বিএনপি 

আন্দোলনের ভার্চুয়াল ঘোষণা কি মাঠে সফল হবে

২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশের সাথে দলটির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের পরদিন থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় তালাবদ্ধ। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে শুরু করে একে একে স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ একাধিক শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। 

এরপর থেকে বিএনপির প্রায় সব নেতাই আত্মগোপনে চলে গেছেন। কর্মসূচি ঘোষণা দিলেও দলটির কোনো নেতাকে তা বাস্তবায়নে রাজপথে দেখা যাচ্ছে না। কেবল অজ্ঞাতস্থান থেকে কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। রুহুল কবির রিজভী কোথায় আছেন, কোথা থেকে তিনি কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছেন সেটি স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বিএনপি কি ভিডিও বার্তায় আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে সরকারের পতন ঘটাতে পারবে?

ইতিমধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ে অবহিত করতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বে অন্য চার কমিশনার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে সিইসি বলেন, দ্রুত আমরা তফসিল ঘোষণা করবো, কারণ সময় হয়ে গেছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এরকম আন্দোলন দিয়ে সরকার পতন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের মতো একটা বড় দলকে মোকাবিলা করতে বিএনপির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ভিডিও বার্তা বা ভার্চুয়াল ঘোষণা দিয়ে হয়তো ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে পারে, কিন্তু এতে করে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধা যাবে কি না তা নিয়ে কিন্তু যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে যেটা মনে হচ্ছে, চলমান রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হবে এবং তা দেশের অর্থনীতিকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করবে।

তিনি বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তফসিল ঘোষণার পর প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে বিএনপি হোমওয়ার্ক করে রেখেছে কি না এবং কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।

গত ১৪দিন ধরে বিএনপির নয়া পল্টন কার্যালয়ে কোনো নেতাকর্মীকে দেখা যায়নি। কার্যালয়ের পুরো নিয়ন্ত্রণ পুলিশের হাতে। অতীতে এরকম পরিস্থিতিতে দেখা যেত, রুহুল কবির রিজভী কেন্দ্রীয় কার্যালয়েই পড়ে থাকতেন। সেখান থেকেই সব কর্মসূচির ঘোষণা দিতেন। এবার তাও হচ্ছে না। চলমান পরিস্থিতিতে যেখানে মাঠে থেকে শীর্ষ নেতাদের মুক্তি ও দাবি আদায়ে ভূমিকা নেওয়ার কথা সেখানে নেতারা আছেন গ্রেপ্তার আতঙ্কে।

সার্বিক বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৮ তারিখের পর থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ খানিকটা ‘ঘোরালো’ হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দিনটিকে কেন্দ্র করে জনমনে যে ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল দিন শেষে সেই লেভেলের আশঙ্কা আর থাকেনি বলে আমার মনে হয়। অনেকেই মনে করেছিলেন হয়তোবা সেদিন-ই একটা এসপার-ওসপার হয়ে যাবে। 

তিনি বলেন, যখন সত্যিকারের রাজনীতি ব্যর্থ হয় বা ‘রিয়েল পলিটিকস ফেইল’ করে তখন গ্রেপ্তার, হয়রানিসহ নানা ধরনের যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। দেখার ব্যাপার হচ্ছে এই ধরনের পরিস্থিতিকে কীভাবে কারা মোকাবিলা করে।

অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, আমার কাছে মনে হয়, ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে আন্দোলন মোকাবিলা করার জন্য সেই পদক্ষেপগুলোকে বিরোধী দল কীভাবে মোকাবিলা করতে পারবে তা তফসিল ঘোষণার পর পরিষ্কার হয়ে যাবে।

রাজনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, কোনো একটি প্রত্যন্ত সড়কের মধ্যে ১০-১৫ জন মিলে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকটি টায়ার পুড়িয়ে তারপর তা মোবাইলে ভিডিও করার একটা প্রবণতা বা ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে এটা কতখানি তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে সেটা সময় বলে দেবে।

তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হয় সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কেবল সরকার বা বিরোধী পক্ষ নয় নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সাংবিধানিক কাঠামোয় থেকে যত ধরনের পদক্ষেপ নিতে হয় এবং যা কিছু লাগে সেই প্রাক্টিক্যাল উপাদানগুলোর দিকে গেলে ভালো হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলে নির্বাচনে যাব না এই দাবিতে আন্দোলন করে খুব একটা কিছু করা যাবে না। এই দাবি টিকবে কি না কিংবা অনির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দেওয়া কতটুকু ঠিক হবে সে বিষয়ে আমি মন্তব্য না করে রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারকদের জন্য রেখে দেব।