তিতলা বনে জ্যোতিষী

তিতলা বন। বনের মধ্যে রাজত্ব করে ভানু সিংহ। বনের সবাই ভানুকে রাজার আসনে পেয়ে খুশি। কারণ এখন পর্যন্ত বনে কোনো দুর্গতি ঘটেনি। সবাই সবার প্রতি সহানুভূতিশীল। কেউ বিচলিত হয় না, কারোর ভুরু কুচকে ওঠে না। 

শুধু একজন কারোর ভালো দেখতে পারে না। তার নাম শেলু শিয়াল। তার শরীরে চুলকানি ওঠে কারোর সুখ দেখলে। খারাপ জিনিস ছাড়া সে আর কিছুই ভাবতে পারে না। একদিন তার মনে একটা অশুভ বুদ্ধি এলো। যে কোনোভাবে বনের পশুদের কাল্পনিক ভয়ে ভোগাবে। জ্যোতিষীরা সাধারণ মানুষের হাত নেড়েচেড়ে দেখে, হাতের রেখা পড়ে। যার কারণে মানুষ একটা অজানা ভয়ে থাকে। অনেক ভ্রম দেখে। মানুষ ভাবে, জ্যোতিষীদের কাছে ভবিষ্যৎ জানা আছে। শেলু শিয়াল দীর্ঘদিন মানবসমাজে গিয়ে এই নতুন দুষ্টুমি শিখেছে।

প্রচার আর বিজ্ঞাপনের জন্য শেলু শিয়াল চেলু চিলকে রাজি করাল। বনে আগুন লাগার মতোই শেলু শিয়াল নখ দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করে এই খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। খেদা খরগোশ সবাইকে সাবধান করল। বলল, ‘শেলু চালাক, সে সবাইকে বিভ্রান্ত করছে।’ কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না।

শেলু শিয়াল একটা গাছের নিচে বসে আছে। তার চারপাশে পশুরা শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের লেজ নিয়ে বসা। সবাই তাকে তাদের নখ দেখে তাদের ভাগ্য এবং ভবিষ্যতের বিপদগুলো বলার জন্য অনুরোধ করছে।

এক লাইনে আসো। মনে রাখবে, আমি কোনো ফি নিচ্ছি না, শুধু আমার জন্য মাংসের টুকরো নিয়ে আসবে, যেটা খেতে খুব সুস্বাদু!

প্রথমে চিতা এগিয়ে গেল। শেলুর দিকে তার নখ প্রসারিত করে বসল।

চিতার নখের দিকে তাকিয়ে শেলু শিয়াল নাকমুখ কুঁচকে ফেলল। বলল, তোমার নখ দেখে আমার মাথায় জট পাকিয়ে গেছে। আট দিন ঘাসে লুকিয়ে থাকো। কোথাও যেও না।

পরের সিরিয়াল বাজপাখির। তার নখরের দিকে তাকিয়ে শেলু বলল, যেদিন তুমি গাছে বসবে সেদিন বজ্রপাত হবে। দশদিন গাছ থেকে দূরে থাকো।

এবার হাতির পালা। শেলু তার লম্বা চওড়া পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, পনেরো দিন কলা-মুলা আর পানি খাবে না, না হলে পেটে ব্যথা হবে।

ভানু সিংহ ভয়ে থাবা দেখাল। শেলু তাকে বলল, রাজা সাহেব! বিপদের ভয়ংকর ছায়া আপনার মাথার ওপর ঘোরাফেরা করছে। আপনার এক মাস মাংস পরিহার করা উচিত। শুধু ফল খাওয়া উচিত। তবে হ্যাঁ, যদি আপনার বেশি খিদে লাগে তাহলে আপনি শুধু একটি প্রাণী শিকার করতে পারবেন। কিন্তু সেটা নিজে খাওয়ার জন্য না, কাউকে খেতে দিতে হবে। অন্য কাউকে দিলে হবে না, শুধু আমাকে দিতে হবে। তবেই আপনি বিপদ মুক্ত।

এই বলে শেলু শিয়াল ঠোঁটের ওপরে জিভ নাড়ল।

দেখতে দেখতেই বনের অবস্থা বদলে গেল। চিতা সারাদিন ঘাসে লুকিয়ে থাকে। বাজপাখি মাটিতে ঘোরাঘুরি করে। হাতি পিপাসায় কাতর আর সিংহরাজ ক্ষুধার্ত। সে ফল খেতে পারে না। সে মাংসভোজী। চিরকাল মাংস খেয়ে এসেছে। তাদের মনের ভেতরে ভয় ভরিয়ে দিয়েছে শেলু। ঈর্ষান্বিত পশুরা ভীত ও জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা হয়ে উঠল। ভানু সিংহের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। শুকিয়ে শুকিয়ে সে একটা কঙ্কাল হয়ে গেল। সে শিকার করেছে, কিন্তু তাকে খেতে দেওয়া হয়নি। শেলু শিয়াল তার শিকার খেয়ে ফেলে। অবশেষে সব প্রাণী মিলে খেদা খরগোশের কাছে গিয়ে বলল, খেদা এখন আমরা কী করব? এভাবে বাঁচব কী করে?

খেদা বলল, তোমরা তার কথা শোনো কেন? সে তো আজেবাজে কথা বলছে।

সব প্রাণী বলল, শেলু একজন জ্যোতিষী। জ্যোতিষীরা তো সত্য বলে।

খেদা সবাইকে বুঝিয়ে বলল, এটা বিশ্বাসের দুর্বলতা, কিন্তু তোমরা বুঝতে পারোনি। আমি আজই শেলু শিয়ালের কাছে যাব। তার জ্যোতিষগিরির চালাকি প্রকাশ করে দেব। তোমরা সবাই আসো আমার সঙ্গে।

অবশেষে সবাই খেদা খরগোশের সঙ্গে গেল শেলু জ্যোতিষীর কাছে। খেদা খরগোশ নখ দেখানোর জন্য তার পা এগিয়ে দিল।

শেলু শিয়াল তার নখ দেখে ভয় পেয়ে গেল। ভীত গলায় বলল, আমি যা বলছি তাতে মনোযোগ দাও। আমি স্পষ্টভাবে তোমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। এক মাস পর তোমার কঠিন অসুখ হবে!

খেদা খরগোশ জিজ্ঞেস করল, তুমি তো আমাদের সম্পর্কে জ্যোতিষীবিদ্যা করে সবই জানো। তুমি নিজের সম্পর্কে কী জানো?

 শেলু জ্যোতিষী গম্ভীর গলায় বলল, আমার নখ আমাকে বলছে আমি আগামী বছরে তিতলা বনের রাজা হব। আমার শরীরে রাজকীয় পোশাক থাকবে।

খেদা খরগোশ বলল, কিন্তু আমার জ্যোতিষশাস্ত্র বলছে আমি এখনই তোমাকে অজ্ঞান করে ফেলব।

এই বলে খেদা খরগোশ হাতে লাঠি নিয়ে শেলু খরগোশের মাথায় সজোরে আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গে শেলু অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

খেদা খরগোশ সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, ওকে দেখো! এক বছর পরে সে বনের রাজা হবে জানল কিন্তু কিছুক্ষণ পরের মুহূর্তে জানল না। তাকে কোনো দিন বিশ্বাস করো না।

সব প্রাণী বুঝতে পারল। সবাই শেলু জ্যোতিষীর চেতনা ফিরে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। তাকে আবার অজ্ঞান কররে।