বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছাপিয়ে এখন আলোচনায় ‘টাইমড আউট’। কেউ এর পক্ষে বললেও বেশিরভাগই ‘চেতনাবিরোধী’ বলে মন্তব্য করছেন। এ প্রসঙ্গে কথাবার্তা যখন তুঙ্গে তখন বড় খবর বিশ্বকাপ থেকে টাইগার অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের ছিটকে যাওয়া। টুর্নামেন্টের শুরুর আগে থেকে যিনি ছিলেন সমালোচনার তীরে বিদ্ধ। টানা হারের বৃত্তে বন্দি থাকায় বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার পুরো আসরজুড়েই হয়েছেন সমালোচিত। তবে যখনই তিনি বিতর্কে জড়িয়ে শিরোনাম হয়েছেন, তারপরই ব্যাটে-বলে পারফরম করে ভুলিয়ে দিয়েছেন সেসব। সোমবার দিল্লিতেও তাই হলো। অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে দলকে জেতালেন। তবে সেই ম্যাচেই ব্যাট করার সময় আঙুলে চোট পেয়ে ছিটকে গেলেন বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ থেকে। আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হলো সাকিব আল হাসানের এবারের বিশ্বকাপ। চার বছর পর ৪০ বছরের সাকিবকে কেউ আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতে দেখার আশা করেন না। হাফ সেঞ্চুরিতে ভারত বধে যার শুরু হয়েছিল ২০০৭-এ, ফিফটিতে লঙ্কা জয় দিয়েই বিশ্বকাপ শেষ হলো তার।
সাকিব আল হাসানের বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল ২০০৭ সালে। উদ্বোধনী ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে খেলেছিলেন ৫৩ রানের এক ইনিংস। তা দিয়েই বিশ্বকে জানান দেন টাইগারদের আগামীর ভবিষ্যৎ তিনি। তারপর থেকে খেলেছেন টানা ৫টি বিশ্বকাপ। স্বপ্নের মতো আসর কেটেছিল ইংল্যান্ডে ২০১৯ সালে। সেই আসর পর্যন্ত টানা ৪ বিশ্বকাপের প্রতিটিতেই খেলেছেন তিনি। এবারই এসে প্রথমবার বড় কোনো টুর্নামেন্টে চোট হানা দেয় তাকে। যে কারণে খেলতে পারেননি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি। অবশ্য এবার তিনি ছিলেন না চিরচেনা ফর্মেও। ফিরে এসেও খুব একটা ভালো কিছু হয়নি।
তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৮৩ রানের ইনিংসটাই তার বিশ্বকাপযাত্রার এপিটাফ হয়ে থাকল। গত সোমবার দিল্লির অরুণ জেটলি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ব্যাটিং ইনিংসের শুরুতেই চোট পান। ব্যথা নিয়েও ব্যাট চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেঞ্চুরির কাছে গিয়েও আসতে হয়েছে ফিরে। তারপর সেই চোটের স্থানে ধরা পড়ল চিড়; যা থেকে সেরে উঠতে সময় লাগবে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ। তাই স্বাভাবিকভাবেই খেলতে পারবেন না বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। এর আগে যিনি কখনো বিশ্বকাপের দুটি ম্যাচ মিস করেননি।
বিশ্বকাপের ৫ আসর মিলিয়ে সাকিব খেলেছেন ৩৬ ম্যাচে। ৪১.৬৩ গড়ে করেছেন ১ হাজার ৩৩২ রান। স্ট্রাইক রেট ৮২.২৭। তার ব্যাট থেকে এসেছে দুই সেঞ্চুরি ও ১১টি ফিফটি। গত আসরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১২৪ রানের অপরাজিত ইনিংসটাই তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ। এই দলটার বিপক্ষেই ২০০৭ সালে তিনি শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন; যা তার এই টুর্নামেন্টের ক্যারিয়ারে একমাত্র ডাক। তা ছাড়া চারবার তিনি অপরাজিত থেকে ম্যাচ শেষ করে আসেন। আর বল হাতে ঝুলিতে পুরেছেন ৪৩ উইকেট। দুইবার নিয়েছেন ৪ উইকেট।
বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষেও সাকিব শুধুই ব্যাট হাতে পারফরম করেছিলেন। বল ঘোরালেও ৪৪ রান দিয়ে ছিলেন উইকেটশূন্য। তবে ব্যাট হাতে ৫৩ রান করে জয়ের পথ প্রশস্ত করতে রাখেন ভূমিকা। সেই ইনিংসের পর থেকেই তিনি বিশ্বমানের তারকা হতে শুরু করেন। ২ বছর পর মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা জাতীয় দলের অধিনায়ক হলে তাকে দেওয়া হয় সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব। প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে ম্যাশ চোটে পড়লে সাকিব পান অধিনায়কত্ব। তারপর থেকেই তার এগিয়ে যাওয়ার শুরু।
মাঝে মাশরাফী অধিনায়ক হয়ে ফিরে এলেও আবার পড়েন চোটে। তাতে কপাল খুলে যায় সাকিবের। নিয়মিত অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়ে যান তিনি। ২০১১ বিশ্বকাপেও তার কাঁধেই ওঠে নেতৃত্ব। বিতর্কের শুরুটাও হয় তখন থেকেই। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলার জন্য মাশরাফী মুখিয়ে ছিলেন। কিন্তু আনফিট কোনো খেলোয়াড়কে দলে নিতে চান না জানিয়ে তিনি দেশসেরা পেসারকে নিতে বিরোধিতা করেন। সেবার ৫৮ ও ৭৮ রানের লজ্জার দুটি ইনিংসের মুখোমুখি হতে হয় বাংলাদেশকে। তবে তিনটি জয়ও পেয়েছিলেন তারা। যার একটি আবার ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে।
এবারের বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে ফের তাকে দেওয়া হয় অধিনায়কের দায়িত্ব। আবারও ঘুরেফিরে আসে সেই আনফিট তত্ত্ব। সেবার বলির পাঁঠা করেছিলেন ম্যাশকে, এবার করেছেন তামিম ইকবালকে। এ নিয়ে হয়ে গেছে বিতর্ক। সাকিব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে দেশসেরা ওপেনারকে ছাড়াই ভালো করবে তার দল। কিন্তু নিজে তো অফ ফর্মে গেছেনই, সঙ্গে পুরো দলও। তাই এবার হয়েছেন সমালোচিতও। তামিম না থাকায় সমর্থকদের দুয়ো শুনতে হয়েছে টুর্নামেন্টের মাঝপথে দেশে ফেরার পরে। দল রেখে দেশে এসে অনুশীলনের জন্যও তাকে সমালোচনা হজম করতে হয়েছে।
সমালোচনার মাত্রা আরও তীব্র হয় বাংলাদেশ যখন ইডেন গার্ডেনসে নেদারল্যান্ডসের মতো দলের কাছে হারে। সেই হারের পর অনেকে টাইগারদের এবারের আসরকে অভিশপ্ত ২০০৩ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তবে দিল্লিতে গিয়ে ৮৩ রানের ইনিংস খেলে সমালোচকদের মুখ যেন বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। দিয়েছিলেন ফর্মে ফেরার আভাস। কিন্তু ফের ইনজুরিতে পরে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেলেন।