স্বপ্ন এখন সত্যি। দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর তলদেশে টানেল তৈরির শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট এখন বাংলাদেশের মাথায়। আজই বহু আকাক্সিক্ষত টানেল যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে দেশ। সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের উদ্বোধন করবেন। পদ্মা সেতুর পর বঙ্গবন্ধু টানেলই দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নয়ন সফলতার প্রধান স্মারক।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই টানেল একদিকে বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই টানেল দেশের পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ভারতের সেভেন সিস্টার্সের মধ্যে সংযোগ হিসেবে কাজ করবে। পদ্মা সেতু যেমন দেশের জিডিপিতে অবদান রাখছে, এই টানেলও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নিয়ে একের পর এক মেগা প্রকল্প উপহার দিয়ে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামকে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে গড়ে তুলতে কর্ণফুলীর দুই পাড়ের মধ্যে বিকল্প সংযোগের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করে এই টানেল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। টানেলকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারায় গড়ে উঠছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)। শিল্পায়নের ফলে এ অঞ্চলের লাখো মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে।
২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যৌথভাবে বঙ্গবন্ধু টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর প্রায় আড়াই বছর পর ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানেলের খননকাজের উদ্বোধন করেন। ওই সময় কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর। কিন্তু কাজের গতিতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় অতিমারি কভিড। এ সময় প্রকল্প পরিচালকসহ টানেলে কর্মরতদের অনেকে করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়েন। লকডাউনে প্রকল্প ছেড়ে চলে যান শ্রমিকরা। ফলে কাক্সিক্ষত গতিতে এগোয়নি কাজ। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়। বর্ধিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে আজ খুলে যাচ্ছে টানেলের দুয়ার।
শেখ হাসিনার ‘আনকনভেনশনাল ডিপ্লোমেসি’ : ভারত উপমহাদেশে নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত প্রথম টানেল নির্মাণের দাবিদার এখন বাংলাদেশ। আর এই কৃতিত্বের বড় অংশীদার চীন সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণে ঋণ সহায়তা দিয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। তবে, বিদেশি অর্থায়নের শুরুটা ছিল অনেক কঠিন, ছিল অনিশ্চয়তাও। অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতায় চীন সরকারকে টানেলে অর্থায়নে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর সেই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন সেতু মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। টানেলের দক্ষিণ টিউবের পূর্তকাজের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, “শুরুতে এই টানেল অর্থায়নে রাজি ছিল না চীন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কূটনৈতিকভাবে প্রচেষ্টার পরও রাজি হয়নি তারা। পরে সেখানে এক নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘আনকনভেনশনাল ডিপ্লোামেসি’র কারণে তা সম্ভব হয়েছে।”
ঘটনাবহুল সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, চীন প্রথমে কথা দিয়েছিল, তারা টানেল করে দেওয়ার জন্য সব ধরনের ঋণ ও সহায়তা দেবে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যান। চীনে যাওয়ার পর সব চুক্তিপত্র নিয়ে যেদিন সন্ধ্যায় বৈঠক হবে, তার আগের দিন রাতে জানানো হলো চীনা সরকার এই প্রকল্পে সহায়তা দিতে প্রস্তুত নন। এরপর রাত ১টা-২টা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে অনেক আলাপ-আলোচনার পর তারা রাজি হলেন। পরের দিন যখন ২টার সময় বৈঠক শুরু হলো, তখন প্রধানমন্ত্রী বলার পর চীন সরকারের তরফ থেকে অসম্মতি প্রকাশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকবার বলার পরেও তারা সম্মত হয়নি। পরে ডিনারের সময় প্রধানমন্ত্রী টানেলের বিষয়ে আবার কথা তোলেন।
গত বছর অবসর নেওয়া এই সচিব বলেন, চীন সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসেছে। যদি এভাবে ফিরিয়ে দেয় তাহলে ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলে বা মানুষের মধ্যে কী ধরনের মনোভাব তৈরি হতে পারে, সেটি উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের ভাষ্য, ‘প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আপনারাই আমাদের ইনভাইট করেছেন, আমরা আপনাদের কাছে চাইনি। তখন চীনা প্রাইম মিনিস্টার আমাদের ডাকলেন, আর সবাইকে ইন্সট্রাকশন দিলেন। ডাইনিং টেবিলেই চায়নিজ প্রাইম মিনিস্টার ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চায়নিজ কমার্স মিনিস্টার, ফাইন্যান্স মিনিস্টার এবং আমরা যখন আলোচনা শুরু করলাম, তখন প্রধানমন্ত্রীর কথায় চায়নিজ প্রাইম মিনিস্টার কনভিন্স হলেন। তখন তিনি ভোর ৪টায় একটি লেটনাইট ডিনার আহ্বান করলেন। যেখানে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথাও জানালেন। তখন প্রধানমন্ত্রী চায়নিজ প্রাইম মিনিস্টারকে বললেন, আপনার আসার দরকার নেই। আমার বড় স্যুইটে বড় ড্রইংরুম আছে, সেখানে বসেই চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলব। পরে রাত ১২টায় প্রধানমন্ত্রীর রুমে বসে চায়নিজ কমার্স মিনিস্টার ও আমরা চুক্তিটা স্বাক্ষর করেছি। আর এখানে আনকনভেনশনাল ডিপ্লোম্যাটিক এফোর্ট না থাকলে এটা কোনোভাবেই বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না।’
মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্বপ্নের বাস্তবায়ন : ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে ৪০ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এর মধ্যে তৃতীয় দফাতেই ছিল কর্ণফুলীতে টানেল নির্মাণের অঙ্গীকার।
২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যখন কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন এর বিরোধিতায় নেমেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। আন্দোলন করেছিলেন রাজপথে। দিয়েছিলেন হরতাল কর্মসূচি। ওই সময় খুঁটির ওপর সেতুর বিকল্প হিসেবে ঝুলন্ত সেতু কিংবা তলদেশে টানেল নির্মাণের দাবি তুলেছিলেন তিনি। তার আন্দোলন উপেক্ষা করেই ২০০৬ সালের ৮ আগস্ট এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে তৎকালীন সরকার।
এরপরই মূলত কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন আগে ২০০৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে কর্ণফুলীতে টানেল নির্মাণের অঙ্গীকার করেন।
২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানেলের খননকাজের উদ্বোধনকালে তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীর কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মরহুম এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী কর্ণফুলীতে টানেল নির্মাণের জন্য আন্দোলন করেছিলেন। আজ তিনি থাকলে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্বপ্ন আর শেখ হাসিনার অঙ্গীকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন আজকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল।
কী আছে টানেলে : বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ৯.৩৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩১৫ কিলোমিটার, সেতু ও ভায়াডাক্টের দৈর্ঘ্য ৭২৭ মিটার (আনোয়ারা প্রান্তে) ও সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার। এ ছাড়া ৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটারের টোলপ্লাজা, ৬টি আন্ডার পাস, ১২টি কালভার্ট বাংলো, ভিআইপি বাংলোসহ মোটেল মেস, কনভেনশন, সেন্টার, জাদুঘর, সুইমিংপুল, মসজিদ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ইত্যাদি রয়েছে এই প্রকল্পে।
কর্ণফুলী নদীর তলদেশের ৩২ দশমিক ৫ মিটার নিচে টানেল করা হয়েছে। এতে ৩৫ ফুট ব্যাসের দুটি টিউব রয়েছে। প্রতিটি টিউবের উচ্চতা ১৬ ফুট। দুই টিউবের মধ্যবর্তী ব্যবধান ১১ মিটার। দুই লেনের একটি টিউব দিয়ে গাড়ি যাবে এবং অন্য টিউব দিয়ে গাড়ি আসবে। দুই টিউবের মধ্যে পর্যাপ্ত খালি জায়গা রাখা হয়েছে। শহর প্রান্তে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের কাছে থাকবে টানেলের প্রবেশপথ এবং ওপারে কাফকো ও সিইউএফএলের মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে বের হবে। এরপর মূল সড়কে চাতুরী চৌমুহনী হয়ে কক্সবাজার।
প্রকল্প ব্যয় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক দিয়েছে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থায়ন বাংলাদেশ সরকারের।
দিনে চলবে ১৭ হাজার গাড়ি : প্রকল্প সূত্র জানায়, উদ্বোধনের পরদিন থেকেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে বঙ্গবন্ধু টানেল। ২০১৩ সালের এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানেল চালুর প্রথম বছরে ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারে। সে অনুযায়ী হিসাব করে দেখা যায়, প্রতিদিন ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি চলবে টানেলের ভেতর দিয়ে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই গাড়ির সংখ্যা ১ কোটি ৩৯ লাখে গিয়ে দাঁড়াবে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। এসব গাড়ির ৫১ শতাংশই থাকবে কনটেইনারবাহী ট্রেইলর, পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান। এ ছাড়া বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস, কারসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট গাড়ি টানেল দিয়ে চলাচল করবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
কোন গাড়িতে কত টোল : টানেল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চলাচলের জন্য টোল হার নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। গাড়িভেদে ২০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত টোল ধার্য করা হয়েছে। প্রাইভেট কার, জিপ ও পিকআপের টোল ২০০ টাকা করে। মাইক্রোবাসের জন্য দিতে হবে ২৫০ টাকা। ৩১ বা এর চেয়ে কম আসনের বাসের জন্য ৩০০ এবং ৩২ বা তার চেয়ে বেশি আসনের জন্য ৪০০ টাকা টোল দিতে হবে টানেলে। ৫ টনের ট্রাকে ৪০০, ৫ থেকে ৮ টনের ট্রাকে ৫০০ ও ৮ থেকে ১১ টনের ট্রাকে ৬০০ টাকা টোল দিতে হবে। ট্রেইলরের (চার এক্সেল) টোল রাখা হয়েছে ১০০০ টাকা।
প্রকল্প পরিচালক যা বললেন : ঐতিহাসিক এই টানেল তৈরির কাজে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ। একটি ইতিহাসের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার সুযোগকে নিজের অনেক বড় পাওয়া বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য অনেক বড় সাফল্য।’ টানেল নির্মাণে প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করোনার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা পুরোপুরি কাজ বন্ধ রাখিনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি।’