ভুলের ফুলের মালায় ছিল শত কাঁটা

কলরব হচ্ছে, লাল-সবুজ কমলায় নীল হচ্ছে কিন্তু ভুলগুলো ফুল হয়ে ফুটছে না। একের পর এক ব্যর্থতার স্তম্ভ গড়ে উঠছে, কিন্তু তাতে করে সাফল্যের দালানের নির্মাণ আর হচ্ছে না। ১৯৯৭ সালে কুয়ালালামপুরে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আইসিসি ট্রফির ম্যাচ জয়ের মধ্য দিয়ে যে সঞ্জীবনী সুধা জাগিয়ে তুলেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটকে, সিকি শতাব্দী পেরিয়ে সেই নেদারল্যান্ডসের কাছে বিশ^কাপে হার যেন বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এত সমর্থন, এত উন্নয়ন সবই কি তাহলে ফাঁপা বুলি? সেমিফাইনালের স্বপ্ন দেখিয়ে, শিরোপা জয়ের গল্প শুনিয়ে যখন বাংলাদেশ হেরে যায় অপেশাদার ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া দলের কাছে, তখন মেনে নিতেই হয় সবই ছিল শুভংকরের ফাঁকি।

‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি’; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগে ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থে লিখেছিলেন এই চরণ। ২০২৩ সালে এসেও রবীন্দ্রনাথ একই রকমভাবে প্রাসঙ্গিক এবং সমসাময়িক। তার লেখা গানকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গেয়ে যারা খেলতে নেমেছিলেন তারই শহর কলকাতার বুকে, ওলন্দাজদের হাতে তারা হয়েছেন পর্যুদস্ত। ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্রে তাই কবিগুরুরই শরণ। ভুল হয়েছে সেটা মানতে হবে, ভুল থেকে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগাতে হবে। তাহলেই সাফল্য আসবে। যেমনটা ২০১১ সালে পেয়েছে ভারত, ২০১৯ সালে ইংল্যান্ড। দুই দলই আগের আসরে বাংলাদেশের কাছে হেরে চরমভাবে অপমানিত হয়ে আর লজ্জায় মাথা হেঁট করে বিদায় নিয়েছিল বিশ্বকাপ থেকে। ভারতে খেলোয়াড়দের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছিল, বাসায় ঢিল ছোড়া হয়েছিল। ইয়ন মরগানকে অ্যাডিলেডের সেই ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে বাক্যবাণে এফোঁড়-ওফোঁড় করা হয়েছিল। চার বছর পর সেই ভারতীয় দলকে নিয়েই উৎসবে মেতেছিল কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। অ্যাডিলেডে যারা মরগানের তীব্র সমালোচক ছিলেন, চার বছর পর লর্ডসে মরগানের হাতে কাপ দেখে তারাই প্রশংসার তুবড়ি ছুটিয়েছেন। তাই বাংলাদেশের পক্ষেও সম্ভব ব্যর্থতার এই পাকচক্র থেকে বের হয়ে আসা। কিন্তু কীভাবে?

২০১১ সালে ভারতকে বিশ^কাপ জেতানো অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি গণমাধ্যমের কাছে হ্যালির ধূমকেতুর মতোই দুর্লভ। তেমনই এক বিরল সাক্ষাৎকারে ধোনি বলেছিলেন, ‘আমার এখনো ২০০৭-এর সেই হারের (পোর্ট অব প্রিন্স, বাংলাদেশ) কথা মনে আছে। তখন আমরা ভালো ক্রিকেট খেলছিলাম আর ওই মুহূর্তেই আমরা বিশ্বকাপে পরের পর্বে যেতে পারিনি। আমাদের অতীত ভুলে এগিয়ে যেতে হয়; তবে ওই হারটা মেনে নেওয়া ছিল কষ্টকর। ওই মুহূর্তটা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল।’ ধোনি বলছিলেন কীভাবে পুলিশ পাহারায় তাদের দিল্লি বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, নিজেদের তখন মনে হচ্ছিল অপরাধী বা আতঙ্কবাদীর মতো। বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে দর্শক মিরপুরের মাঠে দুয়োধ্বনি শুনিয়েছেন, ইডেনেও শুনিয়েছেন। সাকিব নিজেও সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘তাদের ক্ষেত্রে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি মনে করি যেভাবে আমরা খেলেছি, এটা আমরা ডিজার্ভ করি।’

