আওয়ামী লীগ সরকারের যে কয়জন মন্ত্রী বিতর্ক ছাড়া দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মধ্যে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন অন্যতম। মেহেরপুরে জন্ম নেওয়া ফরহাদ হোসেন পারিবারিকভাবেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার বাবা সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ সহিউদ্দীন মেহেরপুর আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। ফরহাদ হোসেন শিক্ষকতা করেছেন, ফলে তার কথা বলা এবং আচরণের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।
ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে যাত্রা শুরু হয় ফরহাদ হোসেনের। এরপর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা থেকে সংসদ সদস্য হয়ে অতঃপর সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে উঠে আসা তার রাজনীতির নানা বাঁকবদলের গল্প, যা থাকছে পাঠকের জন্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল।
দেশ রূপান্তর: রাজনীতিতে আপনার যাত্রা কীভাবে- সেই গল্প জানতে চাই।
ফরহাদ হোসেন: ২০০২ সালে আমি ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষকতা করার সময় একদিন তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে রাজনীতিতে নামা ও মাঠ গোছানোর নির্দেশ দেন। এরপর আমি পুরোদমে এলাকায় যাই, মানুষের সাথে কথা বলি এবং জনসংযোগ শুরু করি। এরপর ২০০৩ সালে স্বেচ্ছাসেবক লীগে যোগদানের একটা সুযোগ আসে। তখন আমি আওয়ামী লীগ সভাপতিকে বিষয়টি জানাই। তার অনুমতি নিয়ে আমি স্বেচ্ছাসেবক লীগে যোগ দিই। এলাকায় আমার যে জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল তাতে করে আমি আশা করেছিলাম ২০০৮ সালে মনোনয়ন পাব, কিন্ত মনোনয়ন পাইনি। এরপরও আমি মাঠ ছাড়িনি। এলাকার জন্য কাজ করে যাই। এরপর প্রধানমন্ত্রী একদিন ডেকে বললেন, আমি আগামী নির্বাচনে তোমাকে মনোনয়ন দেব- কাজ করে যাও। ২০১৪ ও ১৮ সালের নির্বাচনে আমি সংসদ সদস্য হই। ২০১৫ ও ২২ সালে মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হই।
দেশ রূপান্তর: আপনি সরকারের মন্ত্রী আবার আপনার বাবা আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতা ছিলেন। আপনার কোন পরিচয় দিতে ভালো লাগে?
ফরহাদ হোসেন: এ প্রশ্নের উত্তর একটু অন্যভাবে দিই। আমার পিতা মোহাম্মদ সহিউদ্দীন। তিনি ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে মেহেরপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বাকশাল ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর নির্বাচিত হন। তিনি কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন। এই বিষয়টি আমার অহংকার। সত্যি বলতে আব্বা যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সে পথেই চলছি। আব্বা আমার রাজনৈতিক শিক্ষক ও আদর্শ। আব্বা বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন তার সাথে রাজনীতি করেছেন, আর আমি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্নেহ-ছায়ায় রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছি। এটা আমাদের পরিবারের জন্য অনেক বড় গর্বের। আমি আব্বার পরিচয় ছাপিয়ে যেতে চাই না।
দেশ রূপান্তর: মাঝে একটা সময় ছাত্রলীগকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কিন্ত এখন আপনারা অনেকেই ছাত্রনেতা থেকে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন; এই পরিবর্তন কীভাবে হলো?
ফরহাদ হোসেন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব ভালো করেই জানেন কাকে কোথায় বসাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সবাইকে নিয়ে আলাদা আলাদা পরিকল্পনা থাকে। সারা দেশে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সব খোঁজ রাখেন প্রধানমন্ত্রী। যে পরিবার দলের দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের প্রতি নিবেদিত তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আলাদা ভালোবাসা সব সময় কাজ করে। আমার বাবার আওয়ামী লীগের প্রতি যে অবদান তা তিনি জানেন বলেই আমাকে মূল্যায়ন করেছেন। আবার যারা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন, দলের পোড় খাওয়া নেতাকর্মী; নেতা-হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে তাদের ওপর প্রধানমন্ত্রীর আলাদা নজর থাকে।
দেশ রূপান্তর: ক্ষমতায় থাকতে রাজনীতি করা আর ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনীতি করার মধ্যে পার্থক্য কী?
