বিদ্যুৎ জ্বালানিতে অযৌক্তিক ব্যয়

ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে দফায় দফায় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও পানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভর্তুকির ধারণা থেকে সরে এসে গ্রাহকের নতুন এক মডেলের আওতায় বিদ্যুৎ ও পানির দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের ভুলনীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি আর গোষ্ঠীপ্রীতির কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি আর পানি খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বেড়েছে। এজন্য বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এখন যদি ভর্তুকি সমন্বয় করতে গিয়ে দাম বাড়ানো হয় তাহলে জনজীবন তথা দেশের অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। এমন পরিস্থিতিতে অনিয়ম, দুর্নীতি আর অযৌক্তিক ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরলে ভর্তুকি অনেক কমে আসবে। তখন হয়তো দাম বাড়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

বিভিন্ন সময়ে সরকারের তরফ থেকে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের ঋণ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভর্তুকি কমিয়ে আনা অন্যতম শর্ত ছিল। সম্প্রতি আইএমএফের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে সফরের সময় বিষয়টি আবারও জানতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে তিন-চার মাস সময় নেওয়া হয়।

নির্বাচনের আগে ভর্তুকি তুলে নিলে সবকিছুর দাম বাড়বে আর এতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা কমবে। এমন বিবেচনায় সময় নেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। নির্বাচনের পর দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিদ্যুৎ ও পানিতে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গ্রাহকের এলাকা, আয় ও পারিবারিক অবস্থান এ তিনদিক বিবেচনা করে বিদ্যুৎ ও পানির দাম ঠিক করার কথা বলা হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে এখানে যে দুর্নীতি, অপচয়ের পাশাপাশি লুণ্ঠনমূলক ব্যয় রয়েছে। অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় না করে বারবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। যার পরিণতি ভয়াবহ। জনগণ এ দাম বাড়ানোর চাপ নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সাড়ে ১৪ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ/রেন্টাল পেমেন্ট (কেন্দ্র ভাড়া) বাবদ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভাড়ার পেছনে ব্যয় হয়েছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি। গত ৩০ জুন পর্যন্ত ৭৩টি আইপিপি (স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী) ও ৩০টি রেন্টাল (ভাড়ায়চালিত) বিদ্যুৎকেন্দ্রকে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রভাড়া দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাকুক বা না থাকুক, চুক্তি অনুসারে কেন্দ্র ভাড়া পায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের যুক্তি হলো, কেন্দ্র ভাড়া না দিলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। এখন যে মানুষকে বিদ্যুতের চড়া দাম দিতে হচ্ছে, তার একটি বড় কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অযৌক্তিক ভাড়া।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে বছরে কমবেশি ৫০ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রক্ষেপণে ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করায় বর্তমানে প্রতি ইউনিট এ পিডিবির লোকসান হচ্ছে প্রায় ৫ দশমিক ৩৫ টাকা। আর ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি লোকসান গুনেছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে গত পাঁচ বছরে এলএনজি আমদানি বাবদ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। দেশে সরবরাহকৃত গ্যাসের শতাংশ আসে এলএনজি থেকে। বাকি ৭৬ শতাংশ দেশীয় কূপ থেকে পাওয়া যায়। এজন্য ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা।

এলএনজি আমদানি যেভাবে বাড়ছে তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় বিভিন্ন দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশেও ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে চলতি বছর অন্তত চার দফা গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ১৪ বছরে এ নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে ১১ বার বিদ্যুতের দাম আর গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ছয়বার। সর্বশেষ ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর আগে পানির দামও বাড়িয়েছে সরকার।

মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বের কোনো দেশ জ্বালানিতে ভর্তুকি দেয় না।

