ইডেনে ঘুচবে কি চোকার্স দুর্নাম

বিশ্বকাপজুড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যাটে-বলে নানা কীর্তি গড়ে যেন বোঝাতে চাইছে, এবার সময় এসেছে চোকার্স দুর্নাম ঘোচানোর। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ গড়া (শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪২৮), বড় বড় ব্যবধানে প্রতিপক্ষদের বিধ্বস্ত করার মতো ঘটনা যেমন ঘটিয়েছে আবার পুঁচকে নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে দুঃসময়ের সঙ্গেও সখ্য গড়া হয়ে গেছে। বড় পরীক্ষার আগে দুঃসময়ের দেখা পাওয়ায় তাই তাদের নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখছেন অনেকেই। আগের ৮ বিশ্বকাপের চারটির সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা এবার সেই গেরো খুলতে এখন আছে কলকাতায়। ইডেন গার্ডেনসে ১৬ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়াকে সাধারণ মানে নামিয়ে আনতে পারলেই হবে ইতিহাস। নইলে ১৯৯৯ ও ২০০৭-এর মতো এবারও প্রোটিয়াদের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটবে অসি আঘাতে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক নির্বাসন থেকে ১৯৯১ সালে ফেরার পর ১৯৯২ বিশ্বকাপ থেকে চোকার্স দুর্নামটা সেঁটে গিয়েছিল প্রোটিয়াদের। যোগ্য দল হয়ে বৈশি^ক আসরে এসে বারবার খেই হারানোয় জুটে যায় এই দুর্নাম। ভাগ্য যেমন মুখ ফিরিয়ে নেয়, আবার সঠিক সময়ে এসে খেই হারানোটা রীতিতে পরিণত হয়েছে তাদের। তবে এবার অনেক কিছুই অন্যরকম ঘটেছে বলেই ফাইনালের স্বপ্নে বিভোর প্রোটিয়ারা।

শ্রীলঙ্কাকে ১০২ রানে হারিয়ে শুরু। ম্যাচটা আলাদা হয়ে আছে আগে ব্যাট করে প্রোটিয়ারা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪২৮ রান তোলায়। পরের ম্যাচে সেমির প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াকে ১৩৪ রানে হারিয়ে বুঝিয়ে দেয় আগের জয়টা অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে এমন দুই জয়ের পরই চোকার্স উপাধির যথার্থতা প্রমাণ করে তারা পুঁচকে নেদারল্যান্ডসের কাছে হারে ৩৮ রানে। তবে পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৯৯ রান তুলে জয় পায় ২২৯ রানে। বাংলাদেশের বিপক্ষেও বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে প্রোটিয়াদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩৮২, জয় আসে ১৪৯ রানের। তবে পরের ম্যাচে পাকিস্তানকে হারাতে বেগ পেতে হয়, জেতে ১ উইকেটে। নিউজিল্যান্ডকে ১৯০ রানে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করা প্রোটিয়াদের অবশ্য স্বাগতিক ভারত দেয় ২৪৩ রানে হারের লজ্জা। তবে শেষ লিগ ম্যাচে আফগানিস্তানকে ৫ উইকেটে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলে দ্বিতীয়স্থানটা অক্ষুণœ রাখে তারা।

লিগপর্বে যে কয়েকবার আগে ব্যাট করেছে তারা, প্রতিবারই সংগ্রহ আকাশ ছুঁয়েছে, জয়ও এসেছে অনায়াসে। তবে যে দুই ম্যাচে হার, দুটিই চেজ করতে গিয়ে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে কষ্টের জয় দুটিও পরে ব্যাট করে। সুতরাং ইডেনের রান স্বর্গে প্রোটিয়াদের টসে জেতা মানেই আগে ব্যাটিং, তাতে জয়ের সম্ভাবনা থাকবে অনেক বেশি।

