তবু আনন্দ জাগে...

দুঃসহ দীর্ঘ যুদ্ধকাল পেরিয়ে গাজায় মিলেছিল যুদ্ধবিরতি। আগুন, মৃত্যু, ধ্বংসের যজ্ঞে ক্ষণিকের বিরতি। তবু আনন্দ, তবু শান্তি গাজাবাসীর মনে। আলজাজিরা, দি মিডলইস্ট আই ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে লিখেছেন নাজমুল আহসান

সেই ১৯৬৭’র আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পুরো ফিলিস্তিন যেন এক অবরুদ্ধ ক্যাম্প ও বন্দিশালা। সেখানেও ইসরায়েলি দখলদারদের নিয়মিত হানা। ক্রমাগত নিপীড়ন, অত্যাচারে প্রত্যেক ফিলিস্তিনি আজ বিদ্রোহী। হামাস তার একটি প্রকাশ মাত্র। যার বিস্ফোরণ ঘটে গত ৭ অক্টোবর। হামাসের হামলার পর প্রায় সাত সপ্তাহ গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে গেছে ইসরায়েল। তারা প্রায় পনেরো হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। বিধ্বস্ত করেছে গাজাকে। সাত সপ্তাহ প্রতিশোধমূলক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর কিছুটা শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। যার অংশ হিসেবে গত শুক্রবার থেকে চার দিনের জন্য ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চার দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর অংশ হিসেবে ৩৯ জন ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুকে বন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করা হয়, যাদের মধ্যে ১৭ জন শিশু ও ২২ নারী।

বন্দি অনেক ফিলিস্তিনি

এ মুহূর্তে আট হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি আছে। ৭ অক্টোবরের পর প্রায় তিন হাজার ফিলিস্তিনি এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুযায়ী মুক্তি পাওয়া ৩৯ জনের মতো স্বজনদের দেখা পাওয়ার প্রহর গুনছে শত শত ফিলিস্তিনি যাদের একটি বড় অংশ কিশোর ও নারী। এমন একজন বন্দির নাম সহরখ দওয়াত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীকে ছুরি নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। এ অজুহাতে তাকে ১৬ বছরের জেল দেওয়া হয়। ২০১৫ সাল থেকে তিনি কারাগারে বন্দি আছেন। দওয়াত হচ্ছেন ফিলিস্তিনি নারীদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কারাদণ্ড ভোগকারী। গ্রেপ্তারের সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর। আলজাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে দওয়াতের পরিবার।

এমন অনেক ফিলিস্তিনি বন্দি গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের জেলে বন্দি আছেন। এক তথ্য মতে, পশ্চিম তীরে প্রতি বছর ন্যূনতম প্রায় ১৮ বছরের কম ৭০০ শিশুকে গ্রেপ্তারের পর ইসরায়েলি সামরিক আদালতে বিচার করা হয়। ফিলিস্তিনিদের গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে ইসরায়েল যেসব অভিযোগ করে সেগুলো হচ্ছে, নিরাপত্তার হুমকি, ইসরায়েলি ভূমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পাথর নিক্ষেপ, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন, বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ইত্যাদি।

স্বজনের কাছে ফেরা

এবারের বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় মুক্তি পাওয়া একজন ৫৯ বছর বয়সী নারী হানান বারঘোতি। বারঘোতি সাত সন্তানের জননী, পশ্চিম তীরে রামাল্লায় তার নিবাস। গত দুই মাস ধরে ইসরায়েলি জেলে বন্দি ছিলেন। গত ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গত ৫ সেপ্টেম্বর বারঘোতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কোনো ধরনের অভিযোগ গঠন ও বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই তাকে ইসরায়েলের কুখ্যাত ‘প্রশাসনিক আটকাদেশ’ নীতির আওতায় প্রাথমিকভাবে চার মাসের জন্য আটক দেখানো হয়। তার চার ছেলে ইতিমধ্যে ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষের কাছে বন্দি অবস্থায় আছে।

