গত ১২ দিন ধরে ফরিদপুরে বেড়ে চলেছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এর মধ্যে নারী ও শিশুর রোগী সংখ্যাই বেশি। তবে হাসপাতালে শয্যা ও শিরায় দেওয়া স্যালাইনের সংকট দেখা দেওয়ায় ফরিদপুর সদর জেনারেল হাসপাতালে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহরে ১০০ শয্যার ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে মাত্র ১০টি বেড। শীত আগমনের শুরুতেই শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সীরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন এ হাসপাতালে। সীমিত সংখ্যক জনবল দিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমসিম খাচ্ছে সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন গড়ে ভর্তি হচ্ছে ৩০/৪০ জনের অধিক ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী।
গত ১২ দিনে হাসপাতালে শুধু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ৫ শতাধিক রোগী। বিপুল সংখ্যক এই রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে ওয়ার্ডের মেঝেতে এবং ওয়ার্ডের বাইরে। শিশু রোগীদের এক শয্যায় তিনজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ১০ বেডের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে দেখা যায়, বর্তমানে ৫৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। অনেক রোগীকে রাখা হয়েছে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দার ফ্লোরে। আর শিশু রোগীদের রাখা হয়েছে একই বেডে দুইজন বা তিনজন করে। এভাবে চলছে চিকিৎসাসেবা, তার ওপর রয়েছে স্যালাইন সংকট।
একদিকে শয্যা ও কলেরা স্যালাইন সংকট, অন্যদিকে বাজারে ওষুধের দোকানে মিলছে না কলেরা প্রতিরোধে স্যালাইন, ফলে রোগীদের কিনতে হচ্ছে অনেক বেশি দামে। আবার অনেক রোগীর স্বজনরা অধিক মূল্য দিয়েও পাচ্ছে না তাদের প্রয়োজনীয় ওষধ।
এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট শিপ্রা গোস্বামী বলেন, সরকারি হাসপাতালে কলেরা স্যালাইন থাকবে না, এটা হতে পারে না। বিষয়টি দ্রুত কর্তৃপক্ষের সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ জানিয়ে বলছেন, সরকারি হাসপাতাল স্যালাইন দিতে পারছে না, আমরা বাজারে গিয়ে টাকা দিয়ে পাচ্ছি না। যা পাচ্ছি, তার দাম নিচ্ছে ৩০০ থেকে সাড়ে তিনশ’ টাকা। এতে রোগীদের দুর্ভোগ বেড়েই চলছে।
শহরের শোভারামপুর থেকে এসেছে আব্দুল জলিলের পরিবার। কলেরায় প্রথমে জলিলের স্ত্রী আক্রান্ত হন । এরপর ছেলের বউ। দিনমজুর জলিল দু’জনকে নিয়ে শয্যা না পেয়ে বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, গত দুইদিন ধরে আমরা ভর্তি হয়েছি, আমার দুই রোগীর প্রতিদিন তিনটা করে ডায়রিয়া স্যালাইন দরকার। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটির বেশি দিতে পারছে না। নিরুপায় হয়ে অনেক ঘোরাঘুরি করে ওষধের দোকান থেকে সাড়ে তিনশ’ টাকা করে এক ব্যাগ স্যালাইন কিনতে হচ্ছে। তাও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, তার মতো এই হাসপাতালে আসা অনেকেই স্যালাইন সংকটে ভুগছে।
জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে সাত হাজার কলেরা স্যালাইনের চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছিল, বিপরীতে পাওয়া গেছে মাত্র ১২০০ ব্যাগ। সম্প্রতি ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও বেশি দেখা দিয়েছে। এদিকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ধার করে ৫০০ ব্যাগ স্যালাইন আনা হয়েছে।
সংকটের কথা স্বীকার করে ফরিদপুর সদর জেনারেল হাপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার গনেশ কুমার আগরওয়ালা বলেন, এই মুহুর্তে আমরা রোগীদের সচেনতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে রোগীর চাপ অনেক বেশি, সেই তুলনায় কলেরা স্যালাইনের সংকটও আরও বেশি।
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, রোগীর চাপ আরও বাড়লে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে।
ফরিদপুর জেলার সিভিল সার্জন ডাক্তার সিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, আমরা আমাদের চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। আশা করছি, অল্প সময়েই সমস্যার সমাধান হবে।
তিনি বলেন, শীতের আগমনে তাপমাত্রার ভারসাম্যহীনতার কারণেই ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হার বাড়ছে। এক্ষেত্রে শিশু ও বয়স্কদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।