সাইক্লোন জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার বিভিন্ন উপায় আবিষ্কার করেছে মানুষ। কিন্তু প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা প্রাণীরা কীভাবে টিকে থাকে ভয়ংকর বিপর্যয়েও লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
বন্যপ্রাণীরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভীষণভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, সুনামি এবং দাবানল তাদের জন্য বিধ্বংসী পরিণতি ডেকে আনে। কখনো ছাই, লাভা বা তুষারপাত অনেক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দেয়। কখনো জলোচ্ছ্বাসে তাদের মৃত্যু হয়, আগুনে পুড়ে, গাছ এবং পাথরের সঙ্গে মাথা থেঁতলে বা শিলাবৃষ্টিতে তাদের মৃত্যু হয়।
বন্যপ্রাণীদের কেউ কেউ চোখ, ডানা বা শরীরের অন্য কোথাও আগুনের ফুলকি অথবা কাটা এবং ঘর্ষণের যন্ত্রণা সহ্য করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে তাদের শ্বাসযন্ত্র এবং পাকস্থলী, দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটা অবশ্যম্ভাবী তাদের খাদ্য ঘাটতিতে ভুগতে হয়। দূষিত খাবার এবং জল থেকে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। শক্তিশালী আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত অথবা দাবানল সাময়িকভাবে আঞ্চলিক আবহাওয়ায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
গবেষণা
ভয়াবহ সাইক্লোন মোকাবিলা করে কীভাবে টিকে থাকে প্রাণীরা, তা নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা হয়েছে। চলতি নভেম্বরের গত সপ্তাহে নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয় ওই গবেষণা প্রতিবেদন। ২০১৯ সালের মে মাসে সাইক্লোন ইদাই মোজাম্বিকের জাতীয় উদ্যানে আঘাত হানার পর সেখানকার স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ওপর কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তা নিয়ে গবেষণা হয়।
গবেষণাটি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়। তারা বিস্ময়কর সব তথ্য পায়। প্রচণ্ড প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও বন্যপ্রাণীদের টিকে থাকার নতুন তথ্য পৃথিবীকে জানার ও বোঝার নতুন দিগন্ত হাজির করেছে।
মোজাম্বিকের ওই জাতীয় উদ্যানের নাম গোরোনগোসা। প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধার জন্য এটি বেশ বিখ্যাত। ক্যামেরা, জিপিএস স্থাপনের বিস্তৃত নেটওয়ার্কে সজ্জিত ছিল।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোলজি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল বায়োলজি বিভাগের গবেষণা সহকারী হ্যালি ব্রাউন বলেন, প্রযুক্তিগত এই সুবিধার কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পর্যবেক্ষণের একটি অভূতপূর্ব সুযোগ আমরা পেয়েছি।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, এটি প্রথম গবেষণা, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের প্রতিক্রিয়া কী হয় তা দেখতে তারা সক্ষম হয়েছেন।
তারা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় ইদাইয়ের আগে, চলার সময় এবং পরে প্রাণীদের আচরণ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন তারা।
বেঁচে থাকার কৌশল বিচিত্র
ব্রাউন বলেন, আমরা ঘূর্ণিঝড়ের কয়েক ঘণ্টা, তারপর কয়েকদিন ও সপ্তাহে প্রাণীদের প্রতিক্রিয়া দেখেছি। কীভাবে তাদের কেউ কেউ জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পেয়েছিল। আমাদের দল ঝড়ের আগে, ঝড় চলাকালীন এবং পরে তৈরি করা ডেটা ব্যবহার করেছে।
তাদের ভাষ্য, এ গবেষণা শুধু এই একটি জাতীয় উদ্যানের প্রাণীদের জন্য নয়, অন্য এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় কীভাবে মোকাবিলা করে বন্যপ্রাণীরা তাও জানা যাবে।
তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দুর্যোগে প্রাণীদের বেঁচে থাকার জন্য আকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ছোট প্রজাতির প্রাণীর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছিল। যেমন নিয়ালা, কুডু, সাবল এবং হাতির মতো বড় প্রাণীর মৃত্যু হয়নি।