ফরহাদ হোসেন: প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশ স্বাধীন করা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সময় কেটেছে রাজপথে মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রাম করতে করতে। আবার দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এসে খুব কম সময় হাতে পান। এর মধ্যে '৭৫-এর কালো অধ্যায় রচিত হয়। '৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে '৯৬-এ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন পর্যন্ত আমরা বিরোধী দলে ছিলাম। বলতে পারেন আওয়ামী লীগের বড় সময়ই কেটেছে মানুষের অধিকার আদায় আর ক্ষমতায় আসার পর মানুষের স্বপ্ন পূরণ করতে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল তিনি দেশ স্বাধীন করেছিলেন বলে। প্রধানমন্ত্রীকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে মানুষের ভোট আর ভাতের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য।
দুঃসময়ে যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে, মাঠে টিকে থাকে তারা বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আদর্শ ধারণ করে। একটা ঘটনা বলি। যেহেতু আমার পিতা ছিলেন মেহেরপুর আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। তাই আমাদের পরিবারের ওপর বিএনপি জামায়াতের আক্রোশ ছিল বেশি। একদিন আমি ও আমার বোন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম- আমাদের দেখে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং আব্বাকে নিয়ে খুব বাজে মন্তব্য করছিল একদল মানুষ। আমরা কাঁদতে কাঁদতে বাসায় যাই।
দেশ রূপান্তর: আপনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন তখন নাকি ছাত্রদল-জামায়াত শিবিরের খুব দাপট ছিল
ফরহাদ হোসেন: আমার সিট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলে কিন্ত আমি সেখানে থাকতে পারিনি। ফলে বন্ধুরাসহ আমরা জহিরুল হলের ১১৮ নম্বর কক্ষে থাকতাম। তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল ফলে হলে হলে, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের দাপট ছিল। হামলা-সিট দখল ছিল নিয়মিত। ফলে টিকে থাকাই কঠিন ছিল। তখন ছাত্রলীগের নেতাদের পালিয়ে থাকতে হতো। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল লাশের রাজনীতি। আর এখন চলছে স্বাভাবিক রাজনীতি। ছাত্রলীগ প্রতিশোধ না নিয়ে ভালোবাসা আর উদারতা দেখাচ্ছে।
দেশ রূপান্তর: তাহলে এখন তো ছাত্রদল ও সরকারবিরোধী অন্যান্য ছাত্র সংগঠনও হলে থাকতে পারে না?
ফরহাদ হোসেন: এখানে একটা কথা বলে রাখি, আমরা কিন্ত প্রতিহিংসার রাজনীতি করি না। '৭৫ এর একটা বড় ক্ষত আমাদের মনে রয়েছে। যার সাথে সরাসরি জিয়াউর রহমান যুক্ত ছিলেন। এরপর ২০০১ সাল থেকে বিএনপির হামলা-মামলা চলে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার ক্ষত কিন্ত সব সময় আমাদের মনে কাজ করে। এ সময় ক্ষমতায় ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর থেকে তাদের ওপর একটা সন্দেহ কাজ করে। কিন্ত আওয়ামী লীগ ৩ মেয়াদে কজনকে হত্যা করেছে? তারা আন্দোলন করছে, সংগ্রাম করছে আমরা কিন্ত বাধা দিই না। শুধু সতর্ক থাকি, যেন কোনো অপশক্তি মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
ছাত্রলীগ কোনো ক্যাম্পাসে হামলা চালায় না। কিন্ত সমস্যা হচ্ছে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে এসেই প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করে। ফলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে হয়। কেননা সাধারণ শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও পড়াশোনার পরিবেশের কথা ছাত্রলীগকে চিন্তা করতে হয়। দেখুন বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ক্যাম্পাসের কি চিত্র ছিল আর এখন কি চিত্র। ছাত্রলীগ কিন্ত লাশের রাজনীতি করে না। এখনও বিভিন্ন হলে ছাত্রদল-শিবিরের ছেলেরা আছে আপনারা খবর নিয়ে দেখবেন। কিন্ত এরা যখন প্রতিহিংসার রাজনীতি করে তখন ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখে।