২০০৭ সালের ভারত আর ২০১৫ সালের ইংল্যান্ড, দুটো দলই বিশ্বকাপে বিপর্যয়ের পর নিজেদের ক্রিকেট-কাঠামো এবং নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন এনেছে। যার ফল তারা পেয়েছে বিশ্বকাপের পরের আসরে। এ জন্য নিতে হয়েছে অজনপ্রিয়, কঠিন অথচ প্রয়োজনীয় কিছু সিদ্ধান্ত। ২০০৭ বিশ্বকাপের দলে নেতৃত্বে থাকা রাহুল দ্রাবিড়সহ কিংবদন্তি হয়ে ওঠা সৌরভ গাঙ্গুলি, ভিভিএস লক্ষ্মণ, অনিল কুম্বলের মতো ক্রিকেটারকেও ওয়ানডে দল থেকে ছেঁটে ফেলা হয়। চাকরি হারান কোচ গ্রেগ চ্যাপেল। মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন দলে আসেন গৌতম গম্ভীর, বিরাট কোহলির মতো তরুণরা, সঙ্গে বীরেন্দর শেবাগ, শচিন টেন্ডুলকার, যুবরাজ সিংয়ের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা মিলে সম্মিলিত প্রয়াসেই ২৮ বছর পর বিশ^কাপ জেতান ভারতকে।

ইংল্যান্ডকে বিশ^কাপ জেতানো অধিনায়ক মরগানকে নিয়ে একটা মিনিট পাঁচেকের তথ্যচিত্র বানিয়েছে আইসিসি, যেটা দেখা যায় আইসিসির ফেসবুক পেজে খুঁজলে। ২০ মার্চ ২০১৫, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে মাত্রই বাংলাদেশের কাছে হেরে সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন মরগান। সেখানেই দাঁতে দাঁত চেপে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের এমন সব খেলোয়াড় লাগবে, যারা অনেক অনেক রান করবে, ধারাবাহিকভাবে। এমন সব বোলার লাগবে, যারা ভয় ধরাবে, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখবে।’ এরপর সেই সব ক্রিকেটারকে খুঁজে বের করেছে ইসিবি। নতুন ডিরেক্টর অব ক্রিকেট অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের নেতৃত্বে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিতে যারা আগ্রাসী ব্যাটিং করে, যারা আক্রমণাত্মক বোলিং করে ঘরোয়া ক্রিকেটে তাদের খুঁজে বের করা হয়েছে। খোলনলচে বদলে ফেলে নতুন ঘরানার ক্রিকেট খেলেছে ইংল্যান্ড। পেছনে কাজ করেছে বিজ্ঞানমনস্ক গবেষণা। বেসবলের কোচ এনে ব্যাটসম্যানদের ‘হিটিং রেঞ্জ’ বাড়ানোর অনুশীলন হয়েছে। ফিটনেস, কৌশল, অনুশীলন সবকিছুর সঙ্গে ভাগ্যের মিশেলেই চার বছর পর বিশ^কাপ জিতেছে ইংল্যান্ড আর বিশ^কাপজয়ী প্রথম ইংল্যান্ড অধিনায়ক হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন মরগানও।

বাংলাদেশেরও ‘কমলা-লজ্জা’র অধ্যায় ভুলে ঘুরে দাঁড়াতে হলে কৌশলগতভাবে প্রয়োজন কিছু অপ্রিয় সিদ্ধান্ত। দীর্ঘদিন ধরে খেলছেন, এমন কয়েকজন ক্রিকেটারকে সসম্মানে বিদায় জানিয়ে তাকাতে হবে সামনের দিকে। জাতীয় দল নির্বাচনে ২০১১ থেকে কাজ করছেন মিনহাজুল আবেদীন, ২০১৬ সালে ফারুক আহমেদ প্রধান নির্বাচকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর মিনহাজুল দায়িত্ব পালন করছেন এই পদে। হাবিবুল বাশারও কাজ করছেন ২০১৬ সাল থেকে। যদিও দল নির্বাচনে বিসিবি সভাপতি এবং কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের প্রভাব দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। এই অপসংস্কৃতির অবসান ঘটানো প্রয়োজন। জাতীয় দল নির্বাচনে পারফরম্যান্সের বদলে প্রাধান্য পায় ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা। নির্বাচকদের খামখেয়ালিতে টেস্টের পারফরম্যান্সে কেউ টি-টোয়েন্টি দলে ডাক পাচ্ছেন, প্রিমিয়ার লিগে ভালো করে সুযোগ পাচ্ছেন টেস্ট দলে আর কিছু না করেও জাতীয় দলে খেলছেন প্রতিভার জোরে।

