স্মরণ

ফিল্ম ডেভেলপিংয়ের অগ্রপথিক আনসারউদদীন আহ্‌মদ

দমদম বিমানবন্দরের পাশে গৌরীপুর নামে একটি গ্রাম ছিল। ১৯৩১ সালের ১২ জানুয়ারি সেই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলোকচিত্রশিল্পী আনসারউদদীন আহ্‌মদ। তার দাদা আনিসউদদীন আহ্‌মদ ছিলেন গৌরীপুরের বিশাল জমিদার। ওই এলাকায় তাদের সাতপুরুষের জমিদারি ছিল। আনসারউদ্দীনের বাবা আলাউদদীন আহ্‌মদ তখন পুলিশে চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪২ সালে দমদম বিমানবন্দরের সীমানা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকার। ফলে বিমান বাহিনী মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে তাদের ভিটে-বাড়ি আর সমস্ত জমিজমা অধিগ্রহণ করে। এতে আনসারউদদীনের বাবা মন খারাপ করে পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি পরিবার নিয়ে থিতু হন কলকতার নারকেলডাঙ্গায়। সেখানে তিনি পোস্ট মাস্টারের চাকরি নেন। ফলে আনসারউদদীনের শৈশব ও কৈশোর কাটে নারকেলডাঙ্গায়।

ছয় ভাই ও চার বোনের মধ্যে বড় ছিলেন আনসারউদদীন। তার মা মাজেদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। ১৯৪৩ সালে আনসারউদদীনকে ভর্তি করা হয় নারকেলডাঙ্গা জর্জ হাই স্কুলে, সপ্তম শ্রেণিতে। ওই বয়সেই তার ছবি তোলার নেশা পেয়ে বসে। কিন্তু তখন বাঙালি মুসলমান পরিবারে ক্যামেরা খুব সহজলভ্য জিনিস ছিল না। এক সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা শহর থেকে একটা পুরনো কোডাক ব্রাউনি-২ কেনেন আনসারউদদীন। সেই ক্যামেরা দিয়েই শুরু হয় তার ফটোগ্রাফিচর্চা। তখন ছবি তোলার জন্য ডার্করুম দরকার হতো। ডার্করুম বানানোর জন্য তিনি বাড়িতে মিস্ত্রি ডাকেন। পুরাতন এনসাইন ফোল্ডিং ক্যামেরা উল্টে, তার ফিল্ম প্লেনে একটা নেগেটিভ কেরিয়ার তৈরি করেন। ডার্করুমের উপরের দিকে স্থাপন করেন ল্যাম্প বক্স। এভাবেই নিজের প্রচেষ্টায় তিনি ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট ও ছবি প্রিন্ট করা শেখেন। পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন বলে ফটোগ্রাফিচর্চায় পারিবারিক বাঁধা পাননি। ১৯৪৬ সালে তিনি প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করে ভর্তি হন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। আইএসসি পড়ার সময় বাবাকে বললেন, একটি পেশাদার ক্যামেরা কিনে দিতে। তার বাবা ইউনিভার্সাল আর্ট গ্যালারি থেকে অল্প ব্যবহৃত একটি রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা কিনে ছেলেকে দেন। ওই ক্যামেরাটার দাম ছিল পাঁচশ টাকা। তখনকার দিনে ওই টাকা তার বাবার চার মাসের বেতনের সমান। ফলে তার বাবাকে ধীরে ধীরে ক্যামেরার মূল্য পরিশোধ করতে হয়। পরবর্তী সময়ে ওই আর্ট গ্যালারির মালিক তারা বাবু আনসারউদদীনকে ১০ ইঞ্চি বাই ১২ ইঞ্চি সাইজের ছবি প্রিন্ট করে দিতেন প্রদর্শনীতে পাঠানোর জন্য।

আনসারউদদীন আহ্‌মদ (১২ জানুয়ারি ১৯৩১-২১ নভেম্বর ২০১৩)

বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলেন আনসারউদদীন। আইএসসিতে প্রথম বিভাগে পাস করে ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে ১৯৫৫ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৫৬ সালের মে মাসে যোগ দেন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরিতে রিসার্চ অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বর মাসে যোগ দেন বিহারের জামশেদপুরে টাটা মেন হসপিটালের প্যাথলজি বিভাগে সহকারী মেডিকেল অফিসার হিসেবে। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি ১৯৬৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি জামশেদপুর মহাত্মাগান্ধী মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসেবে দুই বছর শিক্ষকতা করেন। ওই সময় বিহারে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা লেগে যায়। আনসারউদদীন দাঙ্গার রোষে পড়েন। ফলে ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি স্বপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। যোগ দেন পাক-সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে যা বর্তমান আইসিডিডিআর,বি হিসেবে বহুল পরিচিত। ১৯৮২ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এডিলেইড ইউনিভার্সিটি থেকে ইমিউনোলজি (রোগ প্রতিরোধ তত্ত্ব) বিষয়ে এমএস ডিগ্রি লাভ করেন। ২৬ বছর বিভিন্ন পদে থেকে সর্বশেষ অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট হিসেবে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