দেশ রূপান্তর: ৩ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারে আছে। অনেকেই বলে থাকেন এতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিকাশ হচ্ছে না। প্রতিকূল পরিবেশ ছাড়া রাজনীতির বিকাশ হয় না।
ফরহাদ হোসেন: যারা ছাত্রলীগ করে তাদের পিতারা কিন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। আওয়ামী লীগ একটা ইনস্টিটিউশন। ফলে আমাদের ছেলেমেয়েরা সুসময় কিংবা দুঃসময় দুটোর সাথেই পরিচিত থাকে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের বর্তমান সভাপতি-সেক্রেটারির দিকে তাকান। তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও রাজনীতির সুন্দর অতীত রয়েছে। তা ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াওয়ের বিরুদ্ধে আমাদের ছেলেরা তো রাজপথে সক্রিয় রয়েছে।
দেশ রূপান্তর: অনেকেই বলে থাকেন আপনার কথা বলার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে, আপনি মেধাবী এবং ভালো কথা বলতে পারেন। রাজনীতিতে আপনি সফল?
ফরহাদ হোসেন: রাজনীতিবিদদের জন্য সুন্দর কথা বলা এবং মানুষের সাথে মিশতে পারার ক্ষমতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব দেওয়া এবং রাজনীতিবিদ হওয়া ভাগ্যের বিষয়। এ ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য, নীতি-নৈতিকতা, মানুষের সাথে সংযোগ, ভালো চিন্তা করা, মানুষের জন্য কাজ করা এবং তাদের জীবন মানের পরিবর্তন করার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হয়। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। ঢাবি আমাকে তৈরি করতে সাহায্যে করেছে। আবার ছোটবেলা থেকে আব্বাকে দেখে বড় হয়েছি। আব্বার জীবনটাই কেটেছে রাজনীতি আর মানুষের সাথে। আব্বা বলতেন এলাকার মানুষজনই আমার পরিবার। তারা আমাদের বাসায় নিয়মিত আসত আব্বার সাথে বসে এক সাথে খাওয়াদাওয়া করত। ফলে মানুষের সাথে মিশতে পারার যে বিষয় তা ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত ছিলাম। আব্বাকে ছোটবেলা থেকে সভা সমাবেশে বক্তব্য দিতে দেখতাম। যা দেখে খুব অল্প বয়সেই বক্তব্য দিতে শিখে গেছি।
আবার দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার কারণে আমাকে প্রচুর কথা বলতে হত। এর সাথে আরেকটা বিষয় মানুষ আমাকে প্রচণ্ড ভালোবেসেছে ফলে আমি সফল হয়েছি।
দেশ রূপান্তর: আপনি কি মনে করেন আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে জিততে পারবে?
ফরহাদ হোসেন: আমার তো মনে হয় আওয়ামী লীগ সারাদেশে যে উন্নয়ন করেছে, মানুষের জীবনযাত্রার মানের যে পরিবর্তন করেছে তাতে মানুষ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে শেখ হাসিনার হাতে আবার শাসন ক্ষমতা তুলে দেবে। আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় বসাবে, যেন অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের মহৎ পরিকল্পনা আছে। দেশে যে পরিমাণ উন্নয়ন কাজ হয়েছে, এছাড়াও যত উন্নয়ন কাজ চলমান আছে তা সম্পন্ন করতে আওয়ামী লীগ সরকারকে আবারও ক্ষমতায় আনতে হবে। তা না হলে সব লুটপাট হয়ে যাবে। যেমন হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে। তারা এতিমের টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করে খেয়েছে। বিএনপি সরকার শুধু লুটপাট করতে জানে। তাই বলছি আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশে উন্নয়ন হবে না। তাছাড়া মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ একের পর এক মেগা প্রজেক্ট নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এগুলোর সফল বাস্তবায়নের জন্য জনগণের প্রয়োজনে তারা আবার ভোট দিয়ে মানুষের সেবা করার সুযোগ দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।