আদিতে শুধু পুরুষ শিকারে যেত আর নারী ঘরে বসে বাচ্চা লালন-পালন করত, মানবেতিহাসের প্রচলিত এ ধারণা ভেঙে গেছে সম্প্রতি। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
মানবসভ্যতার যে প্রচলিত ইতিহাস, তাতে আমরা জানি আদিতে পুরুষ ছিল শিকারি। আর নারী সন্তান লালন-পালনে ব্যস্ত থাকত। পুরুষ শিকার করার মধ্য দিয়ে মানব বিবর্তনের প্রধান চালক হিসেবে আবির্ভূত হয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই শ্রম বিভাজনই প্রতিষ্ঠিত। যার ব্যাখ্যায় বলা হয়, যেহেতু পুরুষ ছিল শারীরিকভাবে শক্তিশালী, তাই তারা শিকারের দায়িত্ব পালন করত। আর নারী ছিল কিছুটা দুর্বল। তাদের সন্তান ধারণ করতে হতো। প্রায় দশ মাস তারা গর্ভাবস্থায় ভারী কোনো কাজ করতে পারত না। সন্তান জন্মদানের সময়ও তাদের শরীর বাইরে যাওয়ার উপযুক্ত ছিল না। ফলে সন্তান লালন-পালনের প্রয়োজনে ঘরেই থাকত তারা। ফলে শিকারে যেত না। বরং পুরুষ যেসব শিকার ধরে আনত, সেগুলো তারা সংরক্ষণ করে রাখত। আর এ সময় কৃষিকাজ করত।
এ ধারণা পাল্টাতে শুরু করেছে সম্প্রতি। চলতি বছরের জুন মাস থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিজ্ঞান সাময়িকীতে এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে নারীর শিকার করার বিভিন্ন প্রমাণ ও যুুক্তি উপস্থাপন করা হয়।
যদিও দীর্ঘ সময় ধরে এ নিয়ে গবেষণা চলে আসছিল। বিশেষত ২০২০ সালের দিকে বিষয়টি আলোড়ন তোলে। ধীরে ধীরে অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ এর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।
প্রচলিত ইতিহাস
নৃবিজ্ঞানী রিচার্ড বি. লি এবং ইরভেন ডিভোর তাদের প্রকাশিত ‘ম্যান দ্য হান্টার’ বইয়ে প্রচলিত তত্ত্বটি প্রকাশ করেন ১৯৬৮ সালে। তারা নৃতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং জীবাশ্মবিদ্যার প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে যুুক্তি দিন যে, শিকারই মানব বিবর্তনকে চালিত করেছে এবং এর ফলে মানুষ অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়েছে, যার কৃতিত্ব পুরুষের।
তাদের মতে, শিকারি হিসেবে মানুষ সভ্যতা গড়ে তোলার অন্যান্য যোগ্যতা অর্জন করেছিল। যেমন জিনগত পরিবর্তন, উদ্ভাবনী শক্তি, কণ্ঠ যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং সামাজিক জীবনের সমন্বয় করতে পারা।
কিন্তু ‘ম্যান দ্য হান্টার’র গবেষকরা এমন সব প্রমাণ উপেক্ষা করেছেন, যেগুলো তাদের নিজস্ব প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যায়। উদাহরণ হিসেবে সায়েন্টিফিক আমেরিকা জানাচ্ছে, উত্তর জাপান এবং এর আশপাশের অঞ্চলের একটি আদিবাসী গোষ্ঠী হলো ‘আইনু’। যাদের নারীরা প্রায়ই কুকুরের সাহায্যে শিকার করে। ‘পুরুষই শিকারি ছিল’ তত্ত্বের প্রবক্তারা অবশ্য এ বিষয়ে চুপ মেরে যান।
সিনেমা-সিরিজে
দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ষাটের দশকে মুক্তি পায় সিনেমা ‘ওয়ান মিলিয়ন ইয়ারস বি.সি.’। ওই সিনেমায় দেখানো হয় পুরুষ বড় বড় শিকারের জন্য গুহার বাইরে যাচ্ছে আর ভীতসন্ত্রস্ত নারীরা গুহায় থাকছে। তারা যখন দেখতে পাচ্ছে চারপাশ নিরাপদ, তখন গুহা থেকে বের হয়ে কখনো মাছ শিকারেও যাচ্ছে। এ ধরনের দৃশ্য পুরুষই শিকার করত এমন ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে। আর নারীদের দেখায় ভীত প্রাণী হিসেবে।
যদিও জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত সিরিজ ‘নেকেড অ্যান্ড অ্যাফ্রেড’ এবং ‘উইমেন হু হান্ট’ ইত্যাদিতে দেখা যায় নারীরাও শিকারে যাচ্ছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে এসবের নিষ্ঠুর সমালোচনা হয়েছে এবং সেগুলোকে ‘নারীবাদী’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
পাল্টাচ্ছে ধারণা