তবে প্যারিসভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে, বিশ্বের অনেক দেশ বিদ্যুৎ-গ্যাসে ভর্তুকি দেয়। ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এ খাতে ভর্তুকি দেওয়া ২৫টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২১তম। ভর্তুকি দেওয়ার শীর্ষে রয়েছে ইরান। ইরানের পরপরই আছে যথাক্রমে চীন ও ভারত। এ ছাড়া সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা, আর্জেন্টিনা, ইউক্রেনের মতো দেশগুলো জ্বালানিতে ভর্তুকি দেয়। এ তালিকার অনেকে তেল আমদানি করে না, উল্টো রপ্তানি করে। ফলে দেশের জনগণের কাছে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করে।

বাংলাদেশ মূলত বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি দিয়ে থাকে, যার পরিমাণ জিডিপির শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ প্রতিবছর প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ও গ্যাসে শূন্য দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে সরকার যে ভুলনীতিতে চলে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটার কারণে এখন জনগণকে ভুগতে হচ্ছে। আগামীতে এ ভোগান্তি আরও বাড়বে। আসলে গ্যাস ও বিদ্যুতে বাংলাদেশে ভর্তুকি দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না যদি সরকার সঠিক নীতি নিত। এখন সরকারকে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সেটা তো জনগণকে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য নয়। এটা যদি জনগণের জন্য হতো তাহলে অবশ্যই জনগণকে এর দায় নেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে সরকার তার পছন্দের কিছু ব্যবসায়ী ও গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এ ভর্তুকি দিচ্ছে। তাদের বিপুল পরিমাণ মুনাফা এবং নানারকম সুবিধা দেওয়ার কারণে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে কারণে ব্যয় বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা করে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করছে। অন্যদিকে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে। চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ায় ভাড়াভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে টাকা দিচ্ছে সরকার। গত ১০ বছরে এমন ১১ থেকে ১২টি কোম্পানিকে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে।

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সরকার একবার ভুলনীতির কারণে কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। এখন সেই ব্যয় সামলাতে গিয়ে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করে জনগণের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে।’

বৃহস্পতিবার একনেক সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা জানিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও পানি সবাই ব্যবহার করেন। সবাই এর উপকারভোগী। আমি আবদুল মান্নান যেমন ব্যবহার করি, তেমনি একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীও ব্যবহার করেন। মান্নান সাহেব যে দাম দিচ্ছেন, নিম্ন আয়ের একজন লোকও সেই দাম দিচ্ছেন। এটা বাস্তবসম্মত নয়।’

এ প্রসঙ্গে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম সবার জন্য সমান। কিন্তু আয় সমান নয়। সরকার যদি নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তাহলে এ বৈষম্য অনেক কমে আসবে। একই সঙ্গে এক ধরনের ভারসাম্য আসবে হয়তো। এটার একটা যৌক্তিকতা রয়েছে।’

নীতিগতভাবে সরকারের এ অবস্থান ঠিক আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর যাতে মূল্যবৃদ্ধির অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রেখে একটা মডেল তৈরি করতে হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আয়ের চেয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে মূল্য নির্ধারণ করাটা একটা ভালো নির্ণায়ক হতে পারে। আমার ধারণা প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা গবেষণার মাধ্যমে একটি আদর্শ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করবে সরকার।’ তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানিতে যেসব অনিয়ম দুর্নীতি আর অযৌক্তিক ব্যয় হচ্ছে সেটার লাগাম টানলে ভর্তুকি কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, এসব খাতে যে পরিমাণ অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে তার কারণেও সরকারের ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুতে অনিয়মের চেয়ে বলা যেতে পারে ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে যে বিপুল পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয়েছে এবং হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ হলে ভর্তুকি থেকে সরে আসার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে বড় শহরগুলোতে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়াসায় ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে এমন দাবি করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থায় থাকার কথা জানা গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাড়ে তিনটি মূল বেতনের সমান ১৯ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন গত ১৪ বছরে অন্তত ৪২১ শতাংশ বেড়েছে।

এর আগে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছিলেন, এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। পরোক্ষভাবে এর প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।