সরবরাহ সংকট কাটাতে ব্যাংকগুলোকে ইচ্ছেমতো রেমিট্যান্স কেনার অনুমোদন দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ডলারের দাম ১২-১৩ টাকা বেড়ে গেছে। সংকটের সুযোগে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে গতকাল বৃহস্পতিবার খোলাবাজারে ডলারের দাম ১২৮ টাকায় উঠেছে। যদিও আগের দিন রাতে আবারও ডলারের মূল্য বেঁধে দিয়েছিল এবিবি ও বাফেদা। এর আগেও ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে একাধিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকের সংগঠন বাফেদার ডলারের দাম নিয়ে ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে। আর নিয়ন্ত্রণ করে কোনোভাবেই ডলার সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার দরকার।
ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দরে ব্যাংক ও মানি চেঞ্জারগুলোতে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। ডলার সংকটের কারণে এর নিয়ন্ত্রণ কালোবাজারিদের হাতে চলে গেছে। ডলারের এ অস্থিরতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। দর বেঁধে দিয়ে ডলার বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও বেঁধে দেওয়া দরের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে না পারার ব্যর্থতাই পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই মাসের মধ্যে ডলারের দাম ১৫০ টাকা ছাড়াবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, ডলারের খুচরা দাম ১১৪ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। যদিও এ দরে বাজারে ডলার পাওয়া যায় না। খোলাবাজারে গত সপ্তাহেও ১২০-১২১ টাকায় ডলার পাওয়া যেত। সেই ডলার সপ্তাহ না ঘুরতেই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২৮ টাকা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বাফেদা ও এবিবির হাতে ছেড়ে দিয়েছে, যে মডেলটিই সঠিক নয়। ডলারের দাম ঠিক করার ক্ষেত্রে বাফেদা ও এবিবি বারবার তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মুক্তবাজারে ডলারকে ছাড়তে হবে। ডলারের এখন কোনো খোলাবাজার নেই। সেটি হয়ে গেছে কালোবাজার।’
গত সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় ৩৯ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন নেমে আসে। আর গত অক্টোবরে রপ্তানি আয় কমে যায় প্রায় ১৪ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর গত মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে বাফেদা ও এবিবি রেমিট্যান্সে প্রবাসীদের আরও আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাংকগুলোকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, এ আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু ডলার বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত দরের বেশি বিক্রি করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয় ওই চিঠিতে। এরপর কয়েকটি ব্যাংক আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে ডলার কিনতে শুরু করে।
তবে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, লোকসানে ডলার কেনার কোনো বিধান নেই। এ বিষয়টি বাফেদার উচ্চপর্যায়ের কমিটি নজরে আনলে চলতি মাসের প্রথম বৈঠকে ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তারা। পরবর্তী সময় রেমিট্যান্সের ডলার কেনায় ইচ্ছেমতো দর নির্ধারণের স্বাধীনতা দেওয়া হয় ব্যাংকগুলোকে। এরপরই রেমিট্যান্সের ডলারের দর একলাফে ১২৩-১২৪ টাকায় কিনতে প্রতিযোগিতা শুরু করে ব্যাংকগুলো। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর গত বুধবার রাতে এক জরুরি বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে বাফেদা ও এবিবি ডলারের দর পুনর্নির্ধারণ করে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রেমিট্যান্সের ডলার কেনার ক্ষেত্রে দর ১১৬ টাকার বেশি হবে না বলে জানানো হয়।
এদিকে এবিবি ও বাফেদা ডলারের দর নির্ধারণ করলেও অনেক ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজ তা মানছে না বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন সংগঠন দুটির নেতারা। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে শক্ত হাতে ডলারের দরের নির্দেশনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।