নারীরা শিকারে যেত না, এ ধরনের বয়ান তৈরির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয় ইতিহাস লেখকরা ছিলেন পুরুষ। তারা ইতিহাস লেখার সময় নারীদের উপেক্ষা করেছেন। যখন নারীরা প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় এলেন। তারা দেখতে পেলেন পুরুষদের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের বাইরে ভিন্ন ঘটনাও আছে। তারা দেখতে পাচ্ছেন, মানব ইতিহাসের আদিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও জোরালো ছিল।
সুইডেনে ২০১৭ সালের একটি ঘটনায় দেখা যায়, একটি মরদেহের অবশেষ পাওয়া গেছে অস্ত্র ও সরঞ্জামসহ। ওই মরদেহটি ভাইকিং যোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলে ধরে নেওয়া হয়। আর তাকে চিহ্নিত করা হয় পুরুষ হিসেবে। কিন্তু পরে গবেষণাগারে জানা যায় ওই মরদেহটি ছিল একজন নারীর। গবেষকদের এ ধরনের অন্তর্নিহিত পক্ষপাতের কারণে ‘শিকারে নারীরা অংশ নিতে পারত না’ এ ধারণাই প্রতিষ্ঠিত।
নিউইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, পুরুষকেন্দ্রিক এ আখ্যান ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। যার শুরুটা হয় ২০১৮ সালে। তখন একটি আবিষ্কারের কথা শোনা যায়। গবেষকরা পেরুতে খননের সময় একজন নারী শিকারির অবশেষ খুঁজে পান। তারা নারীর দাঁত এবং পায়ের হাড়ের টুকরার সঙ্গে শিকারের হাতিয়ারও দেখতে পান। তারা ২০২০ সালে এ মত দেন যে, ১৪ হাজার থেকে আট হাজার বছর আগে নারীরাও শিকারের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
গবেষকরা আরও কয়েকটি কবরে নারী এবং পুরুষের হাড়গোড় খুঁজে পান। তারা অনুমান করছেন, কবর দেওয়ার সময় নারী এবং পুরুষ উভয়ের সঙ্গেই শিকারের হাতিয়ার মরদেহের সঙ্গে রেখে দেওয়া হতো। যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে, নারীরাও শিকারে যেত। তবে এগুলোর কোনোটাই স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের সুযোগ নেই। যে কারণে এ-সংক্রান্ত আরও বেশি গবেষণা ও আবিষ্কারের ওপর নির্ভর করতে হবে।
এরপর গবেষকরা আরেকটি পদ্ধতিতে গবেষণা চালান। তারা বর্তমান সময়ের কিছু মানবগোষ্ঠীর ওপর জরিপ পরিচালনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিবেদক নুরিথ আইজেনমান বলেন, মানুষ কৃষি এবং বসতি গড়ে তুলে সভ্য হতে শুরু করলেও সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রত্যন্ত প্রান্তে অনেক গোষ্ঠী রয়েছে যারা এখনো আদিম খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন করছে। নৃতাত্ত্বিকরা তাদের নিয়ে গবেষণা করেন এবং বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করেন, যা থেকে আদি মানবসমাজ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। এমন কয়েকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী এসব আদিম সমাজের নারীরা শিকারে যুক্ত।
চলতি বছরের জুনে ‘পাবলিক লাইব্রেরি অব সায়েন্স’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ^জুড়ে ৬৩টি সমাজে জরিপ চালিয়ে গবেষকরা জানতে পেরেছেন, নারীরা শিকার এবং সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নেয়। সিয়াটল প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞান বিভাগের অ্যাবিগেল অ্যান্ডারসন পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা সব ধরনের শিকারে অংশ নিয়েছে। নারীরা শিকারের ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি অস্ত্র ব্যবহার করেছিল।
তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাতৃত্বের অবস্থা নির্বিশেষে নারীরা তেমন একটি সমাজের ৫০টি শিকারে অংশ নিয়েছে, যা মোট শিকারের ৭৯ শতাংশ। এ ছাড়া ৭০ শতাংশেরও বেশি শিকার নারীরা করেছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। হঠাৎ ঘটনাচক্রে তারা শিকার করেছে কম। নিজেদের প্রয়োজনে, প্রস্তুতি নিয়ে শিকার করার সংখ্যা ছিল বেশি। তারা দেখেছেন, যেসব সমাজে শিকার জীবিকা নির্বাহের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে নারীরা শতভাগ শিকারে অংশ নিয়েছে।
