শেষটা শুরুর মতো হয়নি। আফগানিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর পর মাঝের পথচলাটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। দিল্লিতে পেনাল্টিমেট ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও শেষটায় আবারও জীর্ণ রূপে ধরা দিয়েছে বাংলাদেশ। আরেকটি বড় হারে শেষ হয়েছে দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপ। পুনের মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ গড়েও বাংলাদেশ ৮ উইকেটে হেরেছে পাঁচবারের বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়ার কাছে।
মিচেল মার্শের অপরাজিত ১৭৭, সঙ্গে স্টিভেন স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারের দুটি হাফ সেঞ্চুরিতে ৩২ বল হাতে রেখেই জয়ের তৃপ্তি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ১৬ নভেম্বর কলকাতায় দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। আর বাংলাদেশকে কাল মধ্য রাতেই ধরতে হয়েছে দেশ-ফিরতি বিমান। বিদায়বেলায় অবশ্য একটা সান্ত্বনা সঙ্গী হয়েছে। সবার নিচে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করতে হচ্ছে না তাদের।
সাকিবহীন বাংলাদেশ টসে হেরে আগে ব্যাট করে এই আসরে প্রথমবারের মতো তিনশোর্ধ্ব রান করে। তবে ৮ উইকেট হারিয়ে ৩০৬-এর পরও পুনের ব্যাটিং স্বর্গে সাড়ে তিনশো করতে না পারার আক্ষেপ থেকে গেছে। সেটা হয়নি ব্যাটারদের দায়িত্বহীন ব্যাটিংয়ে, সেট হয়ে উইকেট বিলিয়ে আসার মিছিলে। দলের শীর্ষ ছয় ব্যাটসম্যানকে এই অপরাধে দাঁড় করাতে পারেন কাঠগড়ায়। ভারতের বিপক্ষে এই মাঠে আগের ম্যাচে লিটন ও তানজিদ ৯৩ রান তুলেছিলেন উদ্বোধনী জুটিতে। শনিবারও সেই ইঙ্গিত দিয়ে আগ্রাসী শুরু করেন দুই ওপেনার। তানজিদ তামিমের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল আগের ম্যাচগুলোর ব্যর্থতা পেছনে ফেলে শেষ ম্যাচে জ¦লবেন তিনি। ৬ বাউন্ডারিতে ৩৪ বলে ৩৬ রানেও পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবে সিন অ্যাবোটের শর্ট বল তার ব্যাটের কানায় লেগে ফিরতি ক্যাচ যায় বোলারের কাছে, ভাঙে ৭৬ রানের উদ্বোধনী জুটি।
তানজিদের বিদায়ের পর লিটন (৪৫ বলে ৩৬ রান) আরেকবার সেট হয়ে উইকেট বিলিয়ে আসেন জাম্পার বলে লাবুসেনকে সহজ ক্যাচ দিয়ে। দুই ওপেনারের বিদায়ের পর সাকিবের অনুপস্থিতিতে টস করতে নামা নাজমুল হোসেন শান্ত ও প্রমোশন পেয়ে চারে নামা তাওহিদ হৃদয় চেষ্টা করেছিলেন রানের চাকা সচল রাখার। গড়েছিলেন ৬৪ রানের জুটি। মনে হচ্ছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপ এই ম্যাচে ঘোচাবেন শান্ত। তবে অহেতুক রানআউটের খাঁড়ায় কাটা পড়ে আরেকটা সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটান। তিনি বিদায় নেন ৫৭ বলে ৪৫ রান করে। বিশ্বকাপে তৌহিদ হৃদয়ের ব্যাটিং অর্ডারে বারবার বদল এসেছে। শেষ ম্যাচে সাকিবের অবর্তমানে চার নম্বরে নেমে অবশ্য বিশ্বকাপে প্রথম হাফ সেঞ্চুরির দেখা পান তিনি। তবে ৭৯ বলে ৭৪ রানের ইনিংসটাকে তিন অঙ্কে নিয়ে যেতে না পারার দায় নিতে হবে তাকে। আউট হয়েছেন ৪৭তম ওভারে, একটু ধৈর্য ধরলে হয়তো সেঞ্চুরি পেয়ে যেতেন। কিন্তু মার্কাস স্টয়নিসের ফুলটসে ডিপ মিডউইকেটে লাবুশেনের হাতে ক্যাচ তুলে দেন। তার আগে অবশ্য দুই অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহিমের বিশ্বকাপের শেষ ইনিংস দুটির অপমৃত্যু ঘটতে দেখেছেন। চার-ছক্কায় দ্রুত রান তোলা মাহমুদউল্লাহ অহেতুক ঝুঁকিপূর্ণ রান নিতে গিয়ে রানআউটের শিকার হয়েছেন ২৮ বলে ৩২ রান করে। দুই রানআউটে দুই সেট ব্যাটসম্যানকে ইনিংসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হারানোয় সংগ্রহটা সাড়ে তিনশো হয়নি। এরপর নিজের শেষ বিশ্বকাপ ইনিংসে ২১ রানের বেশি করতে পারেননি মুশফিকুর রহিমও। শেষ দিকে ব্যাটিংটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের। রান ওঠেনি প্রত্যাশা অনুযায়ী। শেষ ৫ ওভারে আসে মাত্র ৩৫ রান।
বড় রান তাড়া করতে নেমে দ্রুতই তাসকিনের বলে ট্রাভিস হেডকে হারালেও অপর ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারকে নিয়ে শুরুর ধাক্কা সামাল দেন মার্শ। দুজনে গড়েন ১২০ রানের জুটি। ওয়ার্নার ৬১ বলে ৫৩ রান করে মোস্তাফিজুর রহমানের শিকার হওয়ার পর চোট কাটিয়ে ফেরা স্টিভেন স্মিথের সঙ্গে ১৭৫ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দলকে সহজ জয় এনে দেন ১৩২ বলে ১৭ চার ও ৯ ছক্কায় ১৭৭ রান করা এই ব্যাটার। স্মিথ অপরাজিত থাকেন ৬৪ বলে ৬৩ রানের ইনিংস নিয়ে। আফগানদের বিপক্ষে অতি মানবীয় ২০১ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলা ম্যাক্সওয়েলকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল এই ম্যাচে। তবে মার্শের এই ইনিংস ম্যাক্সওয়েলের অনুপস্থিতি বুঝতে দেয়নি একেবারেই। চলতি বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করে সেমিফাইনালের আগে অস্ট্রেলিয়াকে অনেকটাই নির্ভার রাখলেন মার্শ।