১৯৯২ বিশ্বকাপ দুর্ভাগ্যের শুরুটা হয়েছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দিয়ে। বৃষ্টির বাগড়ায় ম্যাচটা ছিল ৪৫ ওভারের। সিডনিতে ইংল্যান্ড তুলেছিল ২৫২ রান। সেই লক্ষ্যে ছুটতে ছুটতে একটা সময় তাদের প্রয়োজন দাঁড়ায় ১৩ বলে ২২ রান। খুব কঠিন ছিল না সেটা তোলা। তবে ঠিক তখনই বৃষ্টি এসে প্রোটিয়াদের স্বপ্ন ভেঙে দেয় এক লহমায়। বৃষ্টি থামার পর অবিশ্বাস্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ১ বলে ২২ রান! ভাগ্যের কাছে হেরে শেষ হয় তাদের স্বপ্নের অভিযান। ১৯৯৬ উপমহাদেশীয় বিশ্বকাপে তাদের যাত্রা থামে কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে। আর ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে টাই করে ফাইনালের সুযোগ হারানোর পর চোকার্স দুর্নামটা যেন স্থায়িত্ব পেয়েছিল। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম রোমাঞ্চকর সেই ম্যাচে ২১৪ রানের জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে একটা সময় বিপদে পড়ে গিয়েছিল প্রোটিয়ারা। তবে ল্যান্স ক্লুজনারের ১৬ বলে ৩১ রানের ক্যামিও জয়ের খুব কাছে পৌঁছে দিয়েছিল তাদের। ৯ উইকেট হারানো দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ ২ বলে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১ রান। ঠিক তখনই ইতিহাসের মহা ভুলগুলোর একটি করে বসেন অ্যালান ডোনাল্ড। নন-স্টাইক থেকে জয়সূচক ১ রানের জন্য ক্লুজনারের নিষেধ সত্ত্বেও দৌড় শুরু করে রানআউট হয়ে যান।

২০০৩ নিজ দেশের বিশ্বকাপেও বৃষ্টি আর বৃষ্টি আইনের সমীকরণে ভুল করে গ্রুপপর্ব থেকে দুর্ভাগ্যজনক বিদায় নিতে হয় প্রোটিয়াদের। ২০০৭ সালে ক্যারিবীয় বিশ্বকাপটা দক্ষিণ আফ্রিকা খেলেছিল ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দল হিসেবে। তবে সুপার এইটে সাত ম্যাচের তিনটিতে হেরে কোনোমতে চতুর্থ দল হিসেবে সেমিফাইনালে যায়। তবে অস্ট্রেলিয়ার কাছে তারা ধরা দেয় অসহায় রূপে। মাত্র ১৪৯ রানে গুটিয়ে যায় তাদের ইনিংস।

২০১১ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ২২২ রানের সহজ লক্ষ্যে একটা সময় ভালো অবস্থানে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষ ২২ ওভারে দরকার ছিল ৭ উইকেটে ১০১ রান। অথচ সেটাই ছুঁতে পারেনি তারা জেপি ডুমিনি, ফাফ ডু প্লেসিস ও এবি ডি ভিলিয়ার্স সেট হয়েও আউট হয়ে যাওয়ায় ১৭২ রানে গুটিয়ে যায় অন্যতম ফেভারিটরা। ২০১৫ বিশ্বকাপেও দুর্ভাগ্য সঙ্গী করে সেমি থেকে প্রোটিয়াদের ধরতে হয় ফেরার বিমান। নিউজিল্যান্ডকে তারা ২৮১ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দিয়েছিল। একটা সময় কিউইরা ১৪৯ তুলতেই ৪ উইকেট হারায়। সেখান থেকে গ্র্যান্ট এলিয়ট ও কোরি অ্যান্ডারসন ১০৩ রানের জুটি গড়ে ম্যাচটা জমিয়ে তোলেন। শেষ ওভারে কিউইদের জয়ের জন্য দরকার ছিল ১২ রান। সে সময়ের সেরা ফর্মে থাকা ডেল স্টেইন করেন শেষ ওভার। একটা সময় ২ বলে কিউইদের প্রয়োজন ছিল ৫ রান। তবে স্টেইনকে পাথর বানিয়ে এলিয়ট ছক্কা মেরে নিউজিল্যান্ডকে তুলে নেন ফাইনালে।

২০১৯ বিশ্বকাপটা হতাশাজনক কাটার পর দক্ষিণ আফ্রিকা আবারও পৌঁছে গেছে সেমিফাইনাল মঞ্চে। আগের ৮ বিশ্বকাপের চারটি সেমিফাইনালে খেলেও একটাও জিততে না পারা, দুই সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হার অতীত তাই স্বপ্ন দেখাচ্ছে না। তবে ভাগ্য এবার তাদের সঙ্গী হলেও হতে পারে। কলকাতায় ১৬ ও ১৭ অক্টোবর হতে পারে বৃষ্টি। তাতে যদি ইডেনে খেলা না গড়ায় তবে ভাগ্যের জোরেই তারা চলে যেতে পারে ফাইনালে। লিগপর্বে এগিয়ে থাকায় এই একটা জায়গায় প্রোটিয়া থাকবে এগিয়ে। ভাগ্যের জোরে হোক কিংবা ব্যাট-বলে লড়াই করে, চোকার্স দুর্নাম ঘুচিয়ে প্রোটিয়ারা চাইবে ফাইনালের অধরা স্বপ্নকে ধরতে।