ছোট না বড়
তবে নারী শিকারে যেত এ বিষয়ে কেউ কেউ একমত হলেও তারা বলছেন, নারী ছোট শিকারে যেত। যেমন মাছ, খরগোশ এসব। যে কারণে নারীর শিকারের হাতিয়ারে ছিল বৈচিত্র্য। তারা শিকারের কাজে জাল ব্যবহার করত, যা পুরুষ করত না। এ ছাড়া নারী শিকার করত কয়েকজন মিলে। সঙ্গে থাকত তাদের শিশু ও কুকুররা। সবাই একসঙ্গে নেমে পড়ত শিকারে। নারীরা শিকার প্রশিক্ষণও নিত। তারা হাতিয়ার ঘষামাজা করত। গবেষকরা বলছেন, নারী বড় ধরনের শিকারেও যেত। তারা পুরুষদের সঙ্গেই শিকারে যেত বিভিন্ন সময়।
কারণ গর্ভবতী হওয়ার যে যুক্তি দেখানো হয়, তাতে কিছু ফাঁক আছে। হাড়ের কার্বন, স্ট্রনটিয়াম এবং ক্যালসিয়াম অধ্যয়ন থেকে জানা যায় যে, আদিতে শিশুরা চার বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ পান করত। যার অর্থ দুটি অন্তর্বর্তী গর্ভধারণের মধ্যে কয়েক বছরের ব্যবধান থাকত।
ফ্রান্সের সেন্টার ফর ন্যাশনাল রিসার্চের পরিচালক ভিনসেন্ট বাল্টার লিখেছেন, প্যালিওলিথিক নারী প্রায় ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তান ধারণে সক্ষম ছিল। যদি তারা ১৪ বছর বয়সে প্রথম সন্তান নেয় আর প্রতি সন্তান চার বছর ধরে বুকের দুধ খায়; তাহলে ওই সময়ে একজন নারী সর্বোচ্চ পাঁচ বা ছয়টি জন্ম দিত।
এ থেকে অনুমান করা হয় যে, নারী সবসময় গর্ভবতী থাকত না। বড় একটা সময় তারা শিকারের জন্য উপযুক্ত ছিল। গবেষকরা আরও বলছেন, নারীর শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়, তাতেও গাফিলতি আছে। পুরুষ শারীরিকভাবে যদি ভারী কিছু তুলতে সক্ষম হয় তাহলে নারী দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে সক্ষম। পুরুষ যদি মুহূর্তে কোনো একটি শিকারকে ধরে ফেলতে পারে তাহলে হয়তো নারী সেই শিকারকে ধরতে কিছু বেশি সময় ব্যয় করে। কিন্তু শারীরিক সক্ষমতার পার্থক্য প্রমাণ করে না যে, নারী বড় শিকার করতে পারত না।
ডিসকভারি ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৬ শতাংশ নারী ছোট শিকারে যুক্ত ছিল আর ৪৮ শতাংশ নারী করত বড় শিকার।
প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস
গবেষকরা আরও বলছেন, নারীর সঙ্গে প্রকৃতির এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি হতো নানা কারণে। নারীর পক্ষে জঙ্গলের পরিবেশ, পরিস্থিতি বোঝা সহজ ছিল। তারা জানতে পারত কখন কোন রঙ ও শব্দ প্রকৃতিতে হাজির থাকছে। পশু-প্রাণীদের নড়াচড়ার বিষয়েও তাদের বিশেষ জানাশোনা থাকতে পারে। এসব বিচারে নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল পশুর স্বভাব বিশ্লেষণ করে শিকারের পদ্ধতি অবলম্বন করা। যা পুরুষ শিকারিদেরও কাজে লাগত। এ ছাড়া হাতিয়ার তৈরি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিকার কার্যক্রমকে উন্নত করতেও নারীর ভূমিকা ছিল বলে গবেষকরা ভাবছেন।
বর্তমান সময়ে নারী ও পুরুষের সামাজিক বৈষম্য অনেক কমে এসেছে। তারপরও নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত। এ ভাবনার ভিত্তিমূলে রয়েছে পুরুষ শিকার করত, নারী নয়। নারী ও পুরুষের প্রচলিত বৈষম্য দূর করতে হলে, এসব ধারণা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। আর সেসব গবেষণা করতে হবে নিরপেক্ষভাবে। পুরুষ এবং নারী উভয়ের যৌথ প্রয়াস সঠিক ইতিহাসের কাছাকাছি আমাদের নিয়ে যেতে পারে।
নারীর ভূমিকাকেই কোনো কোনো গবেষক গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। তারা বলছেন, সন্তান পালনের মাধ্যমে বংশরক্ষাই শুধু করত না। তারা শিকারেও অংশ নিত, গুহাচিত্র অঙ্কন করত।