আনসারউদদীন পেশায় একজন সফল চিকিৎসক বৈজ্ঞানিক হয়েও ফটোগ্রাফি, সঙ্গীত আর শিল্পকলা নিয়ে সারা জীবন মেতে ছিলেন। স্কুল জীবন থেকে শুরু করে অন্তিম সময় পর্যন্ত কখনো ক্যামেরা, ডার্করুম আর ফটোগ্রাফির সঙ্গ ছাড়েননি। ফটোগ্রাফিতে তার অনন্য দিকটি হলো– তিনি ফিল্ম ডেভেলপ ও ছবি প্রিন্টিং নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশে ফিল্ম ডেভেলপিংয়ে তাকে অগ্রপথিক হিসেবে গণ্য করা হয়। কলেরা হাসপাতালের বিজ্ঞান ও ফটোগ্রাফি বিষয়ে কাজ করতেন দুজন আমেরিকান ও একজন ফরাসি ডাক্তার বৈজ্ঞানিক। পরে এ দায়িত্ব এসে পড়ে আনসারউদদীনের কাঁধে। ওই সময় তাকে সাদাকালো নেগেটিভ ডেভেলপ-প্রিন্ট, লিথ ফিল্মে সাদাকালো স্লাইড তৈরি, ই ফোর, ই সিক্স প্রসেসে একটাক্রোম, ফুজিক্রোম কালার স্লাইড তৈরি করতে হতো। ওই সাড়ে তিন বছর তিনি ফটোগ্রাফির ডেভলপিং ফরমুলা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পান। ব্রিটিশ জার্নাল অব ফটোগ্রাফির একটি বাৎসরিক সংখ্যা থেকে পাওয়া এক অলটারনেটিভ ফরমুলা অনুযায়ী ডেভলপিং কেমিক্যাল বানিয়ে আগফাক্রোম কালার স্লাইড পরিস্ফুটন করেন। কোডাক কোম্পানি একসময় দাবি করতো, তাদের নিজস্ব ডেভেলপার ছাড়া কোডাকের টেকনিক্যাল প্যান ফিল্ম ডেভেলপ করা কঠিন। আনসারউদদীন ওই ফিল্ম পরিস্ফুটনের জন্য নিজ হাতে ডেভেলপার তৈরি করেন। এ ছাড়া ছবিতে রাতের আমেজ ফোটানোর জন্য ৪০০ আইএসও এর কোডাক ট্রিক্স ফিল্ম ডেভেলপিংয়ের একটি ফরমূলা তৈরি করেন। এই পদ্ধতি ব্যববহার করে তিনি তার ‘লেইম ইন দ্য ডার্ক’ শিরোনামের ছবিটি ১৯৮৭ সালে মিলটেনবার্গে অনুষ্ঠিত ফিয়াপের ১৯তম সাদাকালো বিয়েনেলে পাঠান। ছবিটির জন্য তিনি সম্মানসূচক পুরস্কার পান।

১৯৮৭ সালে ফিয়াপ বিয়েনেলে পুরস্কার পাওয়া আলোকচিত্র `লেইম ইন দ্য ডার্ক’

আনসারউদদীন ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ‘রূপসী বাংলা’ ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেন। ওই প্রতিযোগিতায় জুরি বোর্ডের প্রধান ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। বিপিএসের তৃতীয় জাতীয় ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় তিনি তৃতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে বিপিএসের বাৎসরিক প্রতিযোগিতায় তিনি শ্রেষ্ঠ ফটোগ্রাফার বিবেচিত হন ও একটি সম্মানসূচক পুরস্কার পান। ১৯৮৫ সালেও বিপিএস সদস্য ও নিমন্ত্রিত আলোকচিত্রীদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ফটোগ্রাফার নির্বাচিত হন। একই বছর ঢাকায় স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক আয়োজিত ফটোগ্রাফিক প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পুরস্কার ও চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিযোগিতায় সম্মানসূচক পুরস্কার পান। ২০০১ সালে পান বিপিএস রজতজয়ন্তী সম্মাননা। আনসারউদদীন বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৭ থেকে ৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি এই সংগঠনের সহসভাপতি ছিলেন। এরপর দুই বার (১৯৭৮-৭৯, ১৯৮৮-৮৯) সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বিপিএসের আজীবন সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯ সালে এলবিপিএস ও কয়েক বছর পর এবিপিএস হন। তিনিই সোসাইটির প্রথম কোয়ালিফায়েড অ্যাসোসিয়েট। ১৯৮৫ সালে কলকাতা জাদুঘর অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব দমদমের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফিক কনফারেন্সে ‘Existing Light and Night Photography’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন।

