মোহাম্মদ হাশিম শাহিদি, বিশেষ কেউ নন অবশ্যই। তবে হাশমতউল্লাহ শাহিদির জন্য তিনি নিঃসন্দেহে বিশেষ একজন। নাম দেখে বুঝে ফেলার কথা সম্পর্কটা পারিবারিক, আফগানিস্তান অধিনায়ক শাহিদির বাবা হাশিম। ছিলেন পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক। লিখেছেন বিজ্ঞানের ৪৪টি বই! নিজের মতো ছেলেও পড়ালেখায় মনোযোগী হবে, এমনটা চাওয়া ছিল হাশিমের। বড় মাপের বিজ্ঞানী হিসেবে ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শাহিদির ভালো লাগত না পড়ালেখা। তার ভাষায়, ‘আমি পদার্থ বিজ্ঞান তেমন একটা পছন্দ করতাম না। পড়ালেখায় কখনই ভালো ছিলাম না।’ কুমার সাঙ্গাকারার ব্যাটিং আর বলিউড সিনেমা দেখে সারা দিন কাটত তার। শ্রীলঙ্কান ব্যাটিং গ্রেটকে আদর্শ মেনে শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেন তিনি বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে ৮৭ কিলোমিটার দূরে লোগার প্রদেশে জন্ম শাহিদির। পরিবার শিক্ষিত হওয়ায় পড়ালেখার জন্য চাপটা বেশি আসত। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি ভালোলাগা কাজ করত শাহিদির। বাবাকে শুরুতে কথা দিলেও অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পাওয়ার পর আর সেভাবে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া হয়ে ওঠেনি তার। পুরোদমে মনোযোগ দেন ক্রিকেটে। ২০১৩ সালে পেশাদার ক্রিকেটে পা রাখেন তিনি। জাতীয় দলে অভিষেকও হয়ে যায় তার ওই বছরই। শুরুতে দলে জায়গা থিতু করতে পারেননি। সময়ের সঙ্গে নিজেকে আরও ভালোভাবে গড়ে তোলেন। এখন আফগানদের নেতা ২৮ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
শাহিদির নেতৃত্বেই বিশ্বকাপে একের পর এক দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিচ্ছে আফগানিস্তান। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চমক দেখায় তারা। সেটা যে কোনো অঘটন ছিল না, সেটার প্রমাণ শক্তিশালী পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকেও হারিয়ে দেয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি। বৈশ্বিক আসরে প্রথমবার সেমিফাইনালে খেলার সম্ভাবনা এখন উজ্জ্বল আফগানদের। দলটির এমন সাফল্যে রশিদ খান, মুজিব উর রহমানদের মতো তারকারাই পাদপ্রদীপের নিচে। কিন্তু পুরো দলকে এক সুতোয় যিনি বেঁধে রেখেছেন, সেই শাহিদি বরাবরের মতোই আড়ালে। আফগান অধিনায়ক যেমন বললেন, ‘সবাই রশিদের সঙ্গে সেলফি তুলতে চায়। সে সুপারস্টার।’ তবে এতে অখুশি নন শাহিদি মোটেও। তার কাছে যে ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দলের সাফল্যই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ক্রিকেট নিয়ে একটি আক্ষেপ অবশ্য কাজ করতে পারে শাহিদির মনে। এই খেলার কারণে যে বাবার মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে পারেননি তিনি। ২০১৮ সালে যখন মারা যান হাশিম, তখন প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা নিয়ে ব্যস্ত শাহিদি। জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখের কথা বলেন তিনি এভাবে, “এখনো মনে আছে, দিনের খেলা শেষে ১২০ রানে অপরাজিত ছিলাম। বাবাকে ফোন করে বললাম দোয়া করতে, যেন ডাবল সেঞ্চুরি করতে পারি। সেদিন বাড়িতে মেহমান থাকায় বাবা ফোন ধরেই বলেন, ‘আমি ব্যস্ত আছি। কাল ডাবল সেঞ্চুরি পূরণ করো। এরপর তোমার সঙ্গে কথা হবে।’ তার সঙ্গে ওটাই শেষ কথা। এরপর বাবা যে ঘুমিয়ে পড়লেন। আর কখনো জাগেননি!”
বাড়ি থেকে ছয় ঘণ্টার দূরত্বে ছিলেন শাহিদি। মৃত্যুর খবর পেয়েই খেলা ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশে ছোটেন তিনি। তাই আর ওই ম্যাচে ডাবল সেঞ্চুরি পাওয়া হয়নি তার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি ঠিকই তুলে নেন তিনি ২০২১ সালের মার্চে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আবুধাবি টেস্টে। ঠিক ২০০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন। আফগানিস্তান ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টেস্টে এখন পর্যন্ত এটাই প্রথম ও একমাত্র দ্বিশতক। দুই টেস্টের ওই সিরিজে প্রথম ম্যাচ হারা আফগানরা দ্বিতীয়টি জিতে সমতা ফেরায়। ৬ উইকেটের ওই জয়ে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন শাহিদি। এর দুই মাস পর আফগানিস্তানের টেস্ট ও ওয়ানডে নেতৃত্ব দেওয়া হয় তাকে।
কয়েক মাস আগে শাহিদির জীবনে আরেকটি বড় ধাক্কা হয়ে আসে মায়ের মৃত্যু। মা হারানোর বেদনা ভুলে এত বড় দায়িত্বে মনোযোগী হওয়া শুরুতে তার জন্য বেশ কঠিন ছিল, ‘যখন আমি নেতৃত্ব পেলাম, দায়িত্ব সামলানো সহজ ছিল না। বোর্ড যখন আমাকে বলল, আমি এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছি। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল স্বার্থপর না হওয়া, শুধু দেশের জন্য খেলা। আল্লাহর রহমতে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।’ কঠিন সময় পেরিয়ে এখন সুসময় দেখছেন শাহিদি। তার নেতৃত্বে দারুণ ছন্দে আছে আফগানিস্তানও।
শুধু নেতৃত্ব দিয়েই নয়, বিশ্বকাপে ব্যাট হাতেও দারুণ ভূমিকা রাখছেন শাহিদি। মিডল অর্ডারে দলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তিনি। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পথে যথাক্রমে ৪৮ ও ৫৮ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। দুই ম্যাচেই দলের জয় সঙ্গে নিয়ে মাথা উঁচিয়ে মাঠ ছাড়েন সফল নেতার মতো। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৬ ইনিংসে ২২৬ রান করেছেন শাহিদি। আফগানদের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান তারই। ৭০ ওয়ানডের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শাহিদি এখন তাকিয়ে সামনের দিকে। বললেন, ‘আমাদের নজর কেবল সেমিফাইনালে খেলা। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।’ পদার্থ বিজ্ঞান বাদ দিয়ে ক্রিকেটকে বেছে নেওয়া শাহিদি স্বপ্নের সীমানায় পা রাখতে পারেন কি না, সেটা তোলা থাক সময়ের হাতে।
আজ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও নিশ্চয় বড় অবদান রাখতে চাইবেন। জিতলে সেমির দৌড়ে আরও ভালোভাবে টিকে থাকবে আফগানিস্তান। শাহিদিও নিশ্চয় তৃপ্তি নিয়ে কেক কাটতে পারবেন। শনিবার যে তার ২৯তম জন্মদিন!