এসব প্রাণীর বেঁচে থাকার কৌশল ছিল বিচিত্র। যেমন বুশবাকস (হরিণের মতো একটি প্রাণী)। তারা জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রাকৃতিক টিলাগুলোকে দ্বীপ হিসেবে ব্যবহার করেছে। জিপিএস ডেটা দেখাচ্ছে যে, তারা প্রাণপণে এ রকম ঢিবির খোঁজে ছোটাছুটি করছিল। একই সঙ্গে এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান যে, প্রাকৃতিক ভূমিপূর অক্ষুন্ন থাকলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণীরা সেগুলো আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে পারে।
গবেষকরা দেখেছেন, বিপরীতে ছোট প্রাণীদের ক্রমবর্ধমান জলোচ্ছ্বাস থেকে পালানোর জন্য যেমন লড়াই করতে হয়েছে, তেমনি ঝড়ের পর খাদ্য সংকটেও পড়তে হয়েছিল। কারণ জলোচ্ছ্বাস নির্ভরশীল নিচু গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছিল।
গবেষকরা আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করেন। সেটি হলো মাংসাশী প্রাণী যেমন বন্য কুকুর, চিতাবাঘ এবং সিংহের আচরণ। ঘূর্ণিঝড়ের পর তারা সহজে শিকার পেয়ে যেত। কারণ জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচতে বিভিন্ন প্রাণী একটি উঁচুস্থানে জড়ো হতো। যেখানে মাংসাশী প্রাণীরা সহজে তাদের খাবার পেয়ে যেত। তারা এটাও দেখেন যে, সিংহ নিয়মিতভাবে শিকার করত ওয়ারথগুলো। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের পর বেশ কয়েক মাস ধরে উচ্চভূমিতে অবস্থান করলেও সিংহ আর তাদের ধারে-কাছে যায়নি। কারণ একসঙ্গে অনেক ওয়ারথ থাকলে সিংহের জন্য বিপদ।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসেও ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত হরিণের পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। নর্থ আমেরিকান হোয়াইট টেল ডটকম জানায়, গবেষকরা একটি ঘূর্ণিঝড়ের পর চারপাশের তলিয়ে যাওয়া বনে অনেক মৃত হরিণ দেখতে পান। গবেষকরা বলেন, ঝড়ের সময় হরিণগুলো আক্ষরিক অর্থে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করে পাগল হয়ে যায়। কেউ কেউ গভীর প্রাচীর ঘেরা খাঁড়িতে আশ্রয় নেয়। তাদের মতে, একটি জিনিস নিশ্চিত, হরিণ সহস্রাব্দ ধরে এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করেছে এবং তারা বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে পেয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান চলতি বছরের মে মাসে এক প্রতিবেদনে জানায়, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইভ ফান্ড এবং কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের গবেষকরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানলে আক্রান্ত অস্ট্রেলিয়ার আটটি অংশে প্রায় ১১শ ক্যামেরা বসিয়ে সাত মিলিয়নেরও বেশি ছবি সংগ্রহ করে।
পরামর্শ
ঘূর্ণিঝড় ইদাই ছিল খুবই শক্তিশালী। যা দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার কিছু অংশে আঘাত হানে। যা সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড় হিসাবে নথিভুক্ত হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়টি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যার ফলে মোজাম্বিক, জিম্বাবুয়ে, মালাউ এবং আশপাশের অঞ্চলগুলোতে গুরুতর মানবিক সংকট দেখা দেয়।
তবে গবেষকরা এও বলছেন, এর আগে তারা বাহামাসের দ্বীপগুলোতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ওই এলাকার টিকটিকি, মাকড়সা এ জাতীয় বিভিন্ন প্রজাতি ঘূর্ণিঝড়ের সময় যেভাবে টিকেছিল, গোরোনগোসার প্রাণীর টিকে থাকা ছিল ভিন্ন। এর কারণ বাস্তুতন্ত্র। সে অনুযায়ী প্রাণীরা টিকে থাকে।
গবেষক দলটি মোজাম্বিকের ওই জাতীয় উদ্যানের বন্যপ্রাণী পরিচালকদের ঝড়ের আগে ছোট এবং পরিবেশগতভাবে দুর্বল প্রজাতিগুলো নিরাপদে সরিয়ে নিতে পরামর্শ দেন। এ ছাড়া তারা জলোচ্ছ্বাসের পর ডুবে থাকা গাছপালার বিকল্প হিসেবে খাদ্য সরবরাহের উপায়ও বাতলে দেন।
সুন্দরবন
বাংলাদেশকে একের পর এক বড় ঝড় থেকে রক্ষা করে আসছে সুন্দরবন। তবে এ জন্য সুন্দরবনকে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
