তারা এখন টাকার বদলে ডলারে ‘ঘুষ’ নিচ্ছেন

বাংলাদেশে ডলার কেনাবেচার দুটি বাজার রয়েছে। প্রথমটি ব্যাংকের আওতাধীন ‘অফিশিয়াল’ বাজার আর দ্বিতীয়টি হলো বেসরকারি বা ‘আন-অফিশিয়াল’ বাজার। অফিশিয়াল বাজারে মূলত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের জন্য ডলারের কেনাবেচা হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এই বাজারে ডলারের মূল্যমান নির্ধারণ করে থাকে। আমাদের আলোচনা আন-অফিশিয়াল বা কার্ব মার্কেটে সম্প্রতি ডলারের চড়ামূল্য নিয়ে। এই বাজারটি থেকে বিদেশগামী নাগরিক, বিদেশে চিকিৎসা করাতে গমনেচ্ছু মানুষ ডলার কিনে থাকেন। বিদেশে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও এই বাজার থেকে ডলার কিনে নিয়ে যান। মার্কিন অর্থনীতির গতিবিধি ভালো হলে এবং বিশেষত মার্কিন ডলারের তুলনামূলক দাম বাড়লে অন্য সব দেশে ডলারের দাম বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে থাকা ডলার অফিশিয়াল বাজারে ছেড়ে দিয়ে এই দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়। এর কিছুটা প্রভাব কার্ব মার্কেটেও গিয়ে পড়ে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সেপ্টেম্বর মাসে ২৩ বিলিয়ন (আইএমএফ-এর সূত্র অনুযায়ী) ডলারে নেমেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করছে বিনিয়োগ তহবিল ও ঋণ হিসাব তহবিল মিলিয়ে মোট রিজার্ভের পরিমাণ ২৯.২০ বিলিয়ন ডলার।

গত বছর বাংলাদেশের রিজার্ভের অঙ্ক ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। মেগাপ্রকল্পে নেওয়া ঋণের সুদ (ফবনঃ ংবৎারপরহম) ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনতে গিয়ে ডলারের ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি হয়। কমতে থাকে রিজার্ভ। দ্রুত ডলারের রিজার্ভ কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসজাত পণ্যের আমদানি অনুৎসাহিত করেছে। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে দেশের কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম ১১৮ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠে গেছে। তবে, আমদানি পণ্যের হিসাব খোলার জন্য ব্যাংকগুলো মোটামুটি ১১২ টাকায় ডলার বিক্রি করছে। 

কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম এত বেশি কেন?

