‘আল্লাহ তুমি কেন সাঈদকে তুলে নিলে। আমার সাত রাজার ধন, আমার মানিক রতনকে কেন কেড়ে নিলে? এখন আমরা কার কাছে থাকব? কে আমাদের খাওয়াবে? কার ভরসায় বাঁচব আমরা।’ সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে এভাবে চিৎকার করে কান্না করছিলেন ঘূর্ণিঝড় মিধিলিতে গাছ পড়ে নিহত হওয়া মো. সাঈদের বৃদ্ধ বাবা মিয়া হোসাইন। শুধু বাবা নয় সাঈদের মৃত্যুতে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দু:স্বপ্নে মা হালিমা বেগম, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাই ও নববধূর কান্না থামছেনা কিছুতেই। তাদের কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মহেশখালি উপজেলা কালারমারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ঝাপুয়ার সাতঘরিয়াপাড়ার বাসিন্দারা।
রবিবার বিকেলে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, নিহত সাঈদের ঘর ছাউনীহীন জরাজীর্ণ মাটির তৈরি। চারপাশে যত্রতত্র ভাঙা ঘরের পলিথিনের ছাউনিতেই বাস করেন নিহত সাঈদের বাবা মা, প্রতিবন্ধী ভাই ও নববধূ। ঘূর্ণিঝড় মিধিলির সময় এই পলিথিনের ছাউনি ঠিক করতে গিয়ে প্রাণ হারান সাঈদ। যে গাছ পড়ে সাঈদ আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন সেই উপড়ে পড়া গাছটি এখনো রয়েছে ঘরের উপরই। এই বসবাস উপযোগী বাড়ির বাইরে উঠানে বসে চিৎকার করে কাঁদছেন নিহত সাঈদের মা হালিমা, তার পাশে বসে কান্না করতেই করতেই জ্ঞান হারানো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দেবরের যত্ন নিচ্ছেন মৃত সাঈদের স্ত্রী। তাদেরকে ঘিরে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রতিবেশীরা। এরই অদূরে বাড়ির উপর উপড়ে পড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে অপলক তাকিয়ে বিড়বিড় করছেন বৃদ্ধ বাবা মিয়া হোসাইন।
ওই সময় মিয়া হোসাইন বলেন, আমার ৩ ছেলে ও ৫ মেয়ের মধ্যে সাঈদ সবার ছোট। বড় ছেলে চট্টগ্রাম শহরে রিকশা চালায়। আরেক ছেলে প্রায়ই অন্ধ। সাঈদের জন্য কিছুদিন আগে বৌ এনেছি। এই ৫ জন সংসার চলত শুধু সাঈদের আয়ে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাড়ির চালে পলিথিন দিতে উঠলে হঠাৎ গাছ পড়ে আমার ছেলের মৃত্যু হয়। এখন এত বড় পরিবার কি করে চলবে ?
নিহতের মা হালিমা বলেন, সাঈদের মত ছেলে হয় না। সে এই পরিবারের জন্য ছোট বেলা থেকে কাজ করত। তার একজনের আয়েই আমাদের খাবার, চিকিৎসাসহ বেঁচে থাকার সকল উপকরণের জোগাড় হত। এখন ও নেই, আমাদের কি হবে ।
তিনি আরও বলেন, বৃদ্ধ মা বাবা আর অন্ধ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আমার বাপ অল্প বয়স থেকে মানুষের বাড়িতে-বাড়িতে কাজ করত। সংসারটা কোন রকমে চলছিল। আমার কষ্ট কমাতে ছেলেটা বিয়ে করল মাত্র ১৮ দিন আগে। তার এইভাবে মৃত্যু হবে কল্পনাও করি নাই। কিন্তু এখন কে সংসার চালাবে। নতুন বউ, অন্ধ ছেলে ও আমরা বৃদ্ধ দুইজন কী করব।
তিনি আরও বলেন, আমাদের শেষ আশ্রয় ঘরটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। যে কোন সময় দেয়াল ধসে পড়তে পারে। বসবাস করার অবস্থা নাই। ঘর যে ঠিক করবো সেই সামর্থ্যও নাই আমার। রাত কাটাই অন্যের বাড়িতে। প্রতিদিনের খাবার কিভাবে জোগাড় হবে তাও জানিনা।
নিহতের সাঈদের মায়ের কথার মাঝখানে হঠাৎ করেই হুশ ফেরে অন্ধ ভাইয়ের। হুশ ফিরতেই চিৎকার দিয়ে বলে ‘আমার ভাই কই? আমাকে কার জন্য রেখে গেলি ভাই’। এই বলে আবারও বেহুঁশ হয়ে যান তিনি।
এ সময় প্রতিবেশীরা জানায়, ‘এখনো পর্যন্ত সাঈদের খবর নেয়নি উপজেলা প্রশাসনসহ সরকার দলীয় নেতারা। শুধু স্থানীয় ইউপি সদস্য এসেছিলেন।’
এবিষয়ে কালারমারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, নিহত সাঈদ ছিলেন ওই পরিবারের ভরসা। তার আয়েই চলতো পরিবারটি। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারটিতে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমি বিষয়টি চেয়ারম্যানকে অবগত করেছি। চেয়ারম্যান আশা দিয়েছেন তিনি এলাকায় আসলে স্ব শরীরে উপস্থিত হয়ে সহযোগিতা করবেন।
আর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিকি মার্মা বলেন, ‘নিহত ব্যক্তি নিয়ম অনুযায়ী সরকারি অনুদান ২৫ হাজার টাকা পাবেন। সেটার জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’