ইসলামের সৌন্দর্য

ইসলাম একটা সুশৃঙ্খল, পরিপাটি, সাজানো-গোছানো জীবন পদ্ধতি। ইসলাম হলো পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন এক জীবনব্যবস্থা যা ব্যক্তির জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। ইসলামের সৌন্দর্যের কথা বললে বলে শেষ করা যাবে না। ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভ রয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলো হলো ইমান, নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ। এ পাঁচটি স্তম্ভের দিকে তাকালেই আমরা ইসলামের সৌন্দর্যতা খুঁজে পাব। আল্লাহতায়ালা মুমিনদের জন্য এ পাঁচটি স্তম্ভ ফরজ বা অত্যাবশ্যক করেছেন।

প্রথমে নামাজের কথায় আসি। আল্লাহতায়ালা মুমিনদের জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। পাড়া-মহল্লার সবাই এ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে একে অন্যকে দেখার, খোঁজ-খবর নেওয়ার সুযোগ হয়। একত্রে সারিবদ্ধভাবে যখন জামাতে দাঁড়ায় তখন সমাজের উঁচু-নিচু, ধনী-গরিব, আত্মীয়-অনাত্মীয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য ও ভেদাভেদ থাকে না। সবাই এক আল্লাহর স্মরণে, এক আল্লাহর কাছে মাথা নত করে। আল্লাহতায়ালা নামাজের পাশাপাশি জাকাতকেও ফরজ করেছেন। সুরা বাকারার ২৭৭ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর ওপর ইমান এনে সৎ কাজ করবে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে এবং জাকাত আদায় করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং চিন্তিতও হবে না।’

কোরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা ৮২ বার নামাজের সঙ্গে সঙ্গে জাকাতের কথা বলেছেন। নামাজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি, জাকাত আদায়ও গুরুত্বপূর্ণ। জাকাত হলো ধনীর সম্পদ থেকে গরিবের জন্য প্রাপ্ত অধিকার। আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে সবাইকে সমান সম্পদ দিয়ে পাঠাননি। কাউকে ধনী, কাউকে গরিব করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এতে ধনী-গরিব উভয়ের জন্যই দৃষ্টান্ত রয়েছে। ধনীর সম্পদ থেকে গরিবরা সম্পদ পাবে। জাকাত প্রদানের ফলে ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য, পার্থক্য দূর হয়। এভাবেই আল্লাহতায়ালা কী সুন্দর করেই না বৈষম্য নিরসনের উপায় বলে দিয়েছেন!

ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ রোজা। আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের উদ্দেশ্য করে কোরআনে সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনটা করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ রমজান মাস হলো আল্লাহর বিধি-নিষেধ ও হুকুম-আহকাম মান্য করার মাস। আল্লাহতায়ালা এখানে দেখিয়েছেন যে, যারা অনাহার অর্ধাহারে কতটা কষ্টে দিন কাটায় তা ধনীরা বুঝবে না। তাই তিনি রোজার মাধ্যমে গরিবের দুঃখ, কষ্টটা তুলে ধরেছেন। পুরো একমাস ধনীরা অনাহারে রোজা রেখে ক্ষুধার্তের অবস্থা বুঝতে পারে। আল্লাহ কত সুন্দর করেই না রোজার ফজিলত তুলে ধরেছেন তার বান্দার কাছে।

এবার আসি হজের কথায়। আল্লাহ প্রত্যেক সুস্থ, সবল, বিবেকবান, সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য হজ ফরজ। হজ হলো মুসলমানদের জন্য মিলনমেলা, যাকে বলা হয় মহাসম্মেলন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসলমান পবিত্র মক্কা-মদিনায় জিলহজ মাসে কিছুদিনের জন্য একত্রিত হয়। তাদের ভাষা, আচার-আচরণ, চলাচল, পোশাক, আকার-আকৃতি সর্বব্যাপী প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কালচার হওয়া সত্ত্বেও সবাই এক মনে, একই সাদা পোশাকে মহান আল্লাহর ডাকে একত্রিত হয়। সবার মুখে এক আল্লাহর নাম। আল্লাহতায়ালা হজ ফরজ করে গোটা মুসলিম জাতিকে একত্র করার সুযোগ করে দিলেন। তাদের একে অন্যের ভাষা, আচরণ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক রীতিনীতি বুঝতে, একে অন্যের সংস্কৃতি জানতে কী অপরূপ এক মিলনমেলা! হজের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি হয়।

এভাবে শুধু পাঁচ স্তম্ভ নয়, ইসলামের পরিসর আরও ব্যাপক। আমাদের পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা সব ক্ষেত্রেই ইসলাম আবশ্যক ভূমিকা পালন করে। পরিবারের সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, গরিব-এতিমের সঙ্গে আচরণ, সমাজের একে অন্যের খোঁজ-খবর নেওয়া সব ক্ষেত্রেই ইসলামের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ব্যক্তির আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ, কথার মাধুর্যতা সবখানেই ইসলামের গুরুত্ব, প্রভাব করেছে।

ইসলাম মানুষকে মুক্তির আহ্বান করে, আত্মার পরিশুদ্ধি করে। ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তির বিশ্বাস, ভালোবাসা তৈরি করে। প্রতিবেশীর হক আদায়, তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করা, রোগ শোকে পাশে থাকা ইত্যাদি কাজের নির্দেশনা দেয়  ইসলাম। পরিপূর্ণ ইসলামে প্রবেশ করলে মানুষের ইহকালে ও পরকালে মুক্তি মিলবে।

ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত রাষ্ট্রনায়ক ধনী গরিব, আত্মীয় অনাত্মীয়, উঁচু নিচুর মধ্যে কখনো পার্থক্য করবে না। তার মনে স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান থাকবে না। ব্যক্তির স্ব স্ব যোগ্যতা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কাজের দায়িত্ব পাবে, সে দলীয় বা বিরুদ্ধ দলীয় লোক হলেও। ইসলামই নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী করেছে। নারীর অধিকার রক্ষায় পুরুষ সব সময়ই সোচ্চার থাকবে।

ইসলাম মানুষকে সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করে। ইসলামি আদর্শে জীবন পরিচালনা করলে ইহকালে যেমন শান্তিতে বসবাস করতে পারে তেমনি পরকালের কল্যাণের পথও সুগম হয়।

ইসলামি স্কলাররা বলেন, ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য পেতে হলে পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করতে হবে। ইসলামের কিছু মানলাম আর কিছু মানলাম না, নিজের মন মতো ইসলাম মানলে, নিজের ইচ্ছে মতো চললে, ইসলামের সৌন্দর্য, স্বাধ উপভোগ করা যায় না। সুরা বাকারার ২০৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা নিজেই বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু।’