বিএনপিকে কোণঠাসা করার সুযোগ দেখছে আওয়ামী লীগ

সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ডাকা মহাসমাবেশ শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় পন্ড হওয়ার পর গতকাল রবিবার হরতালেও বিএনপি খুব যে লাভবান হয়েছে, এমনটি মনে করছে না আওয়ামী লীগ। বরং দলটি বলছে, সহিংসতার কারণে বিএনপিকে কোণঠাসা করে ফেলার সুযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের কথা বললেও বিএনপির গত দুদিনের কর্মসূচিতে সহিংসতা হয়েছে। কিন্তু এতে তাদের আন্দোলনে প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করছে দলটি। বিএনপি নেতারা বলেছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও জোরদার হবে।

গত শনিবার নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে কাকরাইল, পল্টনসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্য ও যুবদল নেতা নিহত হন। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের হামলায় ওই পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে গতকাল সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে রাজধানীতে চারটি বাসসহ বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপির মহাসমাবেশ দলটিকে পিছিয়ে দিয়েছে। কারণ তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ হামলা বা সংঘর্ষে জড়ায়নি। সহিংসতা করে বিএনপির সরকারের হাতে সুযোগ তুলে দিয়েছে। সহিংসতার কারণে দলটির নেতাকর্মীরা মামলা, গ্রেপ্তারের শিকার হবে। সব ধরনের দমন-পীড়ননীতি অনুসরণ করার ক্ষেত্রে আর বাধা রইল না। এখন আর বিএনপির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আগপিছ ভাবতেও হবে না আওয়ামী লীগকে।

এ নেতারা বলেন, মহাসমাবেশে বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে আওয়ামী লীগ বিদেশিদের বোঝানোর চেষ্টা করবে বিএনপি সন্ত্রাসী দল। সেজন্য সহিংসতার ভিডিওচিত্র তৈরি করা হচ্ছে। বিএনপির কর্মসূচি মানেই দেশে নৈরাজ্য-অরাজকতা সৃষ্টি করা, এই ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে সেটাই বিদেশিদের কাছে তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া সহিংসতা এড়াতে বিএনপিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া যাবে না, যেকোনো সময়ে এমন অবস্থানেও যেতে পারে সরকার। তারা বলেন, বিএনপির মহাসমাবেশ ও হরতাল কর্মসূচি দুটিই শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জন্য শাপে বর হয়েছে। তারা নির্ভার বলেও দাবি করেন আওয়ামী লীগের ওই নেতারা।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মনে করছেন, মহাসমাবেশে পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা বিএনপিকে চাপে ফেলে দিয়েছে। সেই চাপ আওয়ামী লীগকে সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ বারবার বলেছে, বিএনপির পরিকল্পনায় দুরভিসন্ধি রয়েছে। গত শনিবার দেশবাসী তা দেখেছে। এখন থেকে বিএনপিকে আর কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না।

গতকাল হরতাল কর্মসূচির পর বিএনপি দুদিনের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলেন, তাদের কোনো আন্দোলনই সরকারের ভিত নড়াতে পারবে না। কারণ তারা (বিএনপি) যা চায় জনগণ তা চায় না। বিএনপির নৈরাজ্য সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে দাবি করে তারা বলেন, তাদের শক্ত হাতে দমন করা হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ১৯৮৬, ১৯৯০, ২০০১ ও ২০০৬ সালে আন্দোলন করেছি। আমরা পুলিশের হাতে মার খেয়েছি কিন্তু পুলিশের ওপর আক্রমণ করিনি।’ বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসই তাদের মূল লক্ষ্য। তারা নির্বাচন চায় না। পেছনের দরজায় ক্ষমতায় আসা তাদের লক্ষ্য।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও আন্দোলন মোকাবিলায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করা নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ‘বিএনপি কথা দিয়ে কথা রাখে না। এই দল কখনো জনগণের মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।’ তিনি মনে করেন, সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির ২৮ অক্টোবর (শনিবার) ছিল সর্বশেষ মহড়া। সেই মহড়ায় ১৫ মিনিট টিকতে পারেনি বিএনপি। তাদের মাজা ভেঙে গেছে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ আর বিএনপি পাবে না। যতই হরতাল দিক আর অবরোধ দিক। এবার বিএনপি হবে মুসলিম লীগ। মায়া বলেন, ‘বিএনপি এমন একটি দল, কর্মসূচি দেয় কিন্তু রাজপথে থাকতে পারে না।’

তবে বিএনপির দাবি, মহাসমাবেশে সরকারি পরিকল্পনায় যা ঘটেছে তাতে কোনো বিরূপ প্রভাব বিএনপির আন্দোলনে পড়বে না। বিএনপির আন্দোলন আরও জোরদার করবে।

দলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৮ অক্টোবর যা ঘটেছে তার কোনো প্রভাবই বিএনপির আন্দোলনে পড়বে না। বিএনপির ডাকা হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করেছে দেশবাসী। মহাসমাবেশের পর বিএনপির আন্দোলন আরও জোরদার হয়ে উঠেছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারক এ নেতারা দাবি করেন, নৈরাজ্য সরকারের পরিকল্পনার অংশ। মহাসমাবেশে যোগ দিতে আগের দিন থেকে লোক আসা শুরু হয়েছে ঢাকায়। একটা উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল। তখন হলো না কেন? যখন মহাসমাবেশ শেষ পর্যায়ে একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে জমে উঠেছে, ঠিক সেই সময় এ আক্রমণটা করা হয়েছে। সরকারি দল উল্টো দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের যে বৈশিষ্ট্য সেটা দেখলাম আমরা।’ দলের মহাসচিবের গ্রেপ্তার ও সহিংসতার ঘটনা আন্দোলনে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রভাব পড়বে না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় বুঝলাম, বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিকে আওয়ামী লীগ দেশ-বিদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে দেখাতে চায়।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আটক প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টা তার বাসায় নাটক করে তারপর তাকে আটক করে তুলে নিয়ে যাওয়া, আবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলছেন, এটা পুরোপুরি মানসিক নিপীড়ন করা। সামগ্রিকভাবে তিনি একজন বয়স্ক মানুষ। এটা চলমান দমন-পীড়নের অংশ।’