উদ্বেগজনক হারে কমছে ভোজ্য তেল ও ক্লিংকার আমদানি

দেশের অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডলারের অভাবে আমদানি কমেছে সিমেন্ট তৈরির প্রধান উপকরণ ক্লিংকারের। এতে বাড়ছে সিমেন্টের দাম। আর ব্যয় বাড়ছে নির্মাণ খাতের। পাশাপাশি আমদানি কমেছে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের। সম্প্রতি এই ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন আমদানিকারকরা। আমদানি কমে যাওয়ার এ তথ্য পাওয়া গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা কমেনি। কিন্তু ডলার সংকটসহ নানা কারণে আমদানি করা যাচ্ছে না। এভাবে ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমতে থাকলে পণ্যের দাম আরও বাড়বে। তবে মৌসুম শুরু হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমায় ক্লিংকার আমদানি কমেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বিভিন্ন পণ্যের এলসি খোলা হয়েছে ২ হাজার ১৮২ কোটি ডলারের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ বা ২৮৪ কোটি ডলার কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বিভিন্ন পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪৬৬ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আগের এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২৪ শতাংশ।

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। এতে দেশের বাজারে বেড়েছে সব ধরনের সিমেন্টের দাম। গত সপ্তাহে দেশের বাজারে সব ধরনের সিমেন্টে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ২০-২৫ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও সমন্বয় দুটোই কমেছে। এই সময়ে ঋণপত্র খোলা কমেছে ৪৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। জুলাই-অক্টোবর ক্লিংকার আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলারের। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ কোটি ডলার। একই সময়ে ঋণপত্র সমন্বয় কমেছে ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ক্লিংকারের ঋণপত্র সমন্বয় হয়েছে ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের। গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৪০ কোটি ডলারের।

কোম্পানিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাঁচামাল আমদানিতে খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাড়তি জ¦ালানি খরচ। এ কারণে কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে দাম সমন্বয় করতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে আরও দাম সমন্বয় করতে হবে বলে জানান কোম্পানিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একসঙ্গে বেশি দাম বাড়ালে হঠাৎ করে বিক্রি অনেক কমে যেতে পারে এ শঙ্কায় ধীরে ধীরে দাম সমন্বয়ের পথে হাঁটছে কোম্পানিগুলো।

একাধিক কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ে এখন ৫০ কেজির প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম কোম্পানিভেদে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ থেকে ৫৮০ টাকা। সপ্তাহখানেক আগেও এই দাম ছিল ৫৪০ থেকে ৫৫০ টাকা। এর আগে গত আগস্টে সিমেন্টে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছিল ৪০-৫০ টাকা। সে সময় সিমেন্টের দাম ছিল ৪৯০ থেকে ৫০০ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির (বিসিএমএ) নির্বাহী পরিচালক শংকর কুমার রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের বাজারে এখনো ডলারের স্থিতিশীলতা ফেরেনি। এ জন্য এলসি খোলার জন্য পর্যাপ্ত ডলার পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এতে ক্লিংকার আমদানি কমেছে। পাশাপাশি দেশে নির্বাচনী বছর ও আর্থিক সংকট থাকায় সিমেন্টের চাহিদাও কিছুটা কমেছে। কারণ সরকারি অনেক প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। আর নতুন প্রকল্প নেবে নতুন সরকার আসার পর।

সিমেন্টের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিমেন্টের যে দাম বেড়েছে এটি খুব বেশি নয়। ডলার সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন ও পরিবহন ভাড়া বাড়ায় সিমেন্টের দাম কিছুটা বেড়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমদানি কমেছে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের। এতে বাজারে আরও বাড়তে পারে ভোজ্য তেলের দাম। ইতিমধ্যে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে গত সপ্তাহে সয়াবিন তেলের দাম সামান্য কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছর পরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৪০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে পরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানিতে খরচ গুনতে হয়েছে ৯১ কোটি ৬০ লাখ ডলার; অর্থাৎ আমদানির ঋণপত্র খোলা কমেছে ৫৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আর একই সময়ে ঋণপত্রে নিষ্পত্তি কমেছে ৫৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১০৬ কোটি ডলার।

এ সময় অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের আমদানিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ডলারের। গত বছরের একই সময়ে খোলা হয়েছিল ১২ কোটি ডলার; অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ঋণপত্র খোলা কমেছে ৮৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। একই সময়ে ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে ৫৬ দশমিক ২৩ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, ডলার সংকটের কারণে যেভাবে আমদানি ঋণপত্র খোলা কমেছে, ঠিক একইভাবে কমেছে ঋণপত্র নিষ্পত্তিও। ডলার সংকটের কারণে আগের খোলা এলসিগুলোর অর্থও পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এতে এলসি ডেফার্ড করতে হচ্ছে।