প্রায় সব সমাজে, সব পরিবারে যাদের নিয়ে থাকে শঙ্কা, সেই কিশোর-কিশোরী প্রজন্মকে বর্তমানে বলা হয় ‘জেনারেশন জেড’। এ প্রজন্মের মন ও বেদনা নিয়ে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
মানবজীবনের সব চেয়ে রহস্যাবৃত বয়স বলা যায় কিশোর আর তরুণ বয়সকে। এ বয়সের চাওয়াপাওয়া, মনের ভাষা অন্যকে বুঝিয়ে বলা যেন বড় দায়। আবার সমাজের অন্যরাও এ কিশোর-কিশোরীদের মুখ ও মনের ভাষা ঠিক বুঝে উঠতে ব্যর্থ হন। সদ্য কিশোর বয়স পার করা তরুণরা জীবনের মহাসমুদ্রে পড়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। এর ফলাফল হিসেবে অনেক বিপর্যয় তৈরি হয় সমাজে। আধুনিক বিশ্বে এই বয়সীদের বলা হচ্ছে ‘প্রজন্ম জেড’।
কারা তারা
যাদের বয়স বর্তমানে কমপক্ষে ২৬-১১ বছর অর্থাৎ ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যাদের জন্ম, বিশেষজ্ঞরা তাদের ‘জেনারেশন জেড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ প্রজন্মকে সহজ কথায় বলা হচ্ছে ইন্টারনেট প্রজন্ম। যারা জলবায়ু বিপর্যয়, করোনা মহামারী এবং তখনকার লকডাউন ও অর্থনৈতিক পতনের ভীতির ভেতর বসবাস করতে থাকা তরুণ।
এর আগের প্রজন্মগুলো হলো ‘বুমার্স’; যাদের জন্ম ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪-এর মধ্যে। এরপর রয়েছে ‘জেনারেশন এক্স’; যারা ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালে জন্ম নিয়েছে এবং তাদের পরে ‘জেনারেশন ওয়াই’ বা ‘মিলেনিয়ালস’; যারা ১৯৮০-এর পর ১৯৯০-এর মধ্যভাগ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে জন্ম নিয়েছে।
আর সবার শেষ যে প্রজন্মটি রয়েছে তারা এখনো শিশু। তাদের বলা হচ্ছে ‘জেনারেশন আলফা’।
‘জেনারেশন জেড’-এর একটি বড় অংশ এখনকার টিনএজার বা আমরা যাদের বলি কিশোর প্রজন্ম। এই কিশোর প্রজন্মের স্বভাব ও চরিত্র বুঝতে পারা জরুরি। কারণ যে কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য এ প্রজন্মটি হলো ভবিষ্যৎ। তাদের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয় আগামী। তাদের আগে যারা রয়েছে তারা সংসার ও আয়-রোজগারে ব্যস্ত। তাদের পরের জেনারেশনটি এখনো পৃথিবীকে বুঝতে শেখেনি। তবে এই প্রজন্ম ‘জেড’ বুঝতে শুরু করে দিয়েছে। তাদের সঙ্গে পৃথিবী যেভাবে আচরণ করবে, তারাও পৃথিবীকে তা প্রতিদান হিসেবে ফিরিয়ে দেবে।
টেলিভিশন থেকে ইন্টারনেট
‘বুমার্স’ প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল টেলিভিশন নিয়ে। তাদের জীবনধারা এবং বিশে^র সঙ্গে সংযোগ ঘটার উপায় ছিল রেডিও, টেলিভিশনসহ সংবাদমাধ্যম। এরপর জেনারেশন এক্স বড় হয় কম্পিউটার বিপ্লবের হাত ধরে। তারপরই আসে ইন্টারনেট বিস্ফোরণ।
এই অগ্রগতিতে প্রজন্ম ‘জেড’র জন্য যা অনন্য তা হলো, টেলিভিশন, সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত সবকিছু তাদের জীবনের অংশ। যেমন ২০০৭ সালে যখন আইফোন চালু হয়, তখন এ প্রজন্মের সবচেয়ে বয়স্কদের বয়স ছিল ১০। এরপর যত বয়স বাড়তে থাকে তারা তত যুক্ত হতে থাকে অন্যান্য প্রযুুক্তিসমৃদ্ধ যন্ত্র, ওয়াইফাই এবং দ্রুতগতির মোবাইল ফোন পরিষেবার সঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তাদের জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী হয়ে ওঠে। যার মাধ্যমে তারা অভিযোজিত হতে থাকে।
তারা মূলত কী করে
প্রজন্ম জেডকে মূলত বলা হয় ‘প্রথম প্রকৃত ডিজিটাল নাগরিক’। যারা মূলত কথা বলে অনলাইনে। তাদের চেনা যায় কেনাকাটা, আড্ডা, অনলাইনে বন্ধু তৈরি দিয়ে। এশিয়ায় এ প্রজন্ম প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ব্যয় করে মোবাইল ফোনে।
কোনো কিছু কেনাকাটা করার আগে তা পর্যালোচনা করাসহ যে কোনো ধরনের তথ্য খুঁজতে তারা ইন্টারনেটে ঢুঁ মারে। তারা ওয়েবসাইট, অ্যাপ এবং সামাজিক মাধ্যমের ভেতর বসবাস করতে থাকে। সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের সাজিয়ে তুলতে তারা বেশ যত্নশীল।