ফটোগ্রাফির পাশাপাশি চিত্রকলা ও সঙ্গীতের প্রতিও তার সমান ঝোঁক ছিল। ছবি আঁকাটা তিনি নিজে নিজেই রপ্ত করেছিলেন। এ জন্য তাকে বহু শিল্পকর্ম দেখতে হয়েছে, বইপত্র ঘাঁটতে হয়েছে। তিনি প্রধানত জলরঙে ছবি আঁকতেন। তবে তৈলচিত্র আর অ্যাক্রেলিকেও কিছু কাজ করেছেন। তিনি মূলত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও ফুলের ছবি আঁকতেন। জীবদ্দশায় দুটি চিত্র প্রদর্শনী করেছেন। প্রথমটি ১৯৬৭ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে, শেষেরটি ১৯৯৮ সালে; চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে। প্রথম প্রদর্শনীতে তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছবি বিক্রি হয়েছিল। তার সঙ্গীত শিক্ষাটি অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক। টাটা হাসপাতালে চাকরি করার সময় বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশারদ অরবিন্দ বিশ্বাসের কাছে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিম নেন। এরপর ঢাকায় বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীতে চার বছরের ডিপ্লোমা করেন। তিনি বেতারের তালিকাভূক্ত শিল্পী ছিলেন। স্বাধীনতার পরেও বেশ কিছুদিন তিনি নিয়মিত বেতারে গান করেছেন।

১৯৮৫ সালে বিপিএসের পুরস্কারপ্রাপ্ত আলোকচিত্র ‘শোকাতুর চোখ’

একদমই বৈষয়িক ছিলেন না আনসারউদদীন। তিনি মনেপ্রাণে শিল্পী ছিলেন। চিকিৎসক হয়েও প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতেন না। ফলে সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে আজিমপুরে একটা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে সক্ষম হয়েছিলেন। অবসর জীবনে স্ত্রী বেগম জোবেদা খাতুনকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন তিনি। প্রায়ান্ত সময়েও আনসারউদদীন ছবি তুলতেন, ছবি আঁকতেন, গান গাইতেন। বড় ক্যামেরায় ছবি তুলতে অসুবিধা হতো বলে ‘Zenza Bronica ETRSi’ ক্যামেরায় তুলতেন ফুলের কালার স্লাইড। ফুল ভালোবাসতেন বলে ৭০ বছর বয়সে ইকেবানা স্কুলে ভর্তি হয়ে কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন। ২০০৭ সালে তার সামান্য স্ট্রোক হয়। চিকিৎসায় ভালোও হন। তার নেশা ছিল আর্ট গ্যালারি ঘুরে দেখার। ব্যাগে খাবার ও পানির বোতল ঢুকিয়ে চলে যেতেন আলোকচিত্র কিংবা চিত্রকলার প্রদর্শনী দেখতে। গানের অনুষ্ঠান বা শর্ট ফিল্ম দেখতে চলে যেতেন অলিয়স ফ্রসেস, বেঙ্গল শিল্পালয়ে কিংবা কোনো কালচারাল সেন্টারে। স্টুডিওতে গিয়ে কিছু গানও রেকর্ড করেছেন। তিনি তার নেগেটিভগুলোও সযত্নে সংরক্ষণ করেছিলেন। ২০১৩ সালে দুই বার হার্ট অ্যাটাকের ফলে তার স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে। ওই বছরের ২১ নভেম্বর ভোর সাড়ে পাঁচটায় অসীমে যাত্রা করেন আলোকচিত্রের প্রতি নিবেদিত এই মানুষটি। আজ তার দশম প্রয়াণবার্ষিকী। তার প্রয়াণের দিনে তাকে প্রণতি জানাই।

তথ্যসূত্র:
১. আলোকচিত্রশিল্পীর জীবনবৃত্তান্ত, ফটোগ্রাফি (বিপিএসের রজতজয়ন্তী সংখ্যা), নভেম্বর ২০০১-জানুয়ারি ২০০২, পৃষ্ঠা ১১-১৩
২. আনসারউদদীন আহ্‌মদের পুত্র আরেফউদদীন আহমদের সাক্ষাৎকার (১৮ নভেম্বর ২০২৩)

লেখক: দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক