৫০ আসনে নিশ্চয়তার অপেক্ষায় জাপা

নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির (জাপা) নাটকীয়তা নতুন কিছু নয়। আগের কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারও তফসিল ঘোষিত হওয়ার পরও নির্বাচনকেন্দ্রিক ‘নাটক’ শুরু হয়েছে দলটিতে। আগে ওইসব নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকতেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এবার তার জায়গায় আছেন তারই ছোট ভাই ও দলটির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জিএম কাদের)। 

জাতীয় পার্টি আগের দুটি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে এলেও ভোটের মাঠে তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জোটেই থেকেছে। তবে এবার দলটি একেক সময় বলছে একেক ধরনের কথা। দলটির কখনো বলছে, তারা একভাবে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবে, আবার কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধার কথা বলছে। 

তবে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুসারে কোনো দল ভোটের আগে জোট গড়তে চাইলে তফসিল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে (শনিবার) ইসিতে আবেদন করতে হবে। কিন্তু আজ শুক্রবার পর্যন্ত দলটি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। অবশ্য দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ যদি আসন্ন নির্বাচনে তাদের ৫০ আসনের নিশ্চয়তা দেয়, তবে নির্বাচনে যাবে জাপা।

শুক্রবার দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরাও জানিয়েছেন তেমন কথা। তারা বলছেন, তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কমপক্ষে ৫০ আসনের নিশ্চয়তা চান, এ নিশ্চয়তা পেলেই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেবেন দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে দলটির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন নেতারা।

জাতীয় পার্টি সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে নির্বাচন সামনে রেখে মনোনয়ন ফরম ছাপানো, প্রার্থী বাছাই, ইশতেহার তৈরিসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কাজ শুরু করেছে দলটি। বিএনপি নির্বাচনে আসবে না ধরে নিয়ে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কমপক্ষে ৫০ আসন দেওয়ার নিশ্চয়তা পেলে আগামীকাল রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারেন।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের-ঘনিষ্ঠ এক নেতার দাবি, নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে জিএম কাদের নানা কথা বলেছেন। যার কারণে আমেরিকা এবং ভারত থেকেও জাতীয় পার্টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও জাতীয় পার্টির গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটা সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনে যেতে চান জিএম কাদের।
সংলাপের বিষয়ে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্তরে আলাপ চলছে জানিয়ে এ নেতা বলেন, চেয়ারম্যান নির্বাচন প্রশ্নে আরও সময় নিতে পারেন। 
তফসিলের পর থেকে সরকারকে সংলাপের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানিয়ে আসছেন জাপা নেতারা। এর আগে মঙ্গলবার রাতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

গত ৪ নভেম্বর জাপার কো-চেয়ারম্যানরা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর বাসায় বৈঠক করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, জাপা যদি নির্বাচনে যায় তাহলে জিএম কাদেরের একক নেতৃত্বেই সবকিছু হতে হবে। যদি রওশন এরশাদকে নিয়ে পৃথক গ্রুপিংয়ের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তারা নির্বাচনে যাবেন না। সরকার থেকে নিশ্চয়তা দিতে হবে রওশন এরশাদকে দিয়ে জাতীয় পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে না কিংবা দলে আগামীতে কোনো বিভেদ তৈরি করা হবে না।

জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম বলেন, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে কি না, তার একক সিদ্ধান্ত নেবেন আমাদের চেয়ারম্যান জিএম কাদের। জাতীয় পার্টি চায় গ্রহণযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের নিশ্চয়তা। নির্বাচন কমিশন যদি আমাদের আশ্বস্ত করে নির্বাচন উপযোগী ফিল্ড তৈরি করতে পারে তাহলে হয়তো আমরা নির্বাচনে যাবে। কিন্তু সর্বশেষ লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া নির্বাচনে যে কারচুপি হয়েছে, যদি দ্বাদশ নির্বাচনেও তাই হয় তাহলে নির্বাচনে গিয়ে সরকারকে বৈধতা দিয়ে, জাতীয় পার্টি দুর্নাম কামাতে চায় না।

জিএম কাদেরের সর্বশেষ দিল্লি সফরে সঙ্গে ছিলেন দলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা মাশরুর মাওলা। তিনি তার ঘনিষ্ঠজন হিসেবেই পরিচিত। নির্বাচনের প্রশ্নে জাতীয় পার্টির অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। আমরা চেষ্টা করছি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের জন্য। তারা অন্য কারও সঙ্গে সংলাপে বসুক বা না বসুক, কমপক্ষে আমাদের সঙ্গে সংলাপে বসলেও আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারতাম। তারা যদি সংলাপে না ডাকে তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।’
মাশরুর মাওলা বলেন, ‘জাতীয় পার্টি সংসদের প্রধান বিরোধী দল, তাই আমরা মনে করি সরকারের উচিত আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গেও আলোচনায় বসুক।’

