গরিবের দরদি এক চিকিৎসক

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ তার বাবা। বাবার অনুপ্রেরণাতেই চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম। তবে রোগীর কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নেন না তিনি। বরং কম টাকায় সেবা দেন কিডনি রোগীদের। বিনা পারিশ্রমিকে ১ হাজার ৪৫০টি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন এ শল্য চিকিৎসক, যা দেশের মোট কিডনি প্রতিস্থাপনের এক-তৃতীয়াংশ।

কিডনি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। কোনো কারণে দুটো কিডনি বিকল হয়ে গেলে অন্যের কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকা যায়। কিডনি প্রতিস্থাপন অনেক জটিল ও ব্যয়বহুল। ভারতে একটি কিডনি প্রতিস্থাপনে ব্যয় হয় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। রাজধানীর শ্যামলীতে ডাক্তার কামরুলের প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপনে মাত্র ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়।

কম খরচে কিডনি রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে তিনি বেসরকারি হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে প্রতিমাসে গড়ে ২০টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। কিডনিসংক্রান্ত অন্য রোগের চিকিৎসাও হয়। কিডনি প্রতিস্থাপনে বিশেষজ্ঞ সার্জনের ফি তিনি নেন না। রোগীদের ফলোআপ পরীক্ষার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ ও রিপোর্ট দেখার ফিও নেওয়া হয় না তার হাসপাতালে।

গত বুধবার রাতে শ্যামলীতে তার চেম্বারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা কয়েকশ রোগীর ভিড়। অধিকাংশই গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। কারও কিডনিতে পাথর, কারও কিডনি বিকল, কারও কিডনিসংক্রান্ত জটিলতা। তারা চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। চেম্বারের ভেতরেও অনেক রোগী। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা পর ভিড় কিছুটা হালকা হলে চেম্বারের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, রোগীদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন ডা. কামরুল। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন একের পর এক।

একজন রোগীর কিডনিতে পাথর হয়েছে। তিনি অপারেশন করাতে চান। কিন্তু ডাক্তার কামরুল রিপোর্ট দেখে বললেন, এটা ওষুধেই সারবে। শুধু শুধু কেন খরচ বাড়াবেন। আরেক রোগী অন্য হাসপাতাল থেকে এসেছেন তার কাছে অপারেশনের জন্য। তিনি বললেন, ওই হাসপাতালেই অপারেশন করান। ভালো হবে। ওখানে অভিজ্ঞ ডাক্তার আছে। কিন্তু রোগীর স্বজনরা নাছোড়বান্দা তার হাসপাতালেই অপারেশন করাবেন তারা।

প্রায় ৬০ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তি কিডনি প্রতিস্থাপনের কথা বললে ডাক্তার কামরুলের পরামর্শ এ বয়সে এটা করা ঠিক হবে না। আপনাকে ডায়ালাইসিস করতে হবে। হাসপাতালে না এসে বাসায় থেকেই তা করতে পারেন। খরচও কম, ঝামেলাও কম।

পাবনার পাকশীতে জন্ম ডা. কামরুল ইসলামের। ১৯৮৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে পরে যুক্তরাজ্য থেকে এফআরসিএস ডিগ্রি নেন। আরও একাধিক উচ্চতর ডিগ্রি রয়েছে তার। ১৯৮২ সালে তখনকার আটটি মেডিকেল কলেজের সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। ১৯৯৩ সালে স্বাস্থ্য ক্যাডারে কর্মজীবন শুরু করে ধাপে ধাপে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হন। পরে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক হিসেবে চাকরি শুরু করেন। সেখান থেকে অবসর নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সিকেডি হাসপাতাল।

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতার শুরুতেই কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে নিয়ে এত লেখালেখি না করে কীভাবে ভালো ডাক্তার হওয়া যায়, ভালো মানুষ হওয়া যায় সে বিষয়ে লিখলে মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে। ভালো মানুষ হওয়া কঠিন কিছু নয়। আমরা শুধু টাকার পেছনে ছুটি। টাকায় সম্মানও নেই, শান্তিও নেই। টাকা স্থায়ীও নয়। সৃষ্টিকর্তা সব দিতে পারে। সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে। মানুষের উপকারে কাজ করতে হবে আমাদের।’ তিনি বলেন, ‘টাকা টাকা না করে দেশের জন্য ভালো কাজ করা উচিত। সৃষ্টিকর্তা নিখুঁত কাজ পছন্দ করেন। তাই নিখুঁত কাজ করতে হবে। ডাক্তার ও অন্য সব পেশার ক্ষেত্রেই একই কথা।’

তার ভাষায়, ‘মানুষ সেবার বিনিময়ে এমনিতেই টাকা দিয়ে যাবে। জীবনযাপনের জন্য তো খুব বেশি টাকা লাগে না। অপ্রয়োজনীয় কোনো কিছুই ভালো নয়। আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টাকার অভাব হবে না। কিন্তু নৈতিকতার অভাব দেখা দেবে। মানুষ অর্থ উপার্জন করে অবৈধ পন্থায়, যেটা মোটেও ঠিক নয়। এতে নিজের ও পরিবারের এবং দেশের ক্ষতি। অল্পতে তুষ্ট থাকা উচিত।’