‘দি মিডলইস্ট আই’র কাছে এক সাক্ষাৎকারে তার স্বামী মুহাম্মদ বারঘোতি বলেন, ‘আমার ঘর শূন্য, আমার সব ছেলে ও স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, খুব একা লাগে’। কিন্তু বন্দি বিনিময়ের খবর আসতে থাকায় তার পরিবারের অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হতে শুরু করে। সাত সন্তানের এই জননী গত বৃহস্পতিবার রাতে ইসরায়েলি বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। ‘আমি যখন তার নাম মুক্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় দেখি, তখন থেকেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচি’, জানান মুহাম্মদ বারঘোতি। তবে তিনি আরও জানান, তার এই খুশি অসম্পূর্ণ। তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ গাজার ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার, এর বাসিন্দাদের সহযোগিতা ও ইসরায়েলিদের বোমাবর্ষণ বন্ধ করা।

৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার পর ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয় যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য নারী ও শিশু। এ সময়ে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে হানান বারঘোতির দুই ছেলে ও এক মেয়ের জামাইকে আটক করা হয়। যারা বর্তমানে তাদের কারাগারে আছেন। পরিবারটি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। তারপরও হানান বারঘোতির মুক্তি তাদের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির।

স্বামী মুহাম্মদ বারঘোতি আরও বলেন, ‘হানান খুব প্রাণবন্ত ও বন্ধুবৎসল। ঘরে ও বাইরে যেখানেই যান না কেন তিনি বিশেষ পরিবেশ তৈরি করেন। আমি নিশ্চিত তার বৃদ্ধ বয়স ও অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি জেলখানায় তার চারপাশের নারী বন্দিদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে পেরেছেন।’

মেয়ে জানে না মা কোথায়

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার বন্দি বিনিময় নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি মিশ্র অভিজ্ঞতা। একদিকে অগণিত স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে সংখ্যায় কম হলেও ইসরায়েলের জেল থেকে প্রিয়জনের মুক্তি। বর্তমান বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ৫০ ইসরায়েলি ও ১৫০ ফিলিস্তিনি নারী-শিশুর মুক্ত হওয়ার কথা। পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা ১০০ ইসরায়েলি ও ৩০০ ফিলিস্তিনি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এই অপেক্ষমাণ বন্দি মুক্তিদের মধ্যে আরেক জন হতে পরেন ফাতিমা শাহিন। যিনি গত ১৭ এপ্রিল পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ‘বন্দি দিবস’ আয়োজনকালে ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে গুলিবিদ্ধ, আহত ও গ্রেপ্তার হন। অধিকার কর্মীরা বলেন, ইসরায়েলি সৈন্যরা ‘গুলি ও হত্যার’ নীতিতে অভ্যস্ত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কদাচিৎ তাদের আনা অভিযোগ বিষয়ে তদন্ত করে থাকে। শাহিনের ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সৈন্যরা চারটি গুলি করে তার ঘাড়, কাঁধ ও পায়ে জখম করে। তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং তার কিডনি থেকে একটি গুলি বের করা হয়। ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযোগ, শাহিন উত্তর হেবরনের একটি ইসরায়েলি বসতিতে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিলেন, তখন থেকেই শাহিন বন্দি অবস্থায় আছেন। শাহিনের পাঁচ বছরের মেয়ে বোঝে না তার মায়ের কী হয়েছে। কিন্তু সে তার মায়ের জন্য এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

বৈধ সহিংসতা!