যেমন- ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে সুন্দরবনের সাড়ে চার হাজার গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই বছরের ১০ নভেম্বর ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিবেগে প্রথমে ভারতে, পরে বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় আঘাত করে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। সুন্দরবনে আঘাত করার কারণে ঝড়টির গতি কমে যায় এবং লোকালয়ের ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।
ওই ঘূর্ণিঝড়ে বন্যপ্রাণী মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বনসংশ্লিষ্টরা পাখির ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করলেও তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এর দুবছর পর ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’র প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে জোয়ারের পানি ৫ থেকে ৬ ফুট উঁচু হয়। এ জোয়ারের পানিতে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র তলিয়ে যায়। বনের অভ্যন্তরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। এ জন্য বনের বিভিন্ন উঁচু স্থানে বন্য শূকর ও হরিণ আশ্রয় নেয়। সুন্দরবনে এত পানি আগে কখনো দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা তখন জানান।
জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বনের অভ্যন্তরীণ নদনদীর উপচেপড়া পানির স্রোতে ভেসে যায় বহু বন্যপ্রাণী। মৃত হরিণও উদ্ধার হয় বেশ কয়েকটি। সমুদ্রের লোনা পানিতে ডুবে যায় বনের মিষ্টি পানির পুকুর ও জলাশয়। বনের প্রাণিকুলের আধার পরগাছা-লতাপাতা নষ্ট হয়। এতে বন্যপ্রাণীর খাদ্যাভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করা হয় তখন।
বিশেষজ্ঞরা সংবাদমাধ্যমকে আরও জানান, ঘূর্ণিঝড়ের পর জলোচ্ছ্বাসে প্রচুর হরিণ ভেসে যায়। তাদের কোনো কোনোটি দূর লোকালয়ে ভেসে আসে। জীবিত অবস্থায় উদ্ধারও হয়। যার কিছু কিছু খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে পানিতে ভেসে আসার বাইরেও বনের অভ্যন্তরে মৃত বন্যপ্রাণী থাকতে পারে, যা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয়নি বাংলাদেশে।
যে কারণে সুন্দরবনের প্রাণীরা কীভাবে ঘূর্ণিঝড় সংকুল এলাকায় টিকে থাকছে সে বিষয়ে তথ্য প্রায় নেই বললেই চলে।
সুন্দরবনের ভারত অংশেও ঝড়ের পর বন্যপ্রাণীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। সেখানকার বনসংশ্লিষ্টরা ২০২০ সালে ‘আম্পান’ ঝড়ের পর জানান, তারা যন্ত্রচালিত নৌকা ও ড্রোন উড়িয়ে অভয়ারণ্যের ৭০ শতাংশ এলাকার সমীক্ষা শেষ করেছি। তাতে বনভূমির প্রবল ক্ষয়ক্ষতি নজরে পড়েছে। তবে কোনো প্রাণীর দেহাবশেষ মেলেনি। আকাশে কোথাও শকুন উড়তেও দেখা যায়নি। যাতে অনুমান করা যায় জঙ্গলে কোনো প্রাণীর দেহ নেই।
প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিপুল বিনিয়োগ ও নিষ্ঠা ছাড়া সুন্দরবনে এমন ধরনের গবেষণা পরিচালনা সম্ভব নয়। সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম বিচিত্র এক বন, যেখানে বাঘসহ অনেক প্রাণী রয়েছে, যাদের সংরক্ষণ জরুরি। আর সংরক্ষণের প্রয়োজনে তাদের বিষয়ে জানতে হবে। জানতে গেলে অবশ্যই প্রয়োজন গবেষণার।
সুন্দরবনে ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল ও মায়া হরিণ, বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতিসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন, লোনা পানির কুমির, কচ্ছপ ও কিং কোবরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ রয়েছে।
ফিরে আসে প্রকৃতি
গবেষকরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জন্য ধ্বংসাত্মক। যার ফলে সম্পত্তি এবং জীবনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আর আবশ্যিকভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যপ্রাণীরও ক্ষতি করে। মানুষের মতোই বন্যপ্রাণী ঝড়কে মোকাবিলা করতে পারে এবং তাদের জীবনচক্র ও বংশবৃদ্ধি চালিয়ে যেতে পারে, যা প্রায় লাখ লাখ বছর ধরে চলে আসছে।
তারা বলছেন, প্রকৃতি সহস্রাব্দের অভিজ্ঞতায় কাজ করে। যেমন ঝড়ে হয়তো একটি ১০০ বছরের পুরনো ওক গাছ পড়ে গেল। কিন্তু আরও একটি ওক ফিরে আসবে। একইভাবে বন্যপ্রাণী ঝড়ের পর বন শান্ত হলে তাদের প্রয়োজন মেটানোর উপায় খুঁজে পাবে। হয়তো তারা এলাকা ছেড়ে দেবে অথবা নতুন খাবারে অভ্যস্ত হবে।