বয়সভিত্তিক দলে ভালো করলেই জাতীয় দলে খেলিয়ে দেওয়ার অপসংস্কৃতিটাও ভুলে যাওয়ার সময় এসেছে। জাতীয় দলে মাত্র ৫ ম্যাচ খেলেই তানজিদ হাসান তামিম বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছেন। ৫ ম্যাচে তার সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ১৬ রানের, এতেই বোঝা যায় বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্যতাটা কতটা নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে! তানজিম সাকিব মাত্র এক ম্যাচ খেলে বিশ^কাপে চলে এসেছেন। তাদের প্রধান যোগ্যতা, ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতা। একই সূত্রে এশিয়া কাপে এবং ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলে চলে এসেছিলেন শামীম হোসেনও। ঘরোয়া ও বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পরের ধাপগুলোতে নিয়মিত পারফরম করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের আগেই জাতীয় দলে তাদের ডেকে নেওয়ায় ছোট হয়ে যাচ্ছে প্রত্যাশার সীমানাও।

সবচেয়ে জরুরি, সংস্কার প্রয়োজন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের। এই আসরের সেরা রান সংগ্রাহক দুই ব্যাটসম্যান, নাঈম শেখ ও এনামুল হক বিজয়কে অসহায় দেখিয়েছে এশিয়া কাপে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানদ- থেকে তারা যে যোজন যোজন দূরে, সেটা স্পষ্ট। চৈত্র-বৈশাখের প্রখর রোদে লিগের খেলা চলে, জাতীয় দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটারকে লিগের সময় পাওয়া যায় না। বিকেএসপি আর ইউল্যাবের উঠানসদৃশ মাঠে হয় ম্যাচ। একটা সময় এই আসরে ওয়াসিম আকরাম, অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো ক্রিকেটাররা খেলে গেছেন। এখন ভারত ও শ্রীলঙ্কার তৃতীয় সারির ক্রিকেটাররা আসেন। খেলোয়াড় সংকট আর গোষ্ঠীতন্ত্রে মাঝারিমানের ক্রিকেটারও আকাশছোঁয়া দর হাঁকেন।

পরবর্তী বৈশ্বিক ক্রিকেট আসর ২০২৪ সালের জুনে, টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপ। সাত মাসও বাকি নেই এই আসরের। ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরের আসর ২০২৭ সালে। সেখানেও বাংলাদেশ খেলবে সেই নিশ্চয়তা নেই। কারণ নির্দিষ্ট দিনে আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৮ দল এবং দুই স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েই খেলবে সরাসরি। র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০-এ থাকা এর বাইরের দুই দল সরাসরি খেলবে বাছাই পর্বে, যেখান থেকে সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে লড়াই করেই তাদের জায়গা পেতে হবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে। বাংলাদেশ টেস্টের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পর পর দুই চক্রে শেষ করেছে ৯ দলের ভেতর নবম হয়ে। ওয়ানডে বিশ্বকাপের খারাপ পারফরম্যান্সে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলাও অনিশ্চিত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ফল ভালো হয়নি গত দুই আসরে। এভাবে চলতে থাকলে একটা সময় কেনিয়া বা জিম্বাবুয়ের মতো ক্রিকেট বিশে^ ব্রাত্য হয়ে পড়বে বাংলাদেশ আর সাফল্য না থাকলে মুখ ফিরিয়ে নেবে পৃষ্ঠপোষকরাও। তখন বিদায় নেবেন দুধের মাছি হয়ে টিভিতে চেহারা দেখানো আর বিসিবির অর্থে বিদেশে বেড়ানো সব সংগঠকও, ভুগবেন ক্রিকেটাররাই।

তাই অবকাঠামো ও নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ভুল বুঝতে হবে ক্রিকেটারদেরও। হতে হবে আরও উদ্যমী, পরিশ্রমী, অনুশীলনে একাগ্র। অল্পতে আত্মতৃপ্তিতে ভুগলে বামন হয়েই থাকতে হবে ক্রিকেট মানচিত্রে। এত দিনের করে আসা ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ফুল ফোটাতে পারলেই ক্রিকেট থাকবে বাংলাদেশে, থাকবেন ক্রিকেটাররাও। না হলে হয়তো ফিরে যেতে হবে ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের আগের সময়ে। একটা সময়ে ফুটবলাররা ভাবেননি, তাদের রমরমা এভাবে শেষ হয়ে যাবে ক্রিকেটের জোয়ারে। তাই অন্য কোনো খেলা এসেও যে ব্যর্থতার বৃত্তে পাক খাওয়া ক্রিকেটকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না, সেই নিশ্চয়তাই বা কে দিচ্ছে।