মহাসমাবেশ, সহিংসতা, মৃত্যু: একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ

‘আব্বা সবসময় বলতেন, তুই বেশি করে খাওয়া-দাওয়া কর। এই বছর গেলে তোকে বিদেশ পাঠাব। আমার আর বিদেশ যাওয়া হলো না। আব্বার কথা মনে হলে শুধু কান্না পায়, তার সব স্মৃতি ভেসে উঠে। আমি জানি না, কী করব!’

শনিবার (২৮ অক্টোবর) বিএনপির মহাসমাবেশে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত যুবদল কর্মী শামীম মিয়ার কিশোর ছেলে অনিক বলছিল এই কথাগুলো। অনিকের বয়স এখন ১৭ বছর। এই বয়সেই পরিবারের দায়িত্বের বোঝা তার কাঁধে। কিন্তু পৃথিবীর নির্মমতা নিয়ে খুব বেশি জানে না ছেলেটি।

অনিক বলে, ‘আম্মা যা বলে এখন আমি তাই করব। মালিক চার হাজার টাকা বেতন দেয়। আমরা এখন কই যাব?’ তার বাবার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী- দেশ রূপান্তরের এমন প্রশ্নের উত্তরে অনিক বলে, ‘আব্বা মরছে, সরকার আর বিএনপির কি? আমি কারো দোষ দিই না, দোষ আমার আব্বার।’

রাজধানীর মুগধা থানার মানিকনগর এলাকার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সালাউদ্দিনের গলিতে নিহত শামিম মিয়ার বাসা। এই বাসাতেই স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে অনিক-ছোঁয়ামণিকে নিয়ে থাকতেন তিনি।

স্বামীকে হারিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে লাইলী

রবিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার বাসায় কথা হয় শামীম মিয়ার স্ত্রী লাইলী বেগমের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মানুষটা ডা. লেলিন সাহেবের গাড়ি চালাইতো। যে টাকা পেত তাই দিয়েই সংসার খরচ চলত। মানুষটা এখন নাই, কাল থেকে কীভাবে সংসার খরচ চলবে?’

লাইলী বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে এই বাসায় ভাড়া থাকছি। প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল দেড় হাজার টাকা; গ্যাস-পানির বিলের সাথে সংসার খরচ, মেয়ের স্কুল ফি আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ। এসব কীভাবে জোগাব?’

কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শামীম মিয়ার স্ত্রী। তার মাথায় এখন আকাশ ভেঙে পড়েছে। যে লাইলীর কাছে স্বামীই ছিলেন সব, সেই তিনি স্বামীকে ছাড়া ছেলে-মেয়ে নিয়ে কীভাবে চলবেন সে প্রশ্নের উত্তর জানা নেই তার। স্বামী শামীম মিয়ার লাশ দাফন শেষ। তাকে এখন নামতে হবে সংসার টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে।

লাইলী বলেন, ‘মেয়েটারে পড়াশোনা করাইয়া চাকরি করাবে আর ছেলেটারে বিদেশ দেবে- তারপর নাকি আমাদের অভাবের দিন শেষ হবে। এমন স্বপ্নের কথা বলে মানুষটা আমারে রেখে চলে গেল। একমাত্র ছেলে অনিককে গাড়ির মেকানিকের কাজ শিখাইতে পাঠাইছি। সে মাসে চার হাজার টাকা পায়। এর বাইরে একটি টাকাও হাতে নেই। গ্রামে ফিরে যাব সেই উপায় নেই। বাবার বাড়ি থেকে সাহায্য পাব সে আশাও নেই। কারণ তাদেরও অভাবের সংসার।’

লাইলী বলেন, ‘এই সংসার নিয়ে আমি কই যাব। ঢাকা শহরের রাস্তা চিনি না, এই শহরে কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। নেই কোনো জমানো টাকা। অভাবের সংসারে ৮ম শ্রেণির পর একমাত্র ছেলের লেখাপড়া বন্ধ করে কাজে লাগিয়েছি, মেয়ে ছোঁয়ামনিকে পড়াশোনা করাচ্ছিলাম এখন আর পারবো কি ... ।’