এরপর তাদের জীবনে যুক্ত হয়েছে ভিডিও-শেয়ারিং সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলো। যা তাদের আবেগ-অনুভূতির অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সংস্কৃতিকেও শাসন করছে এসব মাধ্যম। যেমন ‘টিকটক’ নিয়মিত ব্যবহারকারীর ৬০ শতাংশই এ প্রজন্মের। বিভিন্ন অ্যাপে বা অনলাইনে তারা গেম খেলা থেকে শুরু করে নিজেদের ভেতর সম্পর্ক গড়ে তোলে। সেখানে আবেগ-অনুভূতির খেলাও চলে, যা এ প্রজন্ম খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে থাকে।
এ প্রজন্ম সাধারণত রেস্টুরেন্টে খেতে বা বাইরের খাবার পছন্দ করে। দেশি বা স্থানীয় খাবারে তাদের সহজে আগ্রহ তৈরি হয় না। আবার সেসব খাবার অনলাইনে নানা কায়দায় উপস্থাপন করলে কখনো আগ্রহী হয় খেতে। তবে প্রায় প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে মিলে বাইরের খাবার খাওয়া তাদের জন্য আবশ্যিক। তাদের জনপ্রিয় খাবারগুলো ইন্ডিয়ান, জাপানিজ, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, রাশান কিংবা আমেরিকান হয়ে থাকে। রেস্টুরেন্ট ব্যবসাও এ সময় এত বেড়েছে যে, তা চোখ কপালে তুলে দেয়। ঢাকার প্রায় প্রতিটি রাস্তায় বাহারি রেস্টুরেন্ট। যাদের নাম, লোগো, অঙ্গসজ্জা খুবই আকর্ষণীয়। নতুন খাবারের স্বাদ গ্রহণ বা সময় কাটাতে রেস্টুরেন্ট তাদের ভরসা।
তাদের আলোচনার ভেতর চলে এসেছে বিভিন্ন দেশের সিনেমা এবং সিরিজও। আগের মতো শুধু বাংলা, হিন্দি বা হলিউডের সিনেমা নয় বরং কোরিয়ান, জাপানিজ, চায়নিজ, নেপালি, মালয়ালামসহ অন্যান্য ধারার সিনেমার দর্শক হিসেবে তারা খুব সক্রিয়।
বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাওয়া, বেড়াতে যাওয়ায়ও তাদের প্রবল আগ্রহ। এসব নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে। ঘুরে আসা এবং তা নিয়ে গল্প তাদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে। নিজের গল্প অন্য বন্ধুদের শোনাতে পারলে তারা খুব প্রাণবন্ত ভাবে নিজেদের।
স্বাস্থ্য সংকট
এ পর্যন্ত বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এ প্রজন্ম অনেক বেশি স্বাস্থ্য ও মানসিক সংকটে রয়েছে। যা অন্য সময়ের তুলনায় বেশি। এ প্রজন্ম এমনিতেই একাকিত্বে ভোগে। কারণ তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করার ফলে সামাজিকতা, পরিবার থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর মহামারী করোনা তাদের আরও নিঃসঙ্গ করে দেয়। বিঘ্ন ঘটে পড়াশোনায়ও। নিজেদের বন্ধুদের থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন থাকে প্রায় দুই বছর। এর ফল হিসেবে নিজেদের আরও একা ভাবতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত। যার প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে। কোথাও সাময়িক এবং কোথাও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। এসব পরিস্থিতিতে প্রজন্ম জেড নিজেদের আরও দুর্বল ভাবতে থাকে। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা শঙ্কায় পড়ে যায়।
মার্কিন বহুজাতিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বীমা কোম্পানি ‘সিগনা’র একটি স্বাস্থ্য জরিপে জানা যায়, জেড প্রজন্মের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। তাদের ২৩ শতাংশ জানাচ্ছে তারা ‘অনিয়ন্ত্রিত চাপ’ মোকাবিলা করছে, ৪৮ শতাংশ বলেছে যে, তারা অস্বস্তিবোধ করে নিজের কর্মজীবন নিয়ে।
আরেকটি জরিপ বলছে, ৭৪ শতাংশ ব্যবস্থাপক এবং ব্যবসায়ী নেতারা অভিযোগ করছেন, তারা অন্য প্রজন্মের তুলনায় ‘জেনারেশন জেড’র সঙ্গে কাজ করতে বেশি সমস্যা পড়েন। এ প্রজন্মের মধ্যে উদ্যম, উৎপাদনশীল থাকা এসব নিয়ে সমস্যা রয়েছে।
