন

দুটি কচুরিপানা। জোড়বেঁধে থাকে। জোড়বেঁধে ভাসে। ছোট্ট মোট্ট একটা বিল। তাতেই থাকে ওরা। বড় আরামে থাকে! বড় কচুরিপানাটি ছোট কচুরিপানাকে বলে, ‘তুই হলি আমার আদরের ছোটবোন!’ এই বলে চুমো খায় কপালে। আবার খায় গালে। ছোট কচুরিপানাও কম যায় না। বড় কচুরিপানার গায়ে মুখ ঘষে বলে, ‘আর তুমি হলে আমার বড়বোন। একদম মায়ের মতো গো!’

এমনি কত কথাই না বলে দুই বোন। আশপাশে কলমি লতা, পাতাঝাজির ঝোপ। তাতে মাছেদের ঘরদোর। সবাই মন লাগিয়ে শুনে ওদের কথা। শুনে ভারি খুশি হয়। হবে না, সবার সঙ্গেই যে কচুরিপানা দুটির বেশ ভাব!

তবে শামুকদাদির সঙ্গে ভাবটা একটু বেশিই। কচুরিপানা দুটি যেখানে ভাসে, তার নিচেই শামুকদাদির ঘর। প্রতিদিন সকাল হলেই হয়! শামুকদাদি তুরতুর করে সাঁতরে বের হয়। চলে আসে কচুরিপানাদের কাছে। বলে, ‘ও নাতনিরা, চলে এলাম তোদের দেখতে!’ শামুকদাদিকে পেয়ে কচুরিপানারাও ভীষণ খুশি হয়। তিনজনে আলাপ জমে। এভাবেই দিন যায়। রাত যায়। সময় যায় তরতর করে।

এক দিনের কথা। ভারি এক কান্ড ঘটে গেল সেদিন! তপসে মাছ গুগলি খুঁটছিল। হঠাৎ বুকখানা ঠেকে গেল কাদায়। তপসে হৈচৈ জুড়ে দিল, ‘ওমা! পানি যে কমে এলো! এখুনি আমি নতুন পুকুর খুঁজতে যাচ্ছি!’ লেজের এক ঝাঁকি দিয়ে চলে গেল তপসে।

দুদিন বাদে আবার এক কান্ড! এবার শামুকদাদির পিঠ বেরিয়ে পড়ল জলের উপরে। সেও বোচকা বেঁধে চলল নতুন পুকুরের খোঁজে। যাওয়ার বেলায় বলল, ‘ও কচুরিপানা। তোরা হলি  আমার নাতনি। তোদের ছেড়ে কী করে যাই, বল তো! আয় বাপু আমার সঙ্গে। বড় একটা পুকুরে গিয়ে ডেরা বাঁধি।’

কচুরিপানা দুটি কুকড়ি-মুকড়ি করে বলল, ‘তা যাও না দাদি। দুদিন বাদে আমরাও আসছি। দেখো না, এখনো কেমন দিব্যি ভেসে আছি! আর দেখো, বিলে কী হাওয়া। কী রোদের ঝিলিক! কী ঝিলিমিলি চাঁদের হাসি!

দাদি বলল, ‘এসব নিয়ে পড়ে থাকলে বুঝি চলে। পানি কমতে আর কদ্দুর, বল! পুকুরে না হয় আলো বাতাস একটু কমই আছে। তাই বলে এখানেই থেকে যাবি। কখন পানি শুকিয়ে কাদার সর পড়ে যাবে তার ঠিক নেই। শেকড় বাকড় গেঁথে যাবে কাদার থলিতে। তার চেয়ে বাপু ভালোই ভালোই চলে আয় আমার সঙ্গে।’

কচুরিপানা দুটি দাদির কথা শুনেও না শোনার ভান করে। ‘কী যে বলে না দাদি! বুড়ো মানুষ তো! খালি কথা বলে।’ ছোট কচুরিপানা বড় কচুরিপানার গায়ে ঢলে পড়ে বলল।

শামুকদাদি ঠাঁই বসে রইল দুদিন। বসে থাকতে থাকতে গায়ে ভারি ম্যাজম্যাজ করতে লাগল। শেষে বিড়বিড় করে চলে গেল সে। যাওয়ার বেলায় বলে গেল, ‘ও নাতিরা! চলে আসিস রে জলদি জলদি। কখন কী হয়!’