দিল্লি এবং আমেরিকা আপনাদের কী বার্তা দিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখুন, এ পর্যন্ত যত বৈঠক হয়েছে তাতে কেউ বলেনি নির্বাচন বর্জন করতে। যেহেতু তারা নিজেরাও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাই তাদের চাওয়া বাংলাদেশে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ নির্বাচন। সর্বশেষ ডোনাল্ড লু যে চিঠি পাঠিয়েছেন, সেখানেও কিন্তু শর্তহীন সংলাপের কথা বলা হয়েছে।’

জাপার একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সবদিক নিয়েই আলোচনা চলছে। দলের চেয়ারম্যান টানা বৈঠক করে যাচ্ছেন। নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা ও ভারত নির্বাচন নিয়ে জাপার সঙ্গে কথা বলছে, যোগাযোগ রাখছে। ফলে তাদের দিক থেকেও একটা নির্দেশনা আসবে। এই নেতারা বলেন, গত সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করেছে জাতীয় পার্টি। সেখানেও দলটির চেয়ারম্যান নির্বাচনে না গেলে দলের নেতাকর্মীরা তা নাও মানতে পারে এবং তা দল হিসেবে জাপার জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। সর্বশেষ ভারত সফরেও নির্বাচন নিয়ে একটা স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাপার কো-চেয়ারম্যান আবু হোসেন বাবলা বলেন, ‘যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হয় তাহলে জাপা নির্বাচনে যাবে এটা নিশ্চিত। আমরা কখনো নির্বাচন বর্জন করিনি। গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের বিকল্প নেই। তবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন থেকে সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা দিতে হবে।’
অন্যদিকে জাপার নির্বাহী কমিটির সর্বশেষ সভায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে জোরালো মন্তব্য রেখেছেন। বৈঠকে জিএম কাদের বলেন, ‘এ অবস্থায় নির্বাচনে গেলে আমাদের ওপর স্যাংশন আসতে পারে। আবার এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন বর্জন করলে আমাদের দলের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এই মুহুর্তে আমরা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারি, আমাদের অস্তিত্ব সংকট দেখা দিতে পারে।’

নির্বাচনে গেলে স্যাংশনে পড়বে এই ভয় কি জাপায় কাজ করছে এমন প্রশ্নে জাতীয় পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘স্যাংশনের ভয় নিয়ে ঠিক আলোচনা হয়নি। “মিডিয়া ওভার হাইপ কোট করেছে”। সেদিন আমাদের চেয়ারম্যান অসংখ্য সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ করেছেন। তার মধ্যে একটা ছিল স্যাংশন। সংলাপ যদি না হয় তাহলে স্যাংশন লিস্ট বাড়বে এটা বলাই যায়। নির্বাচনে যদি গোলযোগ হয় তাহলেও স্যাংশন আসবে। এখন বিএনপি না এলে তো গোলযোগ হবে না। আবার জাতীয় পার্টি তো এমনিতেও সংঘাতপ্রিয় দল নয়, আমরা কোনো সংঘাতে জড়াবও না। ফলে স্যাংশনের ভয় নেই।’

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন দাখিলের শেষ সময় ৩০ নভেম্বর আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৭ জানুয়ারি। এরপরও জাপা কেন নির্বাচন অংশ নেওয়া বা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তরে জাপা নেতারা বলছেন, নির্বাচনে জাপা না গেলে আওয়ামী লীগ সংকটে পড়বে। ফলে আওয়ামী লীগ বাধ্য হবে জাপার সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে নিয়ে যেতে। 

২০১৪-এর নির্বাচন মাথায় রেখে তারা বলছেন, সেবার জাপাকে নির্বাচনে নিয়ে যেতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে সুজাতা সিং এসে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এরশাদকে হাসপাতালে নিয়ে এক প্রকার বন্দি করে রাখা হয়। এরপর জাপা নির্বাচনে যায়। এবারের প্রেক্ষাপট আরও কঠিন। সরকার নির্বাচন করে ফেললেও বিরোধী দলে দাঁড় করানোর মতো কাউকে খুঁজে পাবে না।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে দুই-তিন দিনের মধ্যে খোলাসা করা হবে। জাপা চায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন। আমাদের কাছে যদি মনে হয় মানুষ ভোট দিতে পারবে, নির্বাচনের পরিবেশ বজায় থাকে তাহলেই আমরা শুধু নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেব। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনে কে এলো বা কে এলো না তার ওপর জাপার সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে না।’
তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ লক্ষ্মীপুর আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া নির্বাচন কিন্তু নানা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি কোনো নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে চায় কিংবা নিজেদের প্রার্থীদের জালিয়াতি করে জেতাতে চায়, তাহলে আমরা নির্বাচনে গিয়ে লাভ কী। যেহেতু নির্বাচনের সময় বেশি নেই তাই সিদ্ধান্ত যাই নিই না কেন, আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি।’