বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য প্রদান করা হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৭৫ থেকে ২০২২ এই ৪৮ বছরের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী নির্মাতা হিসেবে ২০২২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার পেলেন রুবাইয়াত হোসেন তার শিমু চলচ্চিত্রের জন্য। এর আগে এ বিভাগে পুরস্কারটি পেয়েছেন কোহিনুর আক্তার সুচন্দা। ২০০৫ সালে ‘হাজার বছর ধরে’ ছবির জন্য তিনি পুরস্কারটি পেয়েছিলেন।
কোহিনুর আক্তার সুচন্দা আর রুবাইয়াত হোসেনই নয়, নারী নির্মাতাদের মধ্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে নারগিস আক্তারের পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘মেঘলা আকাশ’ ছয়টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে এবং তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তীতে তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘যৈবতী কন্যার মন’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পায়।
নির্মাতা সামিয়া জামানের ‘রানী কুঠির বাকি ইতিহাস’ চলচ্চিত্রটিও দর্শক গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। আর শাহনেওয়াজ কাকলীর ‘উত্তরের সুর’। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে এছাড়া নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরীর ‘বিশ্ব সুন্দরী’ ৮টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কখনও ঘুরে দাঁড়িয়েছে, আবার কখনও সংকটের মুখে পড়েছে। তবে এই শিল্পে নারী-পুরুষের বৈষম্য রয়েই গেছে বলে মনে করেন চল্লচিত্র পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন। শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে আমার সর্ম্পক প্রায় একযুগ। আমি দেখেছি দেশে নারী নির্মাতা একেবারে হাতে গোনা। চলচ্চিত্র নির্মাণে তারা বৈষম্যের শিকার। আমার মনে হয়েছে বৈষম্যের এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে এবং দেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নে বেশি করে নারী নির্মাতাদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আমরা যারা আছি, তাদের সাথে আরো মেয়েদের চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসা উচিত। কিন্তু তার আগে দরকার মেয়েদের চলচ্চিত্র নির্মাণ শেখানো। সেই ভাবনা থেকেই আমাদের আয়োজনে হয়েছে হয়েছে সুলতানাস ড্রিমের কর্মশালা। যেখানে অংশগ্রহণ করেন ১৬জন নতুন নারী নির্মাতা। সেখান থেকে তিনজন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স শিরোনামে নির্মাণ করেছেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।
শুধু শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কারই নয়, রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্র শিমু সর্ব্বাধিক ৪টি পুরস্কার জিতেছে ২০২২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের। যার মধ্যে রয়েছে- শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী রিকিতা নন্দিনী শিমু (যুগ্মভাবে), শ্রেষ্ঠ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন সুজন মাহমুদ এবং শ্রেষ্ঠ পোশাক ও সাজসজ্জার জন্য তানসিনা শাওন।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে পোশাকশিল্পের যে ভূমিকা আছে তার আলোকে দৃঢ়চেতা নারী পোশাকশ্রমিকদের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প বলা হয়েছে রুবাইয়াত হোসেনের তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘শিমু’ বা ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ এ। তার প্রথম ছবি মেহেরজান মুক্তি পায় ২০১১ সালে এবং দ্বিতীয় ছবি আন্ডার কনস্ট্রাকশন মুক্তি পায় ২০১৬ সালে। ঐ বছর শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতার জন্য রুবাইয়াত হোসেন পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং শ্রেষ্ঠ রূপসজ্জার জন্য পুরস্কার পায় ছবিটি।
টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পর ছবিটি প্রদর্শিত হয় ৬৩তম বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সমাদৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে ছবিটি। ফ্রান্সের সেইন্ট জঁ দ্য-লুজ চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে নেন রিকিতা নন্দিনী শিমু। ইতালির টোরিনো বা তুরিন চলচ্চিত্র উৎসবে পেয়েছে ইন্টারফেদি পুরস্কার এবং ফ্রান্সের এমিয়েন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জিতে নিয়েছে সেরা দর্শক পুরস্কার ও জুরি পুরস্কারসহ ৩টি পুরস্কার।
২০১৯ এর ডিসেম্বরে ফ্রান্স, ডেনমার্ক, কানাডা ও পর্তুগালের ৭০টি সিনেমা হলে বাণিজ্যিকভাবে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ নামে মুক্তি পায় ছবিটি। এরপর টানা চৌদ্দ সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের শতাধিক সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয় ছবিটি। ২০২০ আমেরিকার বিভিন্ন হলে প্রদর্শনের পর ছবিটির বাণিজ্যিকভাবে দেখানো হয় ম্যাক্সিকো, চীন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, জাপান ও জার্মানীর সিনেমা হলে।
বাংলাদেশের খনা টকিজ ও ফ্রান্সের লা ফিল্মস দ্য এপ্রেস-মিডির ব্যানারে নির্মিত শিমু ছবিটির প্রযোজক ফ্রঁসোয়া দক্তেমা ও আশিক মোস্তফা এবং সহ-প্রযোজক পিটার হিলডাল, পেদ্রো বোর্হেস, আদনান ইমতিয়াজ আহমেদ ও রুবাইয়াত হোসেন। আর ছবিটির পরিবেশনা ও আন্তর্জাতিক বিক্রয় প্রতিনিধি ফ্রান্সের পিরামিড ফিল্মস।
বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, নভেরা রহমান, দীপান্বিতা মার্টিন, পারভীন পারু, মায়াবি মায়া, মোস্তফা মনোয়ার, শতাব্দী ওয়াদুদ, জয়রাজ, মোমেনা চৌধুরী, ওয়াহিদা মল্লিক জলি ও সামিনা লুৎফা প্রমুখ। দুটি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিতা চৌধুরী ও ভারতের শাহানা গোস্বামী।