সেই থেকে কচুরিপানা দুটি আছে এখানেই। সবাই বিল ছেড়ে চলে গেছে। নেই ভিড়ভাট্টা। বড় ভালো লাগে এখন। সারাদিন ছোট ছোট বাচ্চা মেঘেদের সঙ্গে খেলে ওরা। কত খুনশুটি করে। হাসে খিলখিল। আর বলে, ‘কী বোকা সব! হুড়মুড়িয়ে চলে গেল। ছি! ছি! ছি!’

এক দিন পানির টান পড়ল সুতার মতো করে। বাপরে! পানির কী ঢল। যেন নানুবাড়ি যাবে! এমন দৌড়াতে শুরু করল না! বড় কচুরিপানা বলল, ‘না ভাই! এবার বুঝি যেতেই হয়’!

ছোট বলল, ‘আরে, অত ভয় পেও না তো। তুমিও দেখি সবার মতো! আর একটা দিন থাকি না হয়। কোন পুকুরের তলায় গিয়ে ঢুকব রে বাবা! তার কি ঠিকঠিকানা আছে!’ বড় কচুরিপানার মন দোনোমোনো করল। তবে থাকল সে ছোট কচুরিপাতার কথা শুনে।

পরদিন। ঘুম ভেঙেই কচুরিপানাদের কেমন গা ঘিন ঘিন করে উঠল। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখল, পুরো এক তাল কাদায় ডুবে আছে দুজন। তুকতুকে কাদা উঠে গিয়েছে পাতা পর্যন্ত!

‘কী হবে এখন?’ আঁতকে উঠে বলল ছোট কচুরিপানা।

‘বলেছিলাম তো! শামুকদাদিও বলেছিল!’ খানিকটা রাগ করেই বলল বড় কচুরিপানা। তারপর দুজনের সেকি কান্না। সারা দিন ভরে কাঁদল ওরা। কেঁদেই গেল।

বিকেল বেলায় ভয়ে ভয়ে দুজনেই তাকাল আকাশের দিকে। বৃষ্টি পেলে একবার বেশ হতো। পানির ঢল ছুটত। কচুরিপানারাও কাদা থেকে উঠে চলে যেতে পারত যেখানে ইচ্ছা সেখানে।

ওদিকে মেঘমায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে যাবে নানুর বাড়ি। বাক্স প্যাটরা বেঁধেছেদে রওনা দিয়েছে। বাচ্চামেঘেরা তাই দারুণ খুশি। ওদের কাজ শেষ হয়েছে। বৃষ্টি ঝরিয়েছে এতদিন। এবার ওরা জিরোবে। ঘুমাবে মনটি ভরে!

যাওয়ার বেলায় বুড়ো মেঘটির চোখ পড়ল কচুরিপানা দুটোর ওপর। দেখে ভারি আফসোস করে বলল, ‘কী আর করা! সময় পেয়েও গেলি না বাছারা! এখন তোরাও আমাদের মতো লম্বা একটা ঘুম দে!’

বড় কচুরিপানা কেঁদেকেটে বলল, ‘আবার কবে আসবে গো তোমরা?’

‘সে বেশ দেরি হবে। খরা কাটবে। ফসল হবে। তারপর না আবার বান ডাকবে। বান ডাকার সময় হলে আমরা আবার আসব। ততদিনে তোরা খরা পেয়ে বেশ শক্ত পোক্ত হবি! বল হবে গায়ে। আর বুঝবি, শুধু আরাম আয়েশ করলেই চলে না। কষ্টও সইতে হয় সমানতালে!’

‘ঠিক বলেছ মেঘদাদি! এই তোমাদের আশায় রইলাম কিন্তু। ক’মাস পর এসো জলদি করে।’ বুড়িমেঘ ফুলো গাল আর মাথা নাড়াল। সায় দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, ঘুমা তোরা। জলদিই আসব।’

কচুরিপানা দুটিও ঘুমানোর তোড়জোড় লাগাল। কাদায় শেকড় গেড়ে, মাথা ছেঁটে খাসা বিছানা পাতল। ততক্ষণে মেঘের ছেলেপুলে, বউঝিরা মস্ত গাড়িতে জুতে গুড়গুড়িয়ে চলছে বাপের বাড়ি। যাওয়ার আগে মেঘশিশুরা তাদের এতদিনের খেলার সাথি কচুরিপানাদের ভুলল না। হাত নেড়ে বিদায় জানাল, টা টা বাই বাই! আবার দেখা হবে!’