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়েই মানি চেঞ্জার কোম্পানিগুলো ব্যবসা চালিয়ে আসছে, বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো তফসিলি ব্যাংক মানি চেঞ্জার কোম্পানিগুলোর কাছে কোনো ডলার, ইউরো বা পাউন্ড স্টার্লিং বিক্রি করে না। তাহলে, এসব কোম্পানি ডলার পায় কোথা থেকে? কোম্পানিগুলো বলছে, বিদেশ ফেরত ও প্রবাসী ব্যক্তিদের কাছ থেকে তারা ডলার বা ইউরো ইত্যাদি কিনে থাকেন। বাংলাদেশ থেকে শুধুমাত্র ভারতে বেড়ানো ও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে মাসে এক লাখেরও বেশি পর্যটক দেশটিতে যাচ্ছেন। একজন ব্যক্তি গড়ে ৫০০ ডলার সঙ্গে নিলে এক লাখ ব্যক্তি মাসে ৫ কোটি ডলার বা বছরে ৬০ কোটি ডলার শুধুমাত্র ভারতে খরচ করছেন। আর বাংলাদেশ থেকে বছরে বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী বিদেশে পড়াশোনার জন্য যাচ্ছেন। এরা মূল খরচ যেমন টিউশন ফি ও হোস্টেল খরচ ইত্যাদির জন্য এক সেমিস্টারের বিপরীতে অন্তত ৬ থেকে ৯/১০ হাজার ডলার দেশের ব্যাংকগুলো থেকে কিনলেও কিছু ডলার মানি এক্সচেঞ্জ থেকেও সংগ্রহ করছেন। এর বাইরে ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মানুষ ভ্রমণ, চিকিৎসা ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে লাখ লাখ ডলার সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন। এই লেখকের পরিচিত এক ব্যক্তি গত সপ্তাহে তার বিশেষ ধরনের চিকিৎসার জন্য ৩০ হাজার ডলার ভারতে নিয়ে গেছেন। এখন খুব কম মানুষই ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ভ্রমণ বা চিকিৎসার জন্য ডলার কিনতে পারছেন। দেশের নানাবিধ শিল্পের আমদানিকারকরা ডলার সংকটের কারণে ঠিকমতো এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারছেন না বলে ক্রমাগত রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব ব্যক্তি ভ্রমণ শেষে বাইরে থেকে ফিরে আসছেন, তাদের ফেরত আনা ডলার দিয়ে কি মানি এক্সচেঞ্জগুলো ব্যবসা করে? এর পরিমাণ তো খুব বেশি নয়। এদিকে, প্রবাসী শ্রমিকরা বাড়িতে বেড়াতে আসবার সময় অথবা একেবারে দেশে ফিরে যখন আসছেন, তখন কিছু রিয়েল, পাউন্ড স্টারলিং, ডলার, দিনার ইত্যাদি সঙ্গে আনছেন। কিন্তু বেশিরভাগ অংশই হয় ব্যাংকিং চ্যানেল না হয় হুন্ডির মাধ্যমে দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ, মানি এক্সচেঞ্জের যে চাহিদা তা কি শুধু বিদেশ ফেরত শ্রমিক বা সফরকারী ব্যক্তির ফিরিয়ে আনা ডলার দিয়ে মেটানো সম্ভব? তাহলে, মানি চেঞ্জাররা ডলার পাচ্ছেন কোথা থেকে। বাংলা প্রবাদটি এখানে যথেষ্ট জুতসই ভাসুরের নাম মুখে নিতে নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মানি চেঞ্জারের মালিক/ ম্যানেজাররা বলছেন, ‘অফিশিয়ালি বিদেশ ফেরত এবং প্রবাসীর কাছ থেকে তারা ডলার সংগ্রহ করছেন। বাস্তবে ডলারের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট আছে মতিঝিল, দিলকুশা পাড়ায়। বড় বড় মানি এক্সচেঞ্জগুলো বা তাদের প্রতিনিধিরা ঐ আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট থেকে ডলার সংগ্রহ করেন। সেখান থেকে ঢাকার নানা প্রান্তের মানিচেঞ্জাররা ডলার কিনে নেন।’ আগস্ট মাসের ৩০ তারিখে রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড় ও গুলশানে চারটি মানি এক্সচেঞ্জে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ডলার ও টাকা উদ্ধার করেছে এনএসআই ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। অভিযানে প্রায় ২ লাখ মার্কিন ও কানাডীয় ডলার এবং ৩৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আটক করা হয়েছে হুন্ডির কারবারে জড়িত একাধিক ব্যক্তিকে।

অভিযান চালিয়ে কি ডলারের দাম কমানো সম্ভব?

অভিযান চালানোর পর অনেক মানি এক্সচেঞ্জ তাদের ব্যবসা সাময়িক বন্ধ রেখেছেন বলে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে। অনেকে, যারা হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ডলার সংগ্রহ করতেন, তারা গা ঢাকা দিয়েছেন। আমাদের মনে আছে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়েছিল। তাতে, অনেক ব্যবসায়ী সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। ফলে ঐসব পণ্যের মূল্য আরও বেড়ে যায়। কার্ব মার্কেটে ডলারের ক্ষেত্রেও এবার তাই হয়েছে । হুন্ডিওয়ালারা যদি কেঁচো হয়ে থাকেন, তাহলে এই অবৈধ বাণিজ্যের সাপ কারা সেটা কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থা খুঁজে বের করবে? 

মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, এখন যারা ‘ঘুষ’ নিচ্ছেন, তারাও টাকার বদলে ডলারে ‘ঘুষ’ নিচ্ছেন। তাই বাধ্য হয়ে তাদের কার্ব মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে ডলার কিনে দিতে হচ্ছে। অপরদিকে, যারা বাইরে থেকে দেশে ফেরত আসছেন, তারাও কিছু ডলার নিজের কাছে রেখে দিচ্ছেন। সর্বোপরি, অনেকে তাদের গচ্ছিত টাকার একটি অংশ দিয়ে সামান্য ডলারও কিনে রাখছেন। এমন পরিস্থিতিতে, ভ্রমণের অফ সিজনে ডলারের মূল্য ৮৮ থেকে ১২০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।   

যতদিন কার্ব মার্কেট (কালোবাজার) বলে একটি মার্কেট থাকবে, ততদিন ডলারের দু’রকম মূল্যও থাকবে। আর কার্ব মার্কেটের ডলারের সরবরাহ আসবে মূলত হুন্ডিওয়ালাদের কাছ থেকে। ফলে এখানে বেশি মূল্যে ডলার কিনতে হবে। ভারতে একাধিক প্রতিষ্ঠান ডলার কেনাবেচা করতে পারে। সেখানে অনেক আবাসিক হোটেল, প্রায় সব স্বর্ণ ব্যবসায়ী ডলার কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। এর বাইরে সেখানকার কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংক সব সময় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে স্বর্ণ কিনে রিজার্ভে রাখছে। এতে করে রুপির মান চট করে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে না। ডলারের ঘাটতি হলে বা দাম বেড়ে গেলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী বা হোটেল মালিকরা বাজারে ডলার ছেড়ে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সহসাই স্বর্ণ কিনছে না। আর কার্ব মার্কেটে ডলার সরবরাহের কোনো বৈধ ব্যবস্থা নেই। এখানকার স্বর্ণ ব্যসায়ীরাও (দু’একজন বাদ দিয়ে) ডলার সংগ্রহ করেন না। ফলে, ডলারের সংকট হলে বাজারে ডলার পুশ করবে কে? বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি খোলার জন্য উত্তপ্ত বাজারে (ব্যাংকগুলোর কাছে) মাঝে মাঝে ডলার বিক্রি করে থাকে। এখন খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেই যথেষ্ট ডলার নেই।

উপায় তাহলে কী?

অর্থনীতিবিদরা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলে আসছে ডলারের মূল্য মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে ডলারের মূল্য নির্ধারিত হলে প্রবাসী শ্রমিকরা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে ডলার রেমিট করার বিষয়ে উৎসাহিত হবেন। বাজারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে এ পর্যায়ে ডলারের দাম বেড়ে যেতে পারে, বাংলাদেশি টাকা আরও বেশি অবমূল্যায়িত হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের কাছে কোনো বিকল্পও নেই। বাজারের ওপর ডলারের মূল্য ছেড়ে দিলে এখনই এর দাম বেড়ে ১৫০ টাকা হয়ে যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। মনে রাখতে হবে শুধুমাত্র দেশপ্রেমের কথা বিবেচনা করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের কষ্টার্জিত আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠাবেন না। মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের দেশের পরিবারবর্গ বেশি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। যে কারণে তারা হুন্ডি ব্যবসায়ীদের কাছে ডলার বিক্রি করছেন, যাতে কিছু বেশি টাকা পাওয়া যায়। ডলার যদি প্রকৃত সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে কেনাবেচা হতো তাহলে তারা হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে ছুটতেন না। তারা ব্যাংকে প্রকৃত বাজারমূল্যে ডলার ট্রান্সফার করতে উৎসাহিত হতেন। এর বাইরে সরকার ও ব্যবসায়ীরা রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ করতে পারেন। ব্যবসায়ীরা তাদের রপ্তানি আয়ের একটি অংশ বাইরে রাখতে আগ্রহী। এমন সংকটময় মুহূর্তে সরকার তাদের কাছে সহায়তা চাইতে পারে। এজন্য সরকার তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। ভবিষ্যতে যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়া স্বর্ণ ব্যবসায়ী, অন্যান্য ব্যাংকও ডলারের একটি রিজার্ভ ফান্ড করতে পারে যেখান থেকে সংকটের সময় ডলার পাওয়া যেতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রায় ১০০ কোটি ডলার এখনো দেশে আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এক নির্দেশনায় বলেছে যত শিগগির সম্ভব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেন আটকেপড়া ডলার দেশে আনবার ব্যবস্থা করে। আশঙ্কা এই ডলার হয়তো পাচার হয়ে থাকতে পারে।

লেখক; ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

govindashil@gmail.com