মরুভূমির তীব্র গরমে পথচলা বেদুইনরাও বিভ্রান্ত হয় মরীচিকায়। প্রতিফলন দেখে তারা ভাবে, সামনেই বুঝি মরূদ্যান। যেখানে পাওয়া যাবে শীতল জল, গা জুড়ানো ছায়া। কিন্তু দৃষ্টিবিভ্রম হয় মরীচিকা দেখে। আলোর খেলায় পথভ্রষ্ট হয়ে মরুভূমিতে পথ হারাতে হয় মরীচিকা পিছু নিলে। আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি যেন বাংলাদেশ দলের সামনে সেই মরীচিকা, বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর শুদ্ধিকরণের পথ বাদ দিয়ে ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলাই যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় লক্ষ্য।
সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন দেখিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন সাকিব আল হাসান এবং কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। একের পর এক হারে সেটা এসে ঠেকেছে ১০ দলের ভেতর শীর্ষ আটে থেকে শেষ করায়! তাতে অর্জিত হবে ২০২৫ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার যোগ্যতা। সাকিব বলেছেন, ‘চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার জন্য আমাদের জিততে হবে। এই মুহূর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য আমরা নির্ধারণ করেছি।’ যেন বিশ্বকাপটা চ্যাম্পিয়নস ট্রফির বাছাইপর্ব! বিশ্বকাপে এসে হারতে হারতে তলানিতে নেমে আর কোনো লজ্জাবোধ নেই তার কণ্ঠে। একই রকম নির্লজ্জ বক্তব্য দিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজও। পাকিস্তানের কাছে হারের পর বলেছেন, ‘চ্যাম্পিয়নস ট্রফি যদি না খেলতে পারি তাহলে আমাদের সবার জন্যই খারাপ লাগবে। আমাদের বলেন বা আপনাদের (সাংবাদিকদের)! কারণ আপনারাও তো আমাদের মতো কভার করতে পারবেন না...।’ শুনে মনে হতে পারে, সাংবাদিকদের জন্য মন কাঁদছে মিরাজের। অথচ করোনা মহামারীর সময়, যখন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা নিউজিল্যান্ডে গিয়েছিলেন, তখন সে দেশের কঠিন জৈবসুরক্ষা নীতির কারণে কোনো গণমাধ্যমই সেখানে যেতে পারেনি। মাউন্ট মঙ্গানুইতে বাংলাদেশের টেস্ট জয়ের সাক্ষী তাই খেলোয়াড়দের বাইরে কেউই নেই!
সাকিব কিংবা মিরাজের এমন সব উত্তরে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ বুঝি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির অন্যতম সফল দল। সেই আসরে খেলতে না পারায় সবাই খুব মুষড়ে পড়েছেন। আসল সত্যিটা হচ্ছে, আইসিসির শীর্ষ দলদের নিয়ে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সুযোগ মিলেছেই কম। ১২ ম্যাচে মাত্র ২ জয়। সেই আসরে অংশগ্রহণ করতে না পারার হাপিত্যেশ আসলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকারই অপচেষ্টা।
১৯৯৮ সালে, ঢাকায় বসেছিল আইসিসি নকআউট ট্রফির প্রথম আসর। ক্রিকেটের বিশ্বায়ন ও ক্রিকেটের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে সে সময়কার আইসিসি প্রেসিডেন্ট জগমোহন ডালমিয়ার উদ্যোগে শুরু হয়েছিল এই নকআউট টুর্নামেন্ট। উদ্দেশ্য ছিল ক্রিকেটের উদীয়মান দেশগুলোতে যেন বিশ্বের সেরা ক্রিকেট তারকাদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে, ক্রিকেটের বিশ্বায়ন হয়। সেবার বাংলাদেশ আয়োজক হলেও মাঠে দর্শক। দুই বছর পর তাই নকআউট ট্রফি আয়োজন করা হয় কেনিয়াতে, সেবারে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে ৯ থেকে ১১ হলেও প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল পর্বে ছিল ৩টি ম্যাচ যেখানে অংশ নেয় ৬ দল। প্রতিযোগিতার ধরন ছিল নকআউটই, অর্থাৎ হারলেই বিদায়। সেবারই প্রথম এই প্রতিযোগিতায় খেলে বাংলাদেশ এবং ইংল্যান্ডের কাছে ৮ উইকেটে হেরে বিদায় নেয়।
