আগামীর ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট

মাতারবাড়ী থেকে ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীনসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশে পণ্যবাহী জাহাজ পরিবাহিত হবে। চীন থেকে ভারত পর্যন্ত সমুদ্রের বিশাল এক অংশে গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের। আশা করা হচ্ছে, একসময় সিঙ্গাপুরের মতোই ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হবে মাতারবাড়ী।

আগামী শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল উদ্বোধনের পাশাপাশি ১৭ হাজার কোটি টাকা খরচের গভীর সমুদ্রবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে।

ইতিমধ্যে গভীর সমুদ্রবন্দরের অভিধা পেয়ে গেছে মাতারবাড়ী। সমুদ্র থেকে ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩৫০ মিটার চওড়া চ্যানেল তৈরি করে ২২৯ মিটার দীর্ঘ ও ১২ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের (পানিতলে জাহাজের গভীরতা) জাহাজ ভেড়ানো শুরু হয়েছে ২৫ এপ্রিল থেকে। এতদিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লাবাহী জাহাজ ভিড়লেও কনটেইনার ও পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানোর টার্মিনাল ছিল না মাতারবাড়ীতে। গভীর সমুদ্রবন্দরের সর্বোচ্চ সুবিধা কাজে লাগাতে সে ধরনের টার্মিনাল তৈরির কাজ শুরু হচ্ছে।

২০২৬ সালে টার্মিনাল তৈরির কাজ শেষ হলে পুরোদমে গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ শুরু হবে বলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মাতারবাড়ী বন্দর পরিদর্শনের সময় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত সংবাদকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘মাতারবাড়ী হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিজনেস হাব। মাতারবাড়ী দিয়েই দেশের অর্থনীতির নবদিগন্ত সূচিত হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বিভিন্ন সময়ে সংবাদকর্মীদের বলেছেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হিসেবে গড়ে উঠবে। এ বন্দরে আশপাশের বিভিন্ন দেশের পণ্য আসবে এবং এখান থেকে নৌপথে বা স্থলপথে অন্যান্য দেশে নিয়ে যাওয়া যাবে।

মাতারবাড়ী বন্দরের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কখনো বিজনেস আনবে না। এ বন্দর যদি সময় ও খরচ সাশ্রয়ী হয় তাহলে ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই এ বন্দর দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া করবে। তবে মাতারবাড়ী বন্দর খরচ ও সময় সাশ্রয়ী হবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর চীন, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারত ও নেপাল-ভুটানের পণ্য মাতারবাড়ী দিয়ে পরিবাহিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

শিপিংবাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন আমাদের পণ্য মাদারভেসেলে (বড় জাহাজ) করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ও তানজুম পালাপাস এবং শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পৌঁছে। আবার মাদারভেসেল থেকে ছোট জাহাজে করে চট্টগ্রাম, মোংলা বা পায়রাবন্দরে পণ্য নিয়ে আসে। ভারতের বিভিন্ন বন্দরেও এ প্রক্রিয়ায় এসব বন্দরের পণ্য আসে এবং একই প্রক্রিয়ায় রপ্তানিপণ্য ইউরোপে ও আমেরিকায় যায়।

যদি গভীর সমুদ্রবন্দরের সুযোগ-সুবিধা দিতে সক্ষম হয় তাহলে পণ্যগুলো মাদারভেসেলে করে সরাসরি মাতারবাড়ীতে ভিড়বে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট হওয়ার পুরো সম্ভাবনা রয়েছে মাতারবাড়ীর। মাতারবাড়ীতে ১৬ মিটার ড্রাফট ও যেকোনো দৈর্ঘ্যরে জাহাজ ভিড়তে পারবে। গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী মাদারভেসেলগুলো পণ্য নিয়ে আসতে পারবে এ বন্দরে। তবে শুধু বাংলাদেশি পণ্যে তো হবে না। আশপাশের দেশগুলোর পণ্যও এ বন্দরে আসতে হবে। এখান থেকে ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারে লাইটার জাহাজে (ছোট জাহাজ) করে পণ্য নিয়ে যাওয়া সম্ভব। যেমন আমরা সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং থেকে পণ্য নিয়ে আসি।’

চট্টগ্রাম বন্দরে ও মাতারবাড়ী বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানোর পার্থক্য কী জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে ১২০০ থেকে ১৮০০ একক কনটেইনার নিয়ে জাহাজ ভিড়ে। মাতারবাড়ী চালু হলে সেখানে ৮ থেকে ১০ হাজার একক কনটেইনার নিয়ে জাহাজ ভিড়বে। এতে পণ্যের পরিবহন খরচ কম হবে।’

এখন চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বছরে ৩২ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যায়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সে সক্ষমতা হবে ৫০ লাখের বেশি। দেশের মোট জিডিপি দুই শতাংশ বাড়াতে মাতারবাড়ী ভূমিকা রাখবে বলে চট্টগ্রামবন্দর কর্তৃপক্ষের ধারণা।

২০১৬ সালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প হতে নেয় সরকার। জাইকার অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৬ মিটার গভীর ও ২৫০ মিটার চওড়া চ্যানেল নির্মাণ করা হয় বিদ্যুৎপ্রকল্পের আওতায়। ইতিমধ্যে ১৪ মিটার গভীরতার চ্যানেল করা হয়েছে। ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় গভীরতা (ড্রাফট) ১৬ মিটার করা হবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এ প্রকল্পের বাজেট ধরেছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ ৫ হাজার টাকা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (নিজস্ব তহবিল) ২ হাজার ২১৩ কোটি ২৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের ২ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

দেশে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বর্ধমান। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যরে বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। এ বন্দরের সর্বোচ্চ গভীরতা ৯ দশমিক ৫ মিটার। বড় দৈর্ঘ্যরে ও বেশি ড্রাফটের জাহাজ ভেড়াতে মাতারবাড়ীর বিকল্প নেই। মাতারবাড়ী চালু হলে এর সঙ্গে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রাবন্দরের সংযুক্তি আরও বাড়বে। কারণ বড় জাহাজগুলো মাতারবাড়ীতে পণ্য নিয়ে আসবে। সেখান থেকে ছোট জাহাজে করে দেশের অন্যান্য বন্দরে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাব পূরণ করবে মাতারবাড়ী।