‘জীবনডা এহন আর মিডা নাইরে ভাই, বাঁচা কঠিন অইয়্যা গেছে’

হাওয়াই মিঠাই লাগবে? হাওয়াই মিঠাই....? মিষ্টি নরম গোলাপি, সাদা হাওয়াই মিঠাই...! এমন হাঁক-ডাক দিয়ে স্কুল-কলেজ, পাড়া-মহল্লা ও শহরের অলিগলিতে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করেন মো. হাবলু মিয়া (৪০)। তার হাঁক-ডাক শুনেই ছুটে আসে শিশু-কিশোররা।

গতকাল বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর এলাকার দত্তপাড়া গ্রামের টিএন্ডটি রোডে দেখা মেলে তার। এই রোডের আল-সাফা কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড ইসলামিক একাডেমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করছিলেন হাওয়াই মিঠাই। এসময় কথা হয় তার সঙ্গে। হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে জীবন কেমন চলছে জানতে চাইলে হাবলু মিয়া বলেন, 'জীবনডা এহন আর মিডা (মিঠা) নাইরে ভাই, বাঁচা কঠিন অইয়্যা গেছে। একদল তো আগে থেকেই বাড়াইছে জিনিসপাতির দাম! এহন আবার আরেক দল হরতাল-অবরোধ ডাকি কমাইছে কামাই। হরতাল অবরোধের লাগি এহন বেশি বাইর অইতে (বের হতে) পারি না। বাইর অইলেও ভাড়া বেশি লাগে। যে টেহা কামাই (আয়) করি তা দিয়া নিজের থাকা খাওয়া, যাতায়াত খরচ আর বাড়িতে বউ-পোলাপানের খরচ পাঠাতেই জীবন.........!'

আলাপচারিতায় হাবলু মিয়া জানান, ময়মনসিংহ সদরের শম্ভুগঞ্জ রেলস্টেশন এলাকায় একটি বাসা কয়েকজন যৌথভাবে ভাড়া নিয়ে থাকেন। তার বাড়ি জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার ক্ষুদ্রদলাই এলাকায়। তিনি ৪ বছর ধরে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় থাকেন। সেখানে থেকে জেলার ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল, গৌরীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করেন। স্ত্রী আর দুই ছেলেসহ চার সদস্যের সংসার তার। বড় ছেলে মেরাজ এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী আর ছোট ছেলে মোস্তাকিম সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। হাবলু মিয়া তার স্বল্প আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মিলাতে না পেরে এখন ছেলেদের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, প্রতি প্যাকেট হাওয়াই মিঠাই ১০ টাকা করে বিক্রি করেন। নগদ টাকা দিয়েও বিক্রি করেন, আবার চুল ও ভাঙাচোরা মোবাইল দিয়েও বিক্রি করেন। তবে মোবাইল ও চুল দিয়ে বিক্রি করলে লাভ বেশি হয়। তিনি হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা উপার্জন করেন। মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয় তার। কোনো কোনো মাসে আরও বেশিও হয়। ১৫ হাজার টাকা দিয়ে নিজের থাকা খাওয়া, যাতায়াত খরচ বাদে মাসে পরিস্থিতি অনুযায়ী বাড়িতে পাঠাতে পারেন ৭-৮ হাজার টাকা। কিন্তু এখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, নতুন মাত্রা যোগ করেছে চলমান হরতাল-অবরোধ।

হাবলু মিয়া বলেন, ‘দেশে এহন যা শুরু অইছে আমগোর মতোন গরিব লোকদের বাঁচার উহাই (উপায়)। এক সের চাল ৬০ টেহা, এক সের সবজি ৭০ টেহা। কী খায়া বাঁচমো কন? তার ওপর এহন যে কামাই করমো, তারও উপায় নাই।’

ছেলে-মেয়েদের জন্য শখ করে মিঠাই কিনতে আসা মাদ্রাসা শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম বলেন, 'আমরা মধ্যবিত্ত মানুষেরাই এখন দিনাতিপাত করতে বেগ পেতে হচ্ছে, আর হাবলু মিয়াদের মতো মানুষদের অবস্থা তো আরও করুণ। এই সমস্যা লাঘবে সরকারের উচিত কঠোর হস্তে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। আর সকল রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত আলোচনার টেবিলে বসে রাজনৈতিক সংকট দূর করা।'