বৈঠক শেষে এবিবি চেয়ারম্যান এবং ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। এ সমস্যা সমাধানে আমাদের সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে।’ তিনি জানান, তাদের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো ব্যাংক চাইলে ১১৬ টাকা পর্যন্ত রেমিট্যান্সের ডলার কিনতে পারবে। কিন্তু ১১১ টাকার বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে না। তারপরও যারা নির্দেশনা ভঙ্গ করছেন, তাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা একত্রে বাজার স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসবেন।
আমদানিকারকরা নির্ধারিত দামে ডলার পাচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, যদি কোনো আমদানিকারকের এরকম অভিযোগ থাকে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এসে জানাতে হবে। তাছাড়া সব বিষয়ে ‘লাইন বাই লাইন’ লিখিতভাবে নির্দেশনা দেওয়া যায় না বলেও মনে করেন এ ব্যাংকার।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, ‘সংগঠন দুটির মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্ত ঠিকমতো বাস্তবায়নের জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিলেন তারা। আমরাও জানিয়েছি সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। নির্দেশনার বাইরে কোনো ব্যাংক অথবা এক্সচেঞ্জ হাউজ ডলার কেনাবেচা করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’
বিষয়টি আগের চেয়ে শক্তভাবে তদারকি করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ আড়াই শতাংশ অতিরিক্ত প্রণোদনা দিয়ে ডলার সংগ্রহ করা যাবে। কিন্তু এর বেশি নয়। যদি কেউ বেশি দামে ডলার কিনেও থাকে তাহলে ১১১ টাকাতেই বিক্রি করতে হবে। অন্যথায় আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল সরেজমিনে রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা, পল্টন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, মানি চেঞ্জারগুলোতে খুব একটা বেচাকেনা নেই। হাতেগোনা দুই-একটি মানি চেঞ্জারে অল্প লেনদেন হচ্ছে। তাদের দাবি, ডলার নেই তাই বিক্রি করতে পারছেন না। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকেও একই অবস্থা।
জানতে চাইলে পল্টন এলাকার নিউট্রলি মানি এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের বিক্রেতা মো. লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ক্রেতাদের আনাগোনা কম। কারণ আমাদের কাছে নগদ ডলার নেই। বেঁধে দেওয়া দরে কেউ ডলার বিক্রি করতে চান না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক মানি চেঞ্জারের বিক্রেতা জানান, দাম বেঁধে দিয়ে তাদের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তারা ডলার কিনতে পারছেন না, বিক্রিও করতে পারছেন না। দালালরা যদি ১২৫-২৬ টাকায় ডলার কেনে, তাহলে মানুষ তাদের কাছে বিক্রি করবে কেন? আর তারা বেশি দরে কিনে লোকসানই গুনবেন কেন?
একই অবস্থা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও। সংকটের কারণে নগদ ডলার বিক্রি করছে না ব্যাংক। মতিঝিল ও দিলকুশার সরকারি ও বেসরকারি অন্তত পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে গিয়েও ডলার পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য নগদ ডলার নেই। অন্য ব্যাংকে যোগাযোগ করতে পারেন।
অবশ্য মানি চেঞ্জার ও ব্যাংকে না মিললেও কালোবাজারিদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে ডলার। এ ক্ষেত্রে তারা বিক্রি করছেন ১২৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২৮ টাকা। রাজধানীর দিলকুশায় এক ডলার ব্যবসায়ীর (কালোবাজারি) কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রশাসনের নজরদারির কারণে মানি চেঞ্জারগুলো ডলার বেশি দরে কেনাবেচা করতে পারছে না। তাই তারা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের তাদের কাছে পাঠায়। তারা ব্যবস্থা করে দেন। আবার তাদের মাধ্যমেই মানি চেঞ্জারগুলো বেশি দরে ডলার কেনে।
মানি চেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব শেখ হেলাল সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক মানি চেঞ্জারগুলোর ডলার কেনার রেট ১১২ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রির রেট ১১৪ টাকা বেঁধে দিয়েছে। এ দামে কেউ ডলার পাচ্ছে না, তাই মানি চেঞ্জারগুলো এখন শূন্য হাতে বসে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফলে ডলার বাজারে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু দর বেঁধে দেওয়াসহ বিভিন্ন কড়াকড়ির কারণে ডলার আবারও কালোবাজারিদের হাতে চলে গেছে।’ এ ব্যবসায়ীও মনে করেন, এখনই ডলার বাজার দরে ছেড়ে না দিলে সংকট আরও বাড়তে পারে।