শনিবার বিকেলে গুরুতর আহতাবস্থায় শামিম মিয়াকে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

‘ডাক্তাররা জানিয়েছেন হার্ট অ্যাটাক, কিন্ত রিপোর্ট দেয়নি’

লাইলী বেগম জানান, গতকাল পুলিশ ফোন দিয়ে তাকে স্বামী আহত হওয়ার খবর জানায়। এরপর ছেলে অনিককে নিয়ে বিকেল ৪টার দিকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে যান তিনি। তবে সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

লাইলী বলেন, ‘ফোন পেয়ে প্রথমে যাই পল্টন থানায়। সেখানে বলা হয় আমার স্বামী পুলিশ হাসপাতালে। এরপর হাসপাতালে গিয়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় বসে ছিলাম। কিন্ত অনিকের বাবাকে দেখতে দেয়নি। কোনো খবরও জানায়নি। এই বলে আহত হইছে আবার কয় মারা গেছে। দুশ্চিন্তায় আমি কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম। সময়টা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। শুধু বলে বসুন। পরে সন্ধ্যা ৭টার পর বড় অফিসার এসে অনিকের বাবার লাশ দেখায়। শুধু মুখ দেখেই চিনতে পারি।’

২০০৩ সালে শামীম মিয়ার সঙ্গে লাইলীর বিয়ে হয়। তাকে রেখে শামীম মিয়া মারা যাবেন এটা লাইলী কখনো ভাবেননি। তার স্বামী বিএনপির রাজনীতি করতেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে লাইলী বলেন, ‘তিনি নিয়মিত বিএনপির প্রোগ্রামে যেতেন। গতকালও সকালে বাসায় পরোটা খেয়ে সমাবেশে গিয়েছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘ডাক্তাররা জানিয়েছেন হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্ত কোনো রিপোর্ট আমাদের দেয়নি।’

‘অভিযোগ করার জায়গা নেই

নিহত শামীম মিয়ার অসুস্থ বাবা ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘আমি জানতাম না শামীম রাজনীতি করে। জানতাম গাড়ি চালায়। আমি ছেলের সাথে থাকি না, গ্রামে থাকি। এখন ছেলের বউ আর প্রতিবেশীর কাছ থেকে শুনি সে বিএনপি করত।’

ইউসুফ মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ছেলের লাশ মাথায় নিয়ে যাওয়া কী কষ্টের তা তোমরা বুঝবে না। আমি এখন দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় মানুষ। আমি কাকে দোষ দেব নিজের কপাল ছাড়া। ছেলেটারে এভাবে মেরে ফেলল!’।

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ নিয়ে কিছু বললে পুলিশ ধরবে, বিএনপি নিয়ে বললে তারা বলবে এসব কেন বললেন। আবার সরকার নিয়ে বললে তারা নিয়ে বিচার করবে। আমার বলার কোনো জায়গা নেই’, বলতে বলতে হাঁপিয়ে ওঠেন বৃদ্ধ বাবা।

বিয়ে থেকে শুরু করে সব কাজে একসাথে ছিলাম

মুগধা সালাউদ্দিনের গলির স্থানীয় বাসিন্দা মো. নবী হুসেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘৩০ বছর ধরে একসাথে থাকি। ওর বিয়ে থেকে শুরু করে সব কাজে একসাথে ছিলাম। সুখ-দুঃখে যে শামীম পাশে থাকতো- আজ তাকে কবরে ঘুম পাড়িয়ে আসলাম। শামীম নেই ভাবতেই বুকটা ফেটে যায়।’

রবিবার বাদ আছর জানাজা শেষে শামীম মিয়াকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।