হুমায়ূন আমাদের মুকুটহীন সম্রাট

শিরোনাম দেখেই আঁতকে উঠবেন অনেকে, ভাববেন অতিরঞ্জন, আবেগের আধিক্য। বাঙালি জাতি হিসেবে আবেগপ্রবণ, তাই কাউকে মাথায় তুলতে তাদের দেরি হয় না। আবার আছড়ে ধুলায় ফেলে দেওয়ার আগেও দ্বিধা করে না তারা। হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে এই লেখাটিতে আবেগকে সামান্য সরিয়ে রেখে, যুক্তি আর তর্ক দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করব, কেন হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সাহিত্যে সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত। এই পর্যায়ে ধারণা করি, ভক্তরা অনেকেই ভাবছেন এ আর নতুন কথা কী? জীবদ্দশাতেই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা উপভোগ করা বাংলাদেশের গদ্যসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ হুমায়ূন সম্রাট বৈ কি! কিন্তু দেখুন, সাহিত্যের অ্যাকাডেমিক আলোচনায় তার নাম উচ্চারিত হয় খুব কম। বছর-পাঁচেক আগে বাসে বসে গল্প করতে করতে বাংলা সাহিত্যে ডক্টরেট ডিগ্রি আছে এমন এক সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচিতে হুমায়ূন আহমেদকে রাখা হয় না কেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় ঠিক আছে, কিন্তু ওনার লেখায় সেই ব্যাপারটা তো নেই।’ আমি সামান্য সহকারী অধ্যাপক, সিনিয়র সহকর্মীকে বলতে পারলাম না, ‘স্যার, “সেই ব্যাপারটা” কী? খায় নাকি মাথায় মাখে?’ বেয়াদবি হয়ে যেত।

সম্প্রতি জানতে পেরেছি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য বিভাগের সিলেবাসের কোনো এক কোর্সে হুমায়ূন আহমেদের গল্প রাখা হয়েছে, এটি আশার কথা। আমরাও ইংরেজি বিভাগের পাঠ্যসূচিতে বাধ্যতামূলক বাংলা সাহিত্যের কোর্সে ‘চোখ’ শিরোনামের একটি গল্প অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম বেশ চেষ্টা করেই। মাধ্যমিক পর্যায়ে আরও আগেই হুমায়ূন আহমেদকে পাঠ্যসূচিতে স্থান দেওয়া হয়েছে বলে জানি (আমরা স্কুল-কলেজে তার কোনো লেখা পাঠ্যবইয়ে পাইনি যদিও)। কিন্তু সাহিত্যের গবেষণায় হুমায়ূন আহমেদের কাজকে তেমন কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না। এর প্রমাণ হলো, আমি আমার নিজের একটি অ্যাকাডেমিক পেপার রিভিউয়ারের কাছ থেকে ঘুরে আসার পর তার করা মন্তব্য অনুযায়ী ঠিকঠাক করতে গিয়ে দেখেছি ‘অ্যাডিশনাল কমেন্ট’ অংশে তিনি লিখেছেন, যেহেতু হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে অ্যাকাডেমিয়ায় আলাপ হয় না বললেই চলে, তাই আমার লেখাটি জরুরি, ছোট-বড় ত্রুটিগুলো ঠিক করে দিলে যেন আমার সেই লেখাটিকে প্রকাশ করা হয়। নাম না জানা সেই রিভিউয়ারের প্রতি লেখাটি রেকমেন্ডের জন্য যতটুকু কৃতজ্ঞ আমি, তার চেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ অন্য অনেকের মতো হুমায়ূন আহমেদকে গুরুত্বপূর্ণ না ভেবে তথাকথিত ‘সিরিয়াস সাহিত্য’-সংক্রান্ত নাকউঁচুপনা দেখানোর ধৃষ্টতাটি না করার জন্য।

