ঢাকায় গত ২৮ অক্টোবরের বিএনপির মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে সংঘটিত নানা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তারা বলেছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সমর্থনে প্রয়োজনে দেশটি ব্যবস্থা নেবে।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবাদ বিক্ষোভকালে মৃত্যু, গ্রেপ্তার ও দমনপীড়ন বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রসহ তিন পক্ষের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া জানা গেছে। এ ছাড়া গতকাল মঙ্গলবার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নকারী তার প্রশ্নে বলেন, মূলত পুলিশ পরিকল্পিতভাবে এ সহিংসতা চালিয়েছে। সমাবেশ শুরুর আগে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর বিএনপি মহাসচিবসহ শত শত বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিরোধী নেতাদের পরিবারের সদস্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ১০০ মামলা করা হয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া জানতে চান ওই প্রশ্নকারী।
জবাবে মুখপাত্র ম্যাথু মিলার বলেন, ‘২৮ অক্টোবর ঢাকায় যে রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছে, আমরা তার নিন্দা জানাই। পুলিশের এক কর্মকর্তা ও একজন রাজনৈতিক কর্মীর নিহত হওয়া, হাসপাতাল ও বাসে আগুন দেওয়া অগ্রহণযোগ্য। একইভাবে সাংবাদিকসহ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়।’
মুখপাত্র বলেন, অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ভোটার, রাজনৈতিক দল, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সুশীলসমাজ, গণমাধ্যমসহ সবার।
একই ব্যক্তি আরেক প্রশ্নে বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে বৈঠক করার কারণে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সমালোচনা করেছে সরকারপন্থি গণমাধ্যম ও তাদের সমর্থকরা। এসব প্রতিবেদন ইঙ্গিত দেয়, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করছে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি কি যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদন দেয়, জানতে চান প্রশ্নকারী সাংবাদিক।
জবাবে মিলার বলেন, কূটনীতিকরা সুশীল সমাজের সংগঠন, গণমাধ্যম পেশাজীবী, ব্যবসায়ী নেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন ব্যক্তি-সংগঠনের সঙ্গে কথা বলেন। কূটনীতিকরা তাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবেই এসব করেন। তারা তাদের এ কাজ করে যাবেন।
ব্রিফিংয়ে আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সশস্ত্র ক্যাডাররা পুলিশের ইউনিফর্ম পরে, পেট্রোলবোমা ও গানপাউডার ব্যবহার করে নিরীহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে। সরকারের পাশাপাশি জনগণের সম্পদ ধ্বংস করেছে। ক্ষমতাসীন দল বলছে, এসব হামলা বিরোধী দল চালিয়েছে। তারা ১৪ বছর ধরে এটি করছে। প্রশ্নকারী বলেন, তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিকভাবে সবাই স্বীকার করে যে, এসব হামলায় ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডার, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও অন্যকিছু লোক জড়িত। তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার কোনো পরিকল্পনা কি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আছে?
জবাবে মুখপাত্র মিলার বলেন, তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ-সম্পর্কিত আগের প্রশ্নে যে উত্তর দিয়েছেন, তা এ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সমর্থনে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে। তবে তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে তা কখনো আগেভাগে বলবেন না।
জাতিসংঘের আহ্বান : নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের স্টিফেন ডুজারিক বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাবেশে সহিংসতার খবরে জাতিসংঘের মহাসচিব উদ্বিগ্ন, যে সহিংসতায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে।
বাংলাদেশের সব পক্ষকে সহিংসতা, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা নির্বিচার আটক থেকে বিরত থাকতে জাতিসংঘ মহাসচিব আহ্বান জানিয়েছেন।
মুখপাত্র বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
দমনপীড়ন বন্ধ চায় অ্যামনেস্টি : অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক ক্যাম্পেইনার ইয়াসাসমিন কাভিরতেœ এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের বিরুদ্ধে তীব্র দমনপীড়ন চালানো হচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে ভিন্নমত পুরোপুরি দমনের এটি একটি উদ্যোগ বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভিন্নমত ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশ করার অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের সময় এবং পরে বারবার হত্যাকাণ্ড, গ্রেপ্তার এবং দমনপীড়ন মানবাধিকারের ওপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে দেওয়ার পরিবর্তে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন বন্ধে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের বিবৃতি : বাংলাদেশের সংকটের এ সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে সরকারকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর)। সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে একের পর এক সহিংসতার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দেশটিতে সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় আমরা রাজনৈতিক সব পক্ষের প্রতি এটা স্পষ্ট করার আহ্বান জানাচ্ছি যে, এমন সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়। সহিংসতা উসকে দেয় এমন বক্তব্য ও তৎপরতা থেকে বিরত থাকতেও আমরা রাজনীতিকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ এ ছাড়া নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের সময় ও নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের সব নাগরিকের মানবাধিকার সমুন্নত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।