আমাদের এই অঞ্চলে মুসলমান তখন কম ছিল, হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ছিল। বাগদাদ থেকে ধর্মযাজক ওলি আউয়াল সাহেব ধর্মপ্রচার করতে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। তিনি টুঙ্গিপাড়ায় এসে তার গোড়াপত্তন শুরু করলেন। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যে পুরনো বিল্ডিংটা রাস্তার পাশে আছে, আমিও ছেলেবেলায় দেখেছি সেখানে বাগদাদের এক হুজুর থাকতেন। তিনি সেখানে একটি চৌকিতে থাকতেন। ছেলে-মেয়েদের পড়াতেন। ছোট্ট ওই মসজিদে নামাজ পড়তেন। তারপর একদিন তিনি চলে গেলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আর কেউ আসেননি।
আমরা যে বাগদাদ শরিফ থেকে এসেছিলাম, এতে অনেকটা বুঝা যায়। আমাদের বংশে তখন থেকে ধর্ম প্রচারটা ছিল। সত্যিকারার্থে বলতে, আমাদের পূর্বপুরুষরা মানুষের ওপর ধর্ম চাপিয়ে দিতেন না। হিন্দু থেকে মুসলিম হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা করতেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে ধর্ম প্রচারে পুরো এলাকার মানুষই মুসলমান হয়ে গেছে। পাশের যে কোটালীপাড়া সেটা কিন্তু একবারে হিন্দু এলাকা ছিল।
আমরা দেখেছি, আস্তে আস্তে হিন্দু মুসলমান হয়েছে। গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু কিন্তু নিজেও ক্ষমতায় আসার পরে ধর্মের অনেক কাজ করেছেন। কাকরাইল মসজিদের জায়গা দিয়েছেন। বিশ্ব ইজতেমা মাঠের জায়গা দিয়েছেন।
এটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এই নয় যে, এটা শুধু মুসলমানদের দেশ। তবে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তিনি এটাকে এগিয়ে নিয়েছেন। সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। তার মনের মধ্যে ছিল মুসলমানদের তিনি আরও অনেক দূর নিয়ে যাবেন। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো কাকরাইল ও ইজতেমা মাঠের মতো অনেক কিছু অনেক জায়গায় করতেন। যাহোক, সেটা তাকে করতে দেওয়া হয়নি। ঘাতকের আঘাতে ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর কী হয়েছে, এটা সবাই জানেন। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন বলে বেঁচে গেছেন।
শেখ হাসিনা ফিরে এলেন। তিনিও ধর্মপরায়ণ। তিনিও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন সবসময়। আমি দেখেছি, নামাজে তিনি গাফিলতি করেন না। রাতে তিনি তাহাজ্জুদও পড়েনÑ কারণ এটা আমি দেখছি। ওই বাড়িতে আমার জন্ম। আমার জন্মের পর মাকে দেখিনি। বঙ্গমাতা আমাকে লালন-পালন করেছেন। আমি ওই বাসাতেই রয়েছি। ওখানে থেকেই আমি কলেজ-ভার্সিটি পাস করেছি। তখন আমি দেখেছি, উনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সবসময় পড়তেন। বাড়িতে যখন ছিলেন, তখনো আমি দেখতাম। কারণ আমি তো তার কাছেই লালিত-পালিত হয়েছি।
বঙ্গবন্ধুর মা-বাবা দুজনই নামাজি ছিলেন। পূর্ণাঙ্গ নামাজি ছিলেন। আল্লাহভক্ত ছিলেন। অথচ তাদের বিকৃত করা হয়েছে। আমি খুব দুঃখ পাই যে আমাদের দেশের লোকজন, যারা বড় রাজনৈতিক নেতা, তারা কীভাবে এরকমভাবে বিকৃত করার চেষ্টা করল।
বঙ্গবন্ধুর যেমন ধর্মের প্রতি আস্থা অবিচল ছিল, আমাদের পরিবারের সবারই ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে সব ধর্মকে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার দিয়েছেন।
শেখ হাসিনা যে মডেল মসজিদ করলেন, আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোনো সরকার এমন করেছে। করেছে কি না আমার সন্দেহ আছে! মক্কা-মদিনায় ঢুকলে যেমন ভালো লাগে, তেমনি একটা আবেগ-অনুভূতি আসে ধর্মের প্রতি। এই যে তিনি এগুলো করলেন, এই মডেলটা তিনি তৈরি করছেন; এটাই মানুষকে আকৃষ্ট করে ধর্মের দিকে। এই মসজিদের মধ্যে ঢুকলে আমার মনে হয় তখন তার আর অন্য কিছু চিন্তাতে থাকে না। এটার মাধ্যমে তিনি মুসলিম ধর্মকে জাগিয়ে তুলেছেন। তিনি এটা আরও উন্নত করতে চান- এটাই আমি মনে করি। তিনি নিজে একজন মুসলিম। তার বাবা-মা সবাই মুসলিম। আমাদের পরিবারটাও মুসলিম। বাগদাদ শরিফ থেকে আমাদের পরিবার এখানে গোড়াপত্তন করেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে আমাদের উন্নতি হয়। আমাদের বংশধররা আসার পরই এই এলাকায় মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ে। এবং সবাই মুসলমান হয়। এই এলাকা তখন হিন্দু এলাকা ছিল।
আমাদের গোড়াপত্তন ওইখানে। শেখ হাসিনা যা করছেন, আমার মনে হয় ধর্মকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তিনি মুসলমানদের জন্য করছেন না, সব ধর্মের জন্যই করছেন। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই কথাটা যে তিনি বলছেন, এটার মধ্য দিয়ে সব কিছুর বহিঃপ্রকাশ হয়। সবার ধর্মই সে ভালোভাবে পালন করবে।
লেখক : বঙ্গবন্ধু পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য