কোরআন মাজিদের সুরা হুজুরাতে (আয়াত ১০) ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ আয়াতটি দুনিয়ার সব মুসলিমকে এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে। দুনিয়ার অন্য কোনো আদর্শ বা মত ও পথের অনুসারীদের মধ্যে এমন কোনো ভ্রাতৃত্ব বন্ধন পাওয়া যায় না, যা মুসলিমদের মধ্যে পাওয়া যায়। ইসলামের শিক্ষা হলো, একজন মুমিন অপর মুমিনের বন্ধু ও অন্তরঙ্গ সাথী। জীবন চলার পথে সব অঙ্গনে তারা অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। এই বন্ধন অবিচ্ছেদ্য ও অ-ভঙ্গুর। সুখে-দুঃখে, কাজে-কর্মে, চিন্তা-চেতনার সর্বত্রই এর জোয়ার ধারা মুমিনদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে তোলে। এটা আল্লাহর এক অনুপম অনুগ্রহ। তা না হলে তাদের প্রীতি ও স্নেহের বাঁধনে আবদ্ধ করা কারও পক্ষে কোনোভাবে সম্ভব ছিল না।
আলোচন্য বিষয়ের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বহুসংখ্যক হাদিস হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। ওই সব হাদিসের আলোকে এ আয়াতের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোধগম্য হয়। যেমন হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার থেকে তিনটি বিষয়ে ‘বায়াত’ (আনুগত্যের শপথ) নিয়েছেন। এক. নামাজ কায়েম করব। দুই. জাকাত আদায় করতে থাকব। তিন. প্রত্যেক মুসলমানের কল্যাণ কামনা করব।’ -সহিহ বোখারি : ৫৫
নবী কারিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘এক মুসলিম আরেক মুসলমানের ভাই। সে তার ওপরে জুলুম করে না, তাকে সহযোগিতা করা পরিত্যাগ করে না এবং তাকে লাঞ্ছিত ও হেয় করে না। কোনো ব্যক্তির জন্য তার কোনো মুসলিম ভাইকে হেয় ও ক্ষুদ্র জ্ঞান করার মতো অপকর্ম আর নেই।’ -মুসনাদে আহমাদ : ১৬/২৯৭
হজরত রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘ইমানদারদের সঙ্গে একজন ইমানদারের সম্পর্ক ঠিক তেমন, যেমন দেহের সঙ্গে মাথার সম্পর্ক। সে ইমানদারদের প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট ঠিক অনুভব করে যেমন মাথা দেহের প্রতিটি অংশের ব্যথা অনুভব করে।’ -মুসনাদে আহমাদ : ৫/৩৪০
আরেক হাদিসে নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘পারস্পরিক ভালোবাসা, সুসম্পর্ক এবং একে অপরের দয়ামায়া ও স্নেহের ব্যাপারে মুমিনরা একটি দেহের মতো। দেহের যে অঙ্গেই কষ্ট হোক না কেন তাতে গোটা দেহ জ্বর ও অনিদ্রায় ভুগতে থাকে।’ -সহিহ বোখারি : ৬০১১
বর্ণিত কোরআন মাজিদের আয়াত ও হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলাররা বলেন, মুসলিম ব্যক্তি তার ওপর তার অপর মুসলিম ভাইয়ের অধিকারসমূহ আদায় ও আদবসমূহ মেনে চলার আবশ্যকতাকে বিশ্বাস করে ও মান্যতা দেয়। প্রকৃত মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে যথাযথ আদব রক্ষার পাশাপাশি তার অধিকারসমূহ আদায় করে। এর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জন করা যায়। কারণ, এসব অধিকার ও আদব আল্লাহতায়ালা মুসলিম ব্যক্তির ওপর বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। তেমনই কয়েকটি আচরণীয় বিষয় হলো-
এক মুমিন অপর মুমিনের প্রতি নিজ থেকে ইনসাফ করা এবং তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করা, যে ব্যবহার সে নিজে অন্যের কাছ থেকে আশা করে; কেননা, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানকে পরিপূর্ণ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটবে: ১. অভাবগ্রস্ত অবস্থায়ও দান করা, ২. নিজ থেকে ইনসাফ করা, এবং ৩. সালামের প্রচলন করা।’ -সহিহ বোখারি, আম্মার ইবন ইয়াসার (রা.)-এর সূত্রে।
মুমিন অপর মুমিনের ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে ও অভ্যন্তরীণ বিষয় গোপন রাখে। কোনো মুমিন অন্যের গোপন কথা কান পেতে শোনে না। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে কোনো বান্দা দুনিয়াতে অন্য বান্দার দোষত্রুটি গোপন রাখবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন।’ -সহিহ মুসলিম : ৬৭৬০
কোনো মুমিনের কোনো প্রয়োজনে তাকে সহযোগিতা করা এবং তার কোনো প্রয়োজন পূরণে সম্ভব হলে তার জন্য সুপারিশ করা; কেননা, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর নেককাজ ও তাক্ওয়ায় (আল্লাহভীতি) তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে।’ -সুরা আল মায়িদা : ২