অন্য জরিপে জানা যায়, মিলেনিয়াম প্রজন্মের তুলনায় এ প্রজন্ম কর্মক্ষেত্রে নিজস্ব নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কাজের তুলনায় তারা নিজের নৈতিক অবস্থানের প্রতি বেশি দৃঢ় থাকে। এ ছাড়া বেতন বৃদ্ধি, উন্নতি এসব ঠিকমতো হবে কিনা তা নিয়ে জেড প্রজন্ম বেশি উদ্বিগ্ন থাকে অন্যদের তুলনায়।
জরিপ প্রতিষ্ঠান হাইবব-এর মানুষ ও সংস্কৃতিবিষয়ক পরিচালক অ্যানি রোজেনক্রানস বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে জেনারেশন জেড একটি অন অবস্থায় রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই কলেজে স্নাতক শেষ করে যখন কাজে যোগ দিতে যাবে তখন মহামারী করোনা চলছে। ফলে দেখা গেল তাদের বাড়িতে কাজ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য চ্যালেঞ্জ সামনে চলে আসে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।
রাজনীতি
এই কিশোর প্রজন্ম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানেই মুখোমুখি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্যার। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো অনেক ক্ষেত্রে পুরনো প্রজন্মের সামনে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। এমনিতেই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সুসংহত নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলিও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিতও হয়ে যায়। পুরনো ধ্যান-ধারণা বা সংস্কৃতিকে যেমন আঁকড়ে থাকতে পারে তারা, আবার তেমনি নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে পরিবার-সমাজে বিরোধের মুখোমুখি হতে হয়।
আবার রাজনৈতিকভাবে তারা অন্য সময়ের তুলনায় এখন আরও অনিশ্চিত। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রজন্মের সামনে রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে প্রবলভাবে হাজির ছিলেন। যেখানে মিলেনিয়াম প্রজন্ম দেখেছে ইরাক যুদ্ধ, তারা ভোট দিয়ে নির্বাচন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কালো প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। এসব ঘটনা মিলেনিয়াম প্রজন্মকে বড় পরিসরে ভাবতে শিখিয়েছে। আর জেনারেশন জেড এসে পেয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। যার রাজনীতি ছিল উগ্র। বিশ্বে এখন এই উগ্র রাজনীতিই ছড়িয়ে পড়ছে। এর বিপরীতে জেড প্রজন্মকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে নিজেরা মিলে। তারা সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে খুব বেশি কিছু পাওয়ার আশা করে না। ইন্টারনেটে নিজেরা যেসব তথ্য পায় তা বন্ধুরা মিলে যাচাই করে। সেখান থেকে কোনো একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায়। তবে স্বস্তি পায় না। সাহসও হয় না এসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার।
তারা বন্ধু চায়
দ্য গার্ডিয়ানে চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। যেখানে বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরী বলেছে, তারা বন্ধুত্ব চায়, শুধুই বন্ধুত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সিরিজ ও সিনেমায় যৌনতার বিনিময়ে যে সম্পর্ক দেখানো হয় তাতে তারা আগ্রহী নয়। বরং তারা শুধু বন্ধু হতে চায়। তাদের মতে, ওইসব সিনেমা বা সিরিজে অযথা যৌনতা দেখানো হয়। তারা সেটা চায় না। তারা চায় ‘প্লেটোনিক প্রেম’ বা বিশুদ্ধ ভালোবাসা।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, তাদের এই চাওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে। তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। তাদের চাহিদার কথাগুলো শুনতে হবে। যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বললে তারা যা খারাপ তা বাদ দেবে। তাদের ভেতর থেকে সৃষ্টিশীল কিছু খুঁজে বের করে সেগুলোকে প্রশ্রয় দিতে হবে। বন্ধুত্বের প্রতি তাদের যে ভালো লাগা, তাকে প্রাধান্য দিতে হবে।