আমার সেই লেখাটি ছিল হুমায়ূন আহমেদের ‘স্পেকুলেটিভ ফিকশন’ নিয়ে। যারা এই টার্মটি নতুন শুনলেন তাদের জন্য বলছি, স্পেকুলেটিভ ফিকশন হলো একটি আমব্রেলা-জনরা, ভৌতিক, রহস্য-রোমাঞ্চ, সাই-ফাই (যাকে আমরা সায়েন্স ফিকশন বলি), মনস্তাত্ত্বিক আর ফ্যান্টাসি সবই এর আওতার মধ্যে পড়ে। পশ্চিম ধারার এই লেখা অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এই লেখাগুলোকে সিরিয়াস সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরোর দ্য বেরিড জায়ান্ট নামে উপন্যাস নিয়ে একটি তর্ক উঠেছিল, বিখ্যাত ফ্যান্টাসি লেখক উরসুলা কে লে’উইন সেই উপন্যাসের ফ্যান্টাসি উপাদানগুলো জুতসই হয়নি বলে মন্তব্য করলে জবাবে ইশিগুরো বলেন, এসব জনরা স্নবারিতে তার আগ্রহ নেই। কোনটি ফ্যান্টাসি, কোনটি সাই-ফাই তা প্রকাশক আর বই বিক্রেতাদের জানা দরকার, লেখক বা পাঠকের তাতে কিছু এসে যায় না। নেভার লেট মি গো নামে ইশিগুরোর আরেকটি উপন্যাস জনরার হিসেবে ডিস্টোপিয়ান সাই-ফাই ধারায় পড়ে। নীল গেইম্যান, স্টিফেন কিং, মার্গারেট অ্যাটউডের মতন অনেক বিশ্বখ্যাত লেখক আছেন, যারা শুধু এমন উপন্যাস লিখেছেন যেগুলোকে স্পেকুলেটিভ ফিকশন বলা যেতে পারে। শুধু জনপ্রিয়তার বিচারে নয়, সাহিত্যমানের দিক থেকেও উল্লিখিত গ্রন্থকারদের স্থান অনেক ওপর দিকে। হুমায়ূন আহমেদকে যারা অসিরিয়াস বলে খারিজ করতে চান, তারা হয়তো জানেন না কানাডিয়ান লেখক মার্গারেট অ্যাটউডের বুকারজয়ী গ্রন্থ দ্য টেস্টামেন্টস একটি ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস, যার আগের পর্বের নাম দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল। একটি উপন্যাসকে ভালো হওয়ার জন্য তাকে খুবই বাস্তববাদী বা রিয়েলিস্ট সাহিত্যধারায় পড়তেই হবে, তেমন কোনো মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি।

হুমায়ূন আহমেদ অনেক ডিস্টোপিয়ান সাই-ফাই লিখেছেন। এই তালিকায় আছে তোমাদের জন্য ভালোবাসা, ফিহা সমীকরণ, ইরিনা ও অনন্ত নক্ষত্র বীথি। ডিস্টোপিয়ান নয় কিন্তু সাই-ফাই এমন উপন্যাসের মধ্যে আছে তারা তিনজন, দ্বিতীয় মানব, কুহক। অতিপ্রাকৃত কিংবা আধিভৌতিক গল্পে হুমায়ূন আহমেদের সমকক্ষ আর কোনো লেখক বাংলাদেশে আছেন বলে আমার অন্তত জানা নেই। আপাতত মনে পড়ছে পারুল ও তিনটি কুকুর, যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ, অদ্ভুত সব গল্পর কথা, আবার খাঁটি ভূতের গল্পও লিখেছেন তিনি। মিসির আলীকে সিরিজের অধিকাংশ উপন্যাস সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারধর্মী, যেমন বৃহন্নলা, অন্যভুবন, আমি এবং আমরা। বলা বাহুল্য, এই তালিকা শুধু আমার নিজের পড়া গ্রন্থগুলোর মধ্যে থেকে স্মৃতির ওপর নির্ভর করে বাছা কয়েকটি নাম। মনোযোগী পাঠক সামান্য চেষ্টা করলেই অনেক নাম স্মরণ করে যোগ করতে পারবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তার এই লেখাগুলো সব অরিজিনাল কাজ। বিদেশি গল্পের ছায়া থেকে বা অনুপ্রাণিত হয়ে যে তিনি কিছু লেখেননি তা নয়। সম্রাট, অমানুষ, দি একসরসিস্টের মতন বেশ কয়েকটি উপন্যাস তার নিজস্ব আইডিয়ায় লেখা নয়, এই তথ্যও বইগুলোর শুরুতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আমাদের দেশে ‘সিরিয়াস সাহিত্য’ যারা করেন তারা সাধারণত শিশুদের জন্য গল্প-উপন্যাস লেখেন না। লিখলেও দু-একটির বেশি নয়। হুমায়ূন আহমেদ শিশুসাহিত্যের মতন অবহেলিত একটি শাখাকেও পুষ্ট করেছেন অকৃপণ হাতে। আমার মতন আরও অনেক পাঠক যারা গত শতকের আশি-নব্বই দশকে বেড়ে উঠেছেন, অনুমান করি তাদের অনেকেই হুমায়ূন আহমেদকে চিনেছেন তোমাদের জন্য রূপকথা, নুহাশ ও আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ, বোতল-ভূত কিংবা নীল হাতি পড়ে। সূর্যের দিন নামে অসামান্য একটি কিশোর উপন্যাস হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, যেটির প্লট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হলেও তাতে নেই কোনো চেতনা প্রচারের চেষ্টা কিংবা বিশেষ কোনো ধর্ম, জাতীয়তা বা ভাষার প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানোর অপপ্রয়াস। অনেক লেখকের শিশু-কিশোর সাহিত্যই যে দোষে দুষ্ট, শিশুদের জন্য তাদের লেখাগুলো হয়ে যায় উপদেশমূলক বা শিক্ষামূলক দেশপ্রেম কিংবা বিজ্ঞানমনস্কতা শেখানোর জন্য যেন একটি গল্প ফেঁদে বসা হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের শিশুসাহিত্য এই প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আমাদের শৈশব আর কৈশোরকে রঙিন করার জন্য হুমায়ূন আহমেদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকতেই হবে আমাদের প্রজন্মকে।

