আয়কর না দিয়ে অস্ত্রের লাইসেন্স

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে সাতটি মানদ- পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে একটি হলো আবেদনকারীকে অবশ্যই বছরে ন্যূনতম দুই লাখ টাকা আয়কর প্রদান করতে হবে। কিন্তু ন্যূনতম দুই লাখ টাকা আয়কর না দিয়েও চট্টগ্রামে অস্ত্রের লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। আয়ের প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তির তালিকায় আছেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও চিকিৎসক।

জানা গেছে, দুই বছর আগে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীর আয়কর প্রদানের তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠায় কর অঞ্চল-৩। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। গত ২০ সেপ্টেম্বর তথ্য অধিকার আইনে নির্দিষ্ট ফরমে তথ্য চেয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের আগ্নেয়াস্ত্র শাখায় আবেদন করেন এই প্রতিবেদক। প্রায় এক মাস পর ফিরতি উত্তর দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র শাখা জানায়, ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৭ (জ) অনুযায়ী কোনো তথ্য প্রকাশের ফলে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ক্ষুণœ হতে পারে বিধায় চাহিত তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।’ তবে আগ্নেয়াস্ত্র শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্লাবন কুমার বিশ্বাস গত রবিবার জানান, পিস্তলের লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে পর পর তিন বছর তিন লাখ টাকা, শটগানের ক্ষেত্রে ১ লাখ টাকা আয়কর প্রদানকারী হতে হবে। বছরে ন্যূনতম দুই লাখ টাকা আয়কর প্রদানকারী হতে বলে যে শর্ত ছিল সেটি ২০১৬ সালের আগে। আবেদনকারীর সব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর অস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়।

আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্সের একটি তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা আয়কর দিয়ে ২২ বোর রাইফেলের লাইসেন্স পেয়েছেন ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্লাবন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘২২ বোরের রাইফেল মনে হয় শটগানের কাতারে। তাই এই ব্যক্তি অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন।’ এদিকে আইনি বাধার কারণে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের আয়কর প্রদানের কোনো তথ্য গণমাধ্যমকে দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন কর অঞ্চল-২ চট্টগ্রামের কমিশনার মো. সামশুল আরেফিন। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশ ছাড়া দুদককেও সংশ্লিষ্ট আয়কর প্রদানকারীর বিষয়ে তথ্য দেওয়া যাবে না।

নাম প্রকাশ না করে কর অঞ্চল ২-এর এক কর্মকর্তা জানান, অনেক বড় শিল্পপতিও প্রকৃত আয়ের তথ্য গোপন করে অস্ত্রের লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আয়কর প্রদানে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন এমন দুই ডজন ব্যক্তির একটি তালিকা জেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তাদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আগ্নেয়াস্ত্র শাখা। তবে বিষয়টি জানা নেই বলে মন্তব্য করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্লাবন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমি আগ্নেয়াস্ত্র শাখার দায়িত্ব পেয়েছি দুই মাস আগে। তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।’

জানা গেছে, ২০১৩-২০১৪ থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কর অঞ্চল ৩-এ আয়কর প্রদানকারী ৫৫ জনকে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে ৪০ জনকে শটগান, ১০ জনকে পিস্তল, দুজনকে এনপিবি পিস্তল, একজনকে ২২ বোরের রাইফেল, একজন রিভলবার এবং আরেকজনকে দেওয়া হয়েছে একটি একনলা বন্দুকের লাইসেন্স।