পত্রিকায় রিপোর্ট করেও কিছুই করতে পারবেন না: চেংনা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক

গাজীপুরের কাপাসিয়ার বারিষাব ইউনিয়নের চেংনা উচ্চ বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুনীর্তির মাধ্যমে চারজন শিক্ষক ও চারজন কর্মচারি নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ওই বিদ্যালয়ের জমিদাতা মো. আব্দুল খালেক আকন্দ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে দাবি তার। প্রধান শিক্ষক মো. মনির হোসেন তার অনিয়ম দুনীর্তির বিরুদ্ধে সাত শত পত্রিকায় রিপোর্ট করেও আমার কিছুই করতে পারবেন না বলে চ্যালেঞ্জ করেন।

গত বুধবার সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের চেংনাগ্রামে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চেংনা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়টি সম্প্রতি উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে এমপিও ভুক্তির সম্ভাবনা দেখা দিলে বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. মনির হোসেন চার শিক্ষক ও চার কর্মচারি নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুনীর্তির আশ্রয় নিয়েছেন বলে এলাবাসীর অভিযোগ। চারজন শিক্ষকের মাঝে তিনজনকে সাবেক প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে ও ভুয়া নিয়োগ কমিটি সাজিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন বলে তারা দাবি করেন। চাঞ্চল্যকর এ বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে জমিদাতা ও দাতা সদস্য মো. আব্দুল খালেক আকন্দ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, উপ পরিচালক, স্থানীয় সংসদ সদস্য, গাজীপুর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না।

অভিযোগসমূহ ও ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারিদের বেতন ভাতা বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সহকারী শিক্ষক মো. সাহাবউদ্দিন ও মো. মাজহারুল ইসলামের যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে ২০০৪ সালের ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ এবং সহকারী শিক্ষক মো. আবু তাহেরের যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে ২০০৫ সালের ৭ মার্চ। সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বন্দুকসীর জাল স্বাক্ষরে প্রদত্ত তাদের নিয়োগপত্রে ‘চেংনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে লেখা রয়েছে। অথচ একই প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষরিত ২০০৮ সালে সহকারী শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিনের বৈধ নিয়োগপত্রে বিদ্যালয়ের নাম লেখা আছে ‘চেংনা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়’। ২০০৯ সালের নভেম্বরে ওই প্রধান শিক্ষক অবসরে গেলে চেংনা গ্রামের আব্দুল মান্নান ডাক্তারের ছেলে ও পার্শ্ববর্তী নরোত্তমপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীর চর্চা শিক্ষক মো. মনির হোসেন বিধি বহির্ভূতভাবে ২০১০ সালের ১ এপ্রিল প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ওই সময় শরীর চর্চা শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক হওয়ার কোনো বিধান ছিল না বলে অভিযোগ করা হয়। এমনকি অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক মো. সাহাবউদ্দিনকে সম্প্রতি সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ২০২২ সালের জুলাই মাসে ওই বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী তানজির আকন্দ, নিরাপত্তাকমী মো. রায়হান, নৈশ প্রহরী মোঃ মমিন এবং অফিস সহায়ক মোঃ কাউছারের নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, দুনীর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ করা হয়েছে।

ওই বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম বাবুল জানান, ২০২২ সালে তার ছেলে মো. বিপ্লবকে অফিস সহকারী পদে নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাসে প্রধান শিক্ষক মো. মনির হোসেন বিভিন্ন পর্যায়ের অফিস খরচ বাবদ ১ লাখ টাকা দাবি করলে তিনি এক সাথে সম্পূর্ণ টাকা দিয়ে দেন। বহু প্রার্থীর কাছ থেকে এভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়ে পরবর্তী সময়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তানজির আকন্দকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। এখনো তাদের সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করেননি বলে তিনি দাবি করেন। এমনকি কিছুদিন আগে বিদ্যালয়ে আসা একটি তদন্ত কমিটির সামনে প্রধান শিক্ষক তার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

চেংনা গ্রামের মো. হিরণ মাস্টার জানান, তিনি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকা কালে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া বর্তমান প্রধান শিক্ষক তাকে পেছনের তারিখে যোগদান দেখিয়ে বেতন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

জমি দাতা মো. আব্দুল খালেক জানান, ২০১০ সালের পর থেকে নিবন্ধন সনদ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সরকারিভাবে বন্ধ হয়ে গেলে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর জাল করে তাদেরকে বহু বছর পূর্বে নিয়োগ দেখিয়ে ভুয়া কাগজ পত্র তৈরি করেছেন।

ওই বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জানান, তিনি ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে অবসরে যান। যে তিনজন সহকারী শিক্ষককে ২০০৪ ও ২০০৫ সালে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে তিনি নিয়োগ দেননি এবং তাদেরকে তিনি চিনেন না বলেও দাবি করেন। তাছাড়া নিয়োগপত্রে দেওয়া স্বাক্ষরগুলোও তার নয় বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. মনির হোসেন জানান, এই বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য এলাকার একটি মহল উঠে পড়ে লেগেছে। মহাপরিচালক, উপ পরিচালক, আদালত, সিআইডি, জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়সহ নানা দপ্তরে অসংখ্য লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে। তদন্ত কমিটির বাইরে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে কারোর সাথে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি নন। সাংবাদিকরা সাত শত পত্রিকায় রিপোর্ট করেও তার কিছুই করতে পারবেন না বলে চ্যালেঞ্জ করেন তিনি।