‘আমি একটা রোগীর কাছ থেকে ৮০০ টাকা না নিয়ে দুটো রোগী দেখে ৮০০ টাকা আয় করতে পারি। এতে আমার আয়ও ঠিক থাকল, আবার মানুষ কম টাকায় সেবা পেল। গ্রামের বহু দরিদ্র রোগী আমার কাছে আসে। তাদের আমার বেশি ভালো লাগে। কারণ তারা স্বার্থপর হয় না। তাদের সেবা দিলে মনে তৃপ্তি পাওয়া যায়। বড়লোকদের সেবা দিয়ে এ তৃপ্তি পাওয়া যায় না। তাদের জন্য অনেক বড় হাসপাতাল আছে। কেউ ইচ্ছে হলে বিদেশে যেতে পারে। তবে জমিজমা বিক্রি করে বিদেশে চিকিৎসার কোনো দরকার নেই। আমাদের দেশে অনেক বিষয়ে ভালো ডাক্তার আছে’ বলেন ডাক্তার কামরুল।

রোগীর অপারেশনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে একটু বেশি চার্জ নেওয়া হয় উল্লেখ করে ডা. কামরুল বলেন, ‘আমরা চার্জ কম নিই। ডাবল চার্জ না নিয়ে দুটো অপারেশন করি। এতে সময় একটু বেশি লাগে, পরিশ্রমও বেশি হয়। কিন্তু মানুষের সুবিধা হয়। আমাদের দেশে ক্রনিক ডিজিজে আক্রান্ত রোগী আছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদি বা আজীবন চিকিৎসা নিতে হয়। কিছু আছে ‘ওয়ানটাইম ট্রিটমেন্ট’-এর রোগী। ওয়ানটাইম রোগীদের কাছ থেকে যে আয় হয় তার একটা অংশ আমরা ক্রনিক ডিজিজে আক্রান্ত রোগীদের পেছনে ব্যয় করি। এটা অর্কিড থিওরির মতো। অর্কিড যেমন বড় গাছ থেকে তার পুরো নিউট্রিশন নিয়েও বড় গাছের ক্ষতি করে না, আমাদের সেবাপ্রক্রিয়াকেও তেমন হতে হবে। অর্কিড সুন্দর ফুল দেয়, মানুষ তার দিকে তাকায়।’

তিনি বলেন, ‘এ হাসপাতাল একটা বড় গাছের মতো। এখানে নানারকম সেবা দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে যে আয় হয় তার একটা অংশ আমরা কিডনি প্রতিস্থাপনের রোগীদের পেছনে ব্যয় করছি। তাদের প্রত্যেক মাসেই পরীক্ষার জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ব্যয় হয়। কিডনি ভালো রাখতে এটা আজীবন করা লাগে। এ টেস্ট আমাদের এখানে ফ্রি। প্রতিমাসে আমরা প্রায় ৪-৫ লাখ টাকার টেস্ট ফ্রি করি। কীভাবে আমরা এ ব্যয় মেটাই? আমরা যে জায়গায় অপারেশন করি সে জায়গার ভাড়া ধরি না। হয়তো এক হাজার বর্গফুট জায়গা হবে। আমার এ হাসপাতাল প্রায় ৪৫ হাজার বর্গফুট বা এর বেশি জায়গা আছে। এক হাজার বর্গফুটের ভাড়া না নিলে খুব একটা ক্ষতি হবে না। ওই জায়গার আসবাব, ডেকোরেশন, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য খাতে যে ব্যয় হয় তা আমি এককালীন হিসেবে দিয়ে দিই। প্রতিদিন তো আর দেওয়া লাগে না। এভাবে আমরা অ্যাডজাস্ট করি।’

ডাক্তার কামরুল জানান, তার কাছে ১৫ বছর আগে কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন এমন পুরনো রোগীও আছেন, যারা প্রতিমাসে বিনামূল্যে কিডনি পরীক্ষার সুযোগ পান। না হলে ফলোআপে আসে না। এতে কিডনির ক্ষতি।

তিনি বলেন, ‘অনেকেই টাকা দিতে চায় কিন্তু আমি নিই না। এ অর্থের অপব্যবহার হয়ে যাওয়ার ভয়ে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবরা জোর করে দিলে তাদের টাকা রেখে গরিব রোগীদের দিয়ে দিই। আমাদের এখানে ডায়ালাইসিস করতে দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। এটা অলাভজনক সেবা। কেউ মেশিন কিনে দিলে এখানে ব্যবহার করি।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে লিভার প্রতিস্থাপন, বোনম্যারো প্রতিস্থাপন সেবার ভালো ব্যবস্থা নেই। এ ধরনের কাজ করার ইচ্ছে আছে। আমাদের দেশে ভেলরের সিএমসি নেই। আমার ইচ্ছে ওই মানের হাসপাতাল করা, যেখানে মানুষ কম খরচে মানসম্পন্ন চিকিৎসা পাবে।’