রাজশাহীতে অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের কারাগারে না পাঠিয়ে বিকল্প পন্থায় মুক্তির ঘটনা অনেককেই সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনছে। গত দেড় বছরে রাজশাহীর আদালত এই পন্থায় ১৭৭ জন শিশুকে মুক্তি দিয়েছে। ভালো কাজ করার শর্তে মুক্তি পাওয়া এসব শিশুর বেশিরভাগই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। মূলত শিশু বয়সে প্রথমবারের মতো ছোট অপরাধ করা শিশুদের প্রতি আদালত সদয় হয়ে এই পন্থায় মুক্তি দেয়। রাজশাহীতে বিকল্প পন্থায় মুক্তি পাওয়া শিশুদের মধ্যে কেউ কেউ আবারও খারাপ পথে পা বাড়ানোর খবর পাওয়া গেলেও বেশিরভাগই সুন্দর জীবনের পথে হাঁটছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২২ সালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় মারামারির একটি মামলা হয় বুলবুল আহম্মেদের (১৮) নামে। এরপর গ্রেপ্তারও হন তিনি। জমি নিয়ে মারামারির ঘটনায় আসামি হন তিনি। এরপর বুলবুলের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। জীবনের শুরুতেই আদালত, কারাগার, থানা, পুলিশ সবই দেখেন তিনি। তবে আদালতের মহানুভবতায় কারাগারে যাওয়া থেকে মুক্তি মেলে বুলবুলের। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি ভালো কাজ করার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয় তাকে। শিশু আইনের বিকল্প পন্থায় তাকে মুক্তি দেওয়ার পর বুলবুলের জীবন বদলেছে। এই পন্থায় মুক্তি না মিললে বুলবুলকে এখন হয়তো কারাগারে থাকতে হতো।
বুলবুল বলেন, ‘এখন আমি বেশ ভালো আছি। আবার লেখাপড়া শুরু করেছি। নিজেকে গড়ে তুলছি। রাজশাহীর গোদাগাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। এইভাবে বিকল্প পন্থায় রায় আমার জন্য বেশ ভালোই হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটাই ছিল আমার প্রথম অপরাধ। বড়দের মারামারি দেখতে গিয়ে আমাকে ফাঁসানো হয়েছিল। তখন মনে হতো, আমার মনে হয় খুব খারাপ কিছু হবে। তবে এই রায় আসার পর থেকেই আমি বেশ ভালো আছি। এখন পড়াশুনা করছি। অনেক কিছু শিখছি। এই রায় আমার জীবন বদলে দিয়েছে।’
বুলবুলের বাবা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলের নামে আগে কোনোদিন মামলা ছিল না। এটাই তার প্রথম মামলা। তার শাস্তি না হয়ে এমন একটি রায় বেশ ভালোই হয়েছে। জেলে গেলে তার মনে অনেক কিছু হতো। অপরাধ করার প্রবণতা বাড়ত। তবে এই রায়ের পর তারা বুঝতে শিখেছে। সে এখন ভালো লেখাপড়া করে। কলেজে যায়। সুন্দর, সুস্থ জীবন ফিরে পেয়েছে এই রায়ের মাধ্যমে।’ শুধু বুলবুলই নয়। বুলবুলের মতো ফেরদৌস হোসেন, রবিন, আবদুল কুদ্দুসও একইভাবে ফিরে পেয়েছে সুন্দর জীবন। তারাও এখন নিজেদের গড়ে তুলতে ব্যস্ত। কেউ নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে। আবার কেউ শিক্ষা জীবন নিয়ে বেশ ভালোই দিন কাটাচ্ছেন।
জেলা প্রবেশনারি অফিসের তথ্যমতে, রাজশাহী জেলায় ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫৪টি মামলায় ১৭৭ জন শিশুকে বিকল্প পন্থায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এরা সবাই কারাগারের অন্ধকারে না গিয়ে ফিরেছে আলোর পথে।
চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে মুক্তি পান রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের মাহতাব আলীর ছেলে ফেরদৌস হোসেন। তিনি বলেন, ‘এখন খুব ভালো আছি। লস্করপুর কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছি। লেখাপড়া শুরু করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় তিন বছর ধরে আমি এই মামলার আসামি ছিলাম। প্রতি মাসেই আদালতে হাজিরা দিতে যেতে হতো। এখন সেটি নেই। আমি যে ভুল আগে করেছি, সেটি আর এখন করছি না। সব কিছু ভুলে এখন আমি লেখাপড়া শুরু করেছি। দিন যতই যাচ্ছে ততই আগের দিনের কথাগুলো মনে পড়ে।’
রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিকল্প পন্থায় মুক্তি পাওয়া মো. রবিন শুরু করেছেন নতুন কর্মজীবন। তিনি বলেন, ‘আমি এই মামলার পর থেকে বেশ খারাপ ছিলাম। কিন্তু আমাকে বিকল্প পন্থায় রায় দেওয়া হয়েছে। এখন আমি ডেকোরেটরের ব্যবসা করি। আগে আমি ওয়ার্কশপে কাজ করতাম। এখন ডেকোরেটর শুরু করে বেশ ভালো জীবন উপভোগ করছি।’
রাজশাহী নারী ও শিশু আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শামসুন নাহার মুক্তি বলেন, ‘এই সুযোগ দিলে তাদের নিজেদের দায়িত্বটা বুঝবে। তারা আর অপরাধে জড়াবে না। এটি একটি পজেটিভ দিক।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক বিজয় কৃষ্ণা বণিক বলেন, ‘অপরাধকে ঘৃণা কর, অপরাধীকে নয়। শিশু অনেক সময় না বুঝেই বা অন্যের মাধ্যমে মোটিভেটেড হয়ে অপরাধ করতে পারে। আমার কাছে মনে হয় এই সুযোগ একটি সঠিক সিদ্ধান্ত।’