আর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির পার্থিব কষ্টসমূহের মধ্য থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহতায়ালা তার কেয়ামতের দিনের কষ্টসমূহের মধ্য থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন; আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর অভাবের কষ্ট লাঘব করে দেয়, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার অভাবের কষ্ট লাঘব করে দেবেন; আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির দোষত্রুটি গোপন করবে, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষত্রুটি গোপন করে রাখবেন; আর বান্দা যতক্ষণ তার মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য করতে থাকে, আল্লাহও ততক্ষণ তার সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকেন।’ -সহিহ মুসলিম : ৭০২৮
তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা সুপারিশ করো, প্রতিদান পাবে; আর আল্লাহ যা চান, তিনি তার নবীর মুখ দিয়ে তা প্রকাশ করান।’ -সহিহ বোখারি : ১৩৬৫
কোনো জীবিত অথবা মৃত মুমিনকে গালি না দেওয়াও ইসলামের নির্দেশ। কেননা, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেওয়া পাপ এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করা কুফরি।’ -সহিহ বোখারি : ৬৬৬৫
তিনি আরও বলেন, ‘পরস্পরকে গালি প্রদানকারী দুই ব্যক্তির মধ্যে যে আগে গালি দিয়েছে, সে দোষী বলে গণ্য হবে, যতক্ষণ না নির্যাতিত ব্যক্তি (প্রথম যাকে গালি দেওয়া হয়েছে) সীমা অতিক্রম করবে।’ -সহিহ মুসলিম : ৬৭৫৬
এক মুমিন অপর মুমিনকে হিংসা করে না, অথবা তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করে না, অথবা তাকে ঘৃণা করে না, তার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করে না। কেননা, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাকো; কারণ কোনো কোনো অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না এবং একে অন্যের গিবত কোরো না।’ -সুরা আল হুজুরাত : ১২
আর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, নকল ক্রেতা সেজে আসল ক্রেতার সামনে পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে বলবে না, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা পোষণ কোরো না এবং পরস্পর পরস্পরের পেছনে লেগো না; আর তোমরা আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।’ -সহিহ মুসলিম : ৬৭০১
কোনো মুমিনকে কোনো মন্দ কিছুর দ্বারা আক্রমণ না করা অথবা তাকে কোনো অপছন্দনীয় কিছুতে না জড়ানো; কেননা, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির রক্ত (জীবন), ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান অপর সব মুসলিমের জন্য হারাম।’ -সহিহ মুসলিম : ৬৭০৬
নবী কারিম (সা.) আরও বলেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাতের অনিষ্ট থেকে অন্যান্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।’ -সহিহ বোখারি : ১০
প্রকৃত মুমিনরা আল্লাহতায়ালাকে যথার্থভাবে ভয় করে। তার নির্দেশ পালনে কোনো রকম শৈথিল্য প্রদর্শন করে না এবং তার নির্দেশের বিরোধিতা করে না। তাই তারা সর্বদাই আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে স্নেহ, করুণা ও অনুগ্রহ লাভ করে। মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো- আল্লাহর রজ্জু বা বিধানকে একতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ধারণ করা। বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতাকে সর্বতোভাবে বর্জন ও পরিহার করা। বর্তমানের স্বার্থান্ধ এই সময়ে উল্লিখিত কোরআন মাজিদের আয়াত ও হাদিসগুলোই একজন মুমিনের চূড়ান্ত পথনির্দেশ। কেননা, বিজয় ও সফলতা অর্জনে ঐক্য ও একতাবদ্ধতার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রত্যেক মুমিন যত তাড়াতড়ি বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করে জীবনে বাস্তবায়িত করবে, তত দ্রুত আসবে সাফল্য। আল্লাহতায়ালা আমাদের তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক
muftianaet@gmail.com