লখনৌতে আজ ভারত-ইংল্যান্ড ম্যাচটা হতে পারত ফাইনাল বা সেমি-ফাইনালের ড্রেস রিহার্সেল। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড আর সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন ভারত মুখোমুখি ঐতিহাসিক শহরে। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল লখনৌ। আজ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক, সেই লখনৌতে তাই ভারত-ইংল্যান্ড লড়াইটা হতে পারত হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ।
কিন্তু বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের শোচনীয় পারফরম্যান্সে সেই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে লোড-শেডিং। ৫ ম্যাচের সব কয়টিতেই জিতে ভারত পয়েন্ট টেবিলে দ্বিতীয়, আর একটা ম্যাচ জিতলেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত বলা যায়। অন্যদিকে ৫ ম্যাচের ৪টিতেই হেরে গতবারের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড পয়েন্ট টেবিলে তলার দিক থেকে দ্বিতীয়, সেমিফাইনালে খেলার আশা নেই বললেই চলে।
ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন ইংল্যান্ডের সহকারী কোচ মার্কাস ট্রেসকোথিক। খেলোয়াড়ি জীবনে অবসাদে ভুগে সিরিজের মাঝপথেই ভারত থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার নজির গড়েছিলেন এই ব্যাটসম্যান। কালকের সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নবাণের পর তাকে নিয়ে ফের সেই ঝুঁকি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে! সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, এই ম্যাচটা ভারতের কাছে ‘ফ্রি-হিট’। ট্রেসকোথিক নানান ভাবে বোঝাতে চেয়েছেন এখনো এই ম্যাচটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমস্যা হচ্ছে ইংল্যান্ড বাকি সবগুলো ম্যাচ জিতলেও তাদের পক্ষে ১০ পয়েন্টের বেশি অর্জন করা সম্ভব নয়। আর পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষ দুই এর পয়েন্ট ১০, পরের দুই দলের পয়েন্ট ৮। কারও বাকি ৩ ম্যাচ, কারও ৪। চতুর্থ দল হয়েও সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন দেখতে হলে রান-রেট এবং অন্য দলগুলোর হারজিতের যে কঠিন গাণিতিক হিসাব, সেটা বাস্তবে মেলার সম্ভাবনা কম। যদিও ট্রেসকোথিক বলতে চাইছেন, ‘আমি জানি না কেন আপনারা ফ্রি হিট বলছেন, তবে ফ্রি-হিটেও কিন্তু ব্যবধান তৈরি হয়। আমাদের সামনে সুযোগ বিশ্বকাপের স্বাগতিক দলের সঙ্গে দারুণ একটা পরিবেশে খেলার। এরকম একটা সুযোগও যদি আপনার মনে উত্তেজনা তৈরি না করে, তাহলে ভালো। জেনে রাখবেন, এটা কিন্তু কিছু করে দেখাবারও সুযোগ।’
সমস্যা হচ্ছে, ইংল্যান্ড কিছুই করে দেখাতে পারছে না। একমাত্র বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটা জেতা বাদে বাকি ম্যাচগুলোতে ইংল্যান্ডের পারফরম্যান্স একদমই মানসম্মত নয়। ডাভিড মালানের বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি ছাড়া ভালো ইনিংস নেই। জনি বেয়ারস্টো ৫ ম্যাচে করেছেন ১২৭ রান, জস বাটলার করেছেন ৫ ম্যাচে ৯৫। উল্টোদিকে ভারতের শীর্ষ তিন ব্যাটসম্যান রীতিমতো রানের উৎসবে মেতে উঠছেন। ৫ ইনিংসে বিরাট কোহলির রান ৩৫৪, রোহিত শর্মার ২৩৩ আর লোকেশ রাহুলের ২১৩। এখানেই তো ব্যবধানটা স্পষ্ট। সংবাদ সম্মেলনে এসে রাহুল যথেষ্ট ভদ্রতা দেখিয়ে ইংল্যান্ডকে ‘বিমর্ষ’ হিসেবে মানতে চাইলেন না, ‘আমরা কোনো দলকে ওরকম (বিমর্ষ) মনে করি না। যে কোনো দল যে কোনো দিনে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে আসতে পারে। কোনো দলই ম্যাচ শুরুর সময় এগিয়ে থাকে না। আমরা যেভাবে খেলছি, যে প্রক্রিয়া মেনে খেলছি সেটা চলমান রাখা আর মনোযোগ ধরে রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ।’
লখনৌ শহরের আইপিএল দল সুপার জায়ান্টসের অধিনায়ক রাহুল। এই মাঠে খেলার সময়ই ফিল্ডিং করতে গিয়ে চোট পেয়েছিলেন, যা তাকে মাস পাঁচেকের জন্য মাঠের বাইরে ঠেলে দিয়েছিল। সেই স্মৃতি মনে করতে চান না রাহুল, সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিরক্ত হয়েই বলেছেন, ‘আমি সেটা ভুলে যেতে চাচ্ছি, আপনারা আমাকে বারবার সেটা মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছেন। আমার বেশ খারাপ লেগেছে, এই মাঠে আমার সবশেষ স্মৃতি সেই চোটের যেটা আমাকে ৪-৫ মাসের জন্য মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। যে চোট পায়, তার জন্য ফিরে আসাটা অনেক কঠিন। অনেক ধৈর্য আর পরিশ্রম দরকার হয়। গতকাল (শুক্রবার) যখন এই মাঠে এলাম তখনই মনে হয়েছিল এখানে সব শেষবার এসে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছিলাম। এবার আশা করি ভালো কোনো স্মৃতি নিয়েই ফিরব।’
সেই ভালো স্মৃতিটা হতে পারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়। ব্যাটিংটা ভালো হচ্ছে রাহুলের। উইকেটের পেছনেও দারুণ সব ক্যাচ ধরছেন। খেলা শেষে ড্রেসিংরুমে দলের সেরা ফিল্ডারের মেডেল নিতেও দেখা গেছে রাহুলকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা জয়ে যদি অবদান রাখতে পারেন, তাহলে নিঃসন্দেহে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়ার দৃশ্যের চেয়ে ভালো কোনো স্মৃতিই তাকে ফিরিয়ে আনবে লখনৌতে।