সালমান রুশদির একটি বক্তব্যের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত সাহিত্যের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, এর কোনো সত্যিকারের উপযোগিতা নেই। সাহিত্য সৃষ্টির এবং পাঠের একমাত্র এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আনন্দ পাওয়া। কোনো উদ্দেশ্য বা রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে যা লেখা হয় তা অনেক উঁচুদরের লেখা হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়ে দাঁড়ায় প্রোপাগান্ডা। হুমায়ূন আহমেদের শুধু শিশু-কিশোর সাহিত্য নয়, বড়দের জন্য লেখা গল্প-উপন্যাস নাটক সিনেমা সব সময় এই একটি উদ্দেশ্যেই রচিত হয়েছে। হুমায়ূনের সব কর্মেই আমরা অনুভব করি সৃষ্টিসুখের উল্লাস। একবার বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে পাঠকদের চিঠির মাধ্যমে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এক পাঠক প্রশ্ন করেছিলেন ‘আপনার নাটকে শিক্ষামূলক কিছু নাই কেন?’, হুমায়ূন আহমেদ তখন তার নির্লিপ্ত নিরুত্তেজিত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের একটা স্বভাব হলো, আমরা স্কুল-কলেজে পড়ালেখা করে কিছু শিখতে চাই না, নাটক সিনেমা দেখে শিখতে চাই।’ হুমায়ূন আহমেদের এহেন সারকাজমকেও বিদগ্ধজনরা ‘অসিরিয়াস’ হিসেবে উড়িয়ে দিতেই পারেন। রুশদির বক্তব্যটি সেজন্যই উল্লেখ করলাম। আমাদের আরেকটি স্বভাব হলো, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিরা যা বলেন তা আমরা সহজেই মেনে নিই। কিন্তু নিজেদের লোকরা যা বলে তাকে গ্রহণ করতে চাই না।

হুমায়ূন আহমেদকেও জনপ্রিয় লেখক হিসেবে অন্য লেখকদের কাছ থেকে নানান তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য সহ্য করতে হয়েছে। একজন তার বেস্টসেলার হওয়া নিয়ে বলেছেন, ‘লুঙ্গিও তো বেশি বিক্রি হয়’, আরেকজন লেখক তার উপন্যাসকে বলেছেন ‘অপন্যাস’। ধারণা করি, এই মন্তব্যগুলো আসলে অসূয়াপ্রসূত। আর ভক্ত-পাঠকের বাইরে যারা তাকে খারিজ করতে চান তাদের ক্ষেত্রে আমি বলব, আনএপোলজেটিক্যালিই বলব, সেগুলো অজ্ঞতাপ্রসূত। শিশুসাহিত্য আর স্পেকুলেটিভ ফিকশনের ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আজকে লিখলাম, তার অন্যান্য কাজ নিয়ে হয়তো পরে কখনো লেখব। হুমায়ূন আহমেদ যে মাপের লেখক তার কাজ নিয়ে আসলে যুগে যুগে চর্চা করা সম্ভব।

জন্মদিনে বাংলাদেশের সাহিত্যের জগতে সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত এই লেখকের প্রতি শত কুর্নিশ রইল।

লেখক, কথাসাহিত্যিক ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়