২০০২ সালে শ্রীলঙ্কায় পরের আসরে বদল আসে টুর্নামেন্টের কাঠামোতে। ১২ দলের অংশগ্রহণে ৩ দলের চারটে গ্রুপ। সব গ্রুপের শীর্ষ দলকে নিয়ে সেমিফাইনাল এরপর ফাইনাল, অর্থাৎ বিদায় নেয় নকআউট চরিত্র আর নামকরণ করা হয় চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। দুটো গ্রুপ ম্যাচেই হারে বাংলাদেশ। ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডে একই ছকে পরের আসর, বাংলাদেশের অবস্থা সেখানে শোচনীয়। দুই ম্যাচের কোনোটিতেই পঞ্চাশ ওভার খেলতে পারেনি বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩২ ওভারে ৯৩ রানে অলআউট আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪০ ওভারে ১৩১ রানে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ম্যাচ বাড়ায় আসরের গুরুত্ব কমে আসছিল, সেই সঙ্গে ক্রমেই ব্যস্ততা বাড়ছিল বড় দলগুলোর। ২০০৬ সালে আবারও কাঠামো সংস্করণ, এবারে ভারতের মাটিতে মূলপর্বের আগে বাছাইপর্ব। ১ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে আইসিসি র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০ দলের সুযোগ হয় এই আসরে, অল্পের জন্য কেনিয়াকে পেছনে ফেলে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। মূলপর্বে যেতে হলে র্যাংকিংয়ের শেষ চার দল খেলে বাছাইপর্ব, সেখানে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে জিতলেও শ্রীলঙ্কা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে মূল পর্বের আগেই বিদায় বাংলাদেশের।
গ্রুপ পর্ব যুক্ত হওয়া, অর্থহীন ম্যাচের সংখ্যা বাড়া, রাজস্ব কমে আসা-সহ অনেক কারণেই ২০০৬ সালের পর এই আসরের ভবিষ্যৎ নিয়েই জেগেছিল শঙ্কা। ডালমিয়া আমলের অবসান হয়েছিল আইসিসিতে এবং বিসিসিআইতেও। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব বলয়ের বাইরে চলে গিয়েছিলেন ডালমিয়া। ভারত অংশ নিতে আপত্তি জানায় এবং ততদিনে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজন শুরু করে দেওয়াতে ২০০৮ সালে পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। নানান ঘটনা পরিক্রমায় সেটা হয় ২০০৯ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকায়। র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৮ দলের, দুই সপ্তাহে সংক্ষিপ্ত টুর্নামেন্ট। সেখানে বাংলাদেশের ঠাঁই হয়নি। চার বছর পর ২০১৩ সালেও একই অবস্থা, ইংল্যান্ডে জুন মাসের মাঝামাঝি দুই সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত আসর। সেরা আট দলে ব্রাত্য বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে, ইংল্যান্ডে পরবর্তী আসরে ঠাঁই হলো বাংলাদেশের। সেবারই একমাত্র বারের মতো মূলপর্বে খেলা। ২০০৬ সালের পর প্রথম সেবারই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলে বাংলাদেশ।
নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে আর ১৮২ রানের পুঁজি নিয়েও প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া যখন ১ উইকেটে ৮৩ রানে, বৃষ্টিতে খেলা থেমে যাওয়াতে প- হওয়া ম্যাচ থেকে পাওয়া ১ পয়েন্টের সুবাদে সেমিফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। সেখানে ভারতের কাছে ৯ উইকেটে হেরে বিদায় নেয়।
সব মিলিয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে মূলপর্ব ও বাছাইপর্ব মিলিয়ে বাংলাদেশ খেলেছে মোট ১২টি ম্যাচ। তাতে মাত্র ২ জয়, দুটো জয়ের মধ্যে পার্থক্য ১১ বছরের। যে প্রতিযোগিতায় বেশিরভাগ সময়েই অংশগ্রহণের সুযোগ হয় না বাংলাদেশের, বিশ্বকাপ ব্যর্থতা ভুলে সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারার আক্ষেপের মতো অপরিণামদর্শী কথাবার্তা দেশের ক্রিকেটারদের মুখে বেমানান। আরও হাস্যরসের জন্ম দেয় যখন মেহেদী হাসান মিরাজ মনে করেন, তারা না খেলায় সাংবাদিকদের একটি বিদেশ সফরের সুযোগ কমে এলো।
সবকিছুই আসলে বিশ্বকাপ ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টা, মরীচিকার মতো দৃষ্টিবিভ্রম ঘটানো। বিশ্বকাপে অর্থহীন হয়ে পড়া বাংলাদেশের বাকি দুটো ম্যাচের খানিকটা মানসম্মান ফেরানোর প্রয়াস। আর ভাগ্যচক্রে যদি দুটো ম্যাচে জিতে বাংলাদেশ ১০ দলের ভেতর ৮ম হয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেই ফেলে, তাহলে বিশ্বকাপকে সফল বলে প্রচারের ঢোল পেটানো হবে সর্বমহলে। যেমনটা করা হয়েছিল ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর, জিম্বাবুয়ে আর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয় পাওয়াকে প্রচার করা হয়েছিল বিরাট সাফল্য হিসেবে!