দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের মার্কিন মুদ্রা ডলারের সংকট চলছে। চলতি মাসের প্রথম দিকে খোলাবাজারে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ১২৮ টাকা স্পর্শ করে মার্কিন এই মুদ্রা। অথচ এই সংকটের মধ্যেই ডলারের দর কমাল ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস বাংলাদেশ (এবিবি) এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা)। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে অনুষ্ঠিত হওয়া এক জরুরি বৈঠকে ডলারের দর কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠন দুটি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাফেদার চেয়ারম্যান আফজাল করিম।
নতুন দর অনুযায়ী, রেমিট্যান্স ও রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১১০ টাকা কিনে আমদানিকারদের কাছে ১১০ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করবে ব্যাংকগুলো। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে সরকার ও ব্যাংকের প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে। রেমিট্যান্সে অতিরিক্ত আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে ১১৫ টাকা ৫০ পয়সায় ডলার ক্রয় করা যাবে। নতুন এ দর আজ বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হবে।
গত ৩০ অক্টোবরে ঘোষিত দর অনুযায়ী রেমিট্যান্স ও রপ্তানিকারকদের ডলার ১১০ টাকা ৫০ পয়সা এবং আমদানিকারকদের ডলারের দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ১১১ টাকা। আর আন্তঃব্যাংকে ডলারের সর্বোচ্চ দর ছিল ১১৪ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাফেদার চেয়ারম্যান আফজাল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাফেদা ও এবিবির বৈঠকে ডলারের দর কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগে যেই দর বেঁধে দেওয়া ছিল তার থেকে সব ক্ষেত্রেই ৫০ পয়সা করে কমানো হয়েছে।
সংকটের মধ্যে কেন হঠাৎ করে ডলারের দাম কমানো হলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে দেশের চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাব দুটিই নেতিবাচক ছিল। কিন্তু বর্তমানে চলতি হিসাব ৯০০ মিলিয়ন ডলারের মতো ইতিবাচক। গত বছর আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩৩ বিলিয়নের ওপরে। সেটা এখন অনেক কমে এসেছে। বাজারে চাহিদা-সরবরাহের যে মিসম্যাচ দেখা যাচ্ছে, সেটা সঠিক চিত্র নয়। আমাদের ডলারের প্রবাহ বেড়েছে। এজন্যই বাস্তবতার ভিত্তিতেই আমরা একটু কমিয়েছি।
আর এবিবির চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, এখন থেকে প্রতি মাসে ডলার কেনাবেচার দর আর বাড়ানো হবে না। তিনি বলেন, আর্থিক হিসাবে ঘাটতিই এখন বিদেশি মুদ্রাবাজারে প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে ইতিমধ্যেই বাণিজ্য ঘাটতি কমে এসেছে। বেশিরভাগ ব্যাংকের নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) ইতিবাচক হয়েছে। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকের কাছে বকেয়াও কমে এসেছে।
তবে এবিবি ও বাফেদার শীর্ষ কর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এখনো ডলারের সংকটের কারণে তারা এলসি খুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। গত সোমবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের বিনিয়োগ সংক্রান্ত এক বৈঠকে প্লাস্টিক ও টিন কনটেইনার উৎপাদনকারী কিউ পেইল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসির বলেন, ‘ডলার-সংকটে আমরা ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছি না। বিনিয়োগ করব কীভাবে। পরে আলোচকরা বিভিন্ন উত্তর দিলেও তিনি প্রোগ্রাম শেষে একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ছোট উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাংকে এলসি খুলতে না পারার যে বেদনার কথা তুলে ধরেছি, তার পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যে জবাব দিয়েছেন, তাতে আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। শুধু নাসির উদ্দিনই নন, এমন অভিযোগ ছোট ও মাঝারি মানের বেশিরভাগ উদ্যোক্তার। তাদের দাবি বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের মালিকানায় থাকায় তারা ডলারের সংকট টের কম পাচ্ছেন। কিন্তু ছোট ও মাঝারি মানের ব্যবসায়ীরা ডলারের সংকটে এলসি খুলতে পারছেন না।
তথ্য বলছে, দেশের প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ে পতন দেখা দিলে গত মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে বাফেদা ও এবিবি রেমিট্যান্সে প্রবাসীদের আরও আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাংকগুলোকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, এ আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু ডলার বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত দরের বেশি বিক্রি করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয় ওই চিঠিতে। এরপর কয়েকটি ব্যাংক আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে ডলার কিনতে শুরু করে।