অক্টোবরে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯৭ কোটি ডলার

দেশের মধ্যে ডলার বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘ দিন ধরেই। চরম আকারের সংকট তৈরি হয়েছে মার্কিন এ মুদ্রাটির। সংকট নিরসনে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরপরও কোনো কাজে আসছে না, সংকট আরও বেশি হচ্ছে। এ অবস্থায় ডলার আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স সংগ্রহ বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি প্রণোদনা দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছে ব্যাংকগুলো। এতে প্রতি ডলার রেমিট্যান্সে থেকে প্রবাসীদের স্বজনরা পাচ্ছেন বাড়তি ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা। এতে রেমিট্যান্সে প্রতি ডলারের দাম হয়েছে ১১৬ টাকার কিছু বেশি। যা খোলাবাজারের দরের চেয়ে বেশি। পাশাপাশি হুন্ডি দরের প্রায় কাছাকাছি। সার্বিক দিক বিবচনায় প্রবাসী বাংলাদেশির হুন্ডি (অবৈধ পথ) এড়িয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠাচ্ছে রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্সে নতুন জোঁয়ার সৃষ্টি করেছে। যা ডলার সংকট কমিয়ে রিজার্ভ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে সদ্য বিদায়ী অক্টোবর মাস শেষে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের (১৯৭ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার) রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১১০ টাকা ৫০ পয়সা ধরে) প্রায় ২১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার বেশি। আর প্রতিদিন এসেছে  প্রায় ৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার বা ৭০৫ কোটি টাকা। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণ হিসেবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়তি প্রণোদনা কাজে আসছে। প্রতি ডলারের ৫ শতাংশ প্রণোদনা করায় রেমিট্যান্স বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, অক্টোবর মাসের পুরো সময়ে ১৯৭ কোটি ৭৫ন লাখ ৬০ হাজার ডলার এসেছে দেশে। এর মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১৫ কোটি ৪৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার। বিষেশায়ীত দুই ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংকের (কৃষি ব্যাংক) মাধ্যমে এসেছে ৫ কোটি ৮২ লাখ ডলার। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১৭৫ কোটি ৮৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৬০ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আলোচিত সময়ে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি এমন ব্যাংকের সংখ্যা সাতটি। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা বিডিবিএল, বিশেষায়ীত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বা রাকাব, বেসরকারি কমিউনিটি ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, বিদেশি খাতেরহাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, ‘প্রণোদনা বৃদ্ধির ফলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ছে। আর রেমিট্যান্স বাড়লে আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হবে। এটি দেশের অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ১৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় (এক টাকা সমান ১০৯.৫০ টাকা ধরে) ১৪ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। এটি গত ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। এর আগে গত ২০১৯ সালের মে মাসে ১২৭ কোটি ৬২ লাখ ২০ হাজার ডলার এসেছিল। অন্যদিকে সংকটের মাঝে রেমিট্যান্স কমাকে ভালো চোখে দেখছেন না খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গত দুই বছরে কাজের জন্য দেশের বাইরে গেছেন ২০ লাখ প্রবাসী কর্মী। দেশের বাইরে প্রবাসী বাড়ছে, অথচ রেমিট্যান্স কমছে দিন দিন। এর কারণ খুঁজে সমাধানের দাবি তাদের।

এর আগে গত জুলাই মাসে ১৯৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের (১.৯৭ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আগস্টে এসেছিল ১৫৯ কোটি ৯৪ লাখ ডলারের প্রবাসী আয়। গত জুন মাসে রেকর্ড পরিমাণ ২১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার (২.১৯ বিলিয়ন ডলার) প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। একক মাস হিসেবে যেটি ছিল প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসা প্রবাসী আয়। এর আগে ২০২০ সালের জুলাই মাসে ২৫৯ কোটি ৮২ লাখ ডলারের রেকর্ড প্রবাসী আয় এসেছিল।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২০ সালে হুন্ডি বন্ধ থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলে সর্বোচ্চ সংখ্যক রেমিট্যান্স এসেছিল। বিদায়ী ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২ হাজার ১৬১ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। এটি এ যাবৎকালের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে করোনাকালীন ২০২০-২০২১ অর্থবছরে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৪৭৭ কোটি ডলারের রেমিটেন্স এসেছিল দেশে।

ফের দর বাড়ল ডলারের: ডলারের দর আরও ৫০ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকগুলো। বুধবার (১ নভেম্বর) থেকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানিকারকদের থেকে প্রতি ডলার ১১০ টাকা ৫০ পয়সায় কিনবে ব্যাংক। আর ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছে ১১১ টাকায় বিক্রি করবে। এতে আন্ত:ব্যাংকে (এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রি) ডলারের সর্বোচ্চ দর হবে ১১৪ টাকা। এর আগে ১১০ টাকায় ডলার কিনে সর্বোচ্চ ১১০ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রির সিদ্ধান্ত ছিল। 

মঙ্গলবার ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ অথরাইজড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এর যৌথ সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়। প্রতি ডলার বিক্রি ও কেনায় ৫০ পয়সা দর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে মাসে ২ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসবে, সেসব ব্যাংক অন্তত ১০ শতাংশ আন্তঃব্যাংকে বিক্রি করবে।আর আন্তঃব্যাংকে ডলারের সর্বোচ্চ দর হবে ১১৪ টাকা।

অন্যদিকে ডলার সংকটে বাজার ঠিক রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। আর গত অর্থবছরে বিক্রি করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে বিক্রি করা হয়েছিল ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। আর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে এখন ২০ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ২০২১ সালের আগস্টে যেটা ছিল রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।