সহিংসতা ও নৃশংসতা নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলকে একে অপরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলসহ অনেক পশ্চিমা মিডিয়া হামাসের হামলার নৃশংসতা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপ-তথ্য, মিথ্যা-তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। পরবর্তী সময়ে যার অনেকগুলো ভুল ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। মূলত ফিলিস্তিনিদের ওপর অতর্কিত আক্রমণের বৈধতা দিতেই এ চেষ্টা, সেটাই সরল সমীকরণ। এসব হলো সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা।

এটাও ঠিক, হামাস যাদের জিম্মি করে গাজায় নিয়ে গেছে তারাও একটা ভয়ংকর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হামাসের হামলায় অনেকে আহত ও নিহত হয়েছে। এটা সহজে অনুমেয়, জিম্মি করার সময়টি কারও জন্য কোনো সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না। নিঃসন্দেহে সেখানে অযাচিত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পর কয়েকজন ইসরায়েলি জিম্মি গণমাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তাদের কাছ থেকে জানা যায়, হামাসের হাতে জিম্মি হওয়ার পর তারা কীভাবে গাজার সুড়ঙ্গের চক্করে পড়ে গিয়েছিলেন। অবশ্যই তাদের তাছে ভীতিকর ছিল সেই সময়টা। তবে মুক্তি পাওয়ার ইসরায়েলি জিম্মিরা জানিয়েছেন, বন্দিদশায় তাদের সঙ্গে হামাস সদস্যরা ভালো ব্যবহার করেছেন ও সেবা দিয়েছেন। যা অনেক ইসরায়েলির কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। এখানে নিঃসন্দেহে মানবতার জয় হয়েছে।

কিন্তু কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা যেভাবে কারণে-অকারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়, দীর্ঘসময়েও তার কোনো জবাবদিহি যেমন তৈরি হয়নি, একইভাবে বিভিন্ন উপলক্ষে তাদের যেভাবে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয় তার কোনো বিহিত হচ্ছে না।

মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, কারাগারের তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়। অনেককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও দেওয়া হয় না।

যেমন বলা যায় সাদিয়া ফারাজুল্লাহর কথা। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক নারী বন্দি। মিডলইস্ট আই জানাচ্ছে, গ্রেপ্তারের সময় ইসরায়েলি বাহিনী সাদিয়াকে লাঞ্ছিত করে। গ্রেপ্তার হওয়ার ছয় মাস পর তিনি মারা যান।

ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স ক্লাব জানিয়েছে, হেবরনের একটি সামরিক চেক পয়েন্টের কাছে ইসরায়েলি বাহিনী তাকে মারধর ও আটক করে। এর ছয় মাস পর গত শনিবার ৬৮ বছর বয়সী ওই নারী ইসরায়েলের কারাগারে মারা যান।

প্রিজনার্স ক্লাব ইসরায়েলি কারা কর্র্তৃপক্ষকে চিকিৎসায় অবহেলার জন্য অভিযুক্ত করে। তারা বলছে, সাদিয়া ফারাজাল্লাহ অসুস্থ ছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগছিলেন।

তারা বলছে, সাদিয়ার মৃত্যু চিকিৎসায় অবহেলার কারণে হয়েছে। ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়নি এবং অসুস্থ হওয়ার পরও তাকে আটকে রাখে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ইসরায়েলি আদালত ফারাজাল্লাহকে মুক্তি দিতে তার আইনজীবীদের অনুরোধ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। আটকের সময় পরিবারের কেউ তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাননি।

প্রিজনার্স ক্লাব বলছে, ইসরায়েলে বন্দি ৪ হাজার ৭শ ফিলিস্তিনির মধ্যে প্রায় ৬৪০ জনকে প্রশাসনিকভাবে আটকে রাখা হয়েছে। যা একটি বিতর্কিত নীতি। ইসরায়েল তিন থেকে ছয় মাসের জন্য বিচার ছাড়াই আটকে রাখতে এ নীতি ব্যবহার করে।

আজ সারা দুনিয়া জানে ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী কতটা নির্মম আচরণ করছে। তারা কী ধরনের মাত্রাতিরিক্ত শক্তির প্রয়োগ করে থাকে সে সবের ঘটনাও আছে অনেক। গত ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার পর ইসরায়েলিদের নৃশংস প্রত্যুত্তর আগের সব নির্মমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। নিহত ও উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় শত শত শিশু। একের পর এক ভবন ধসিয়ে দিয়েছে তারা গোলার আঘাতে। খাবার পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ছিল না ইন্টারনেটসহ যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা। এমন নির্মমতা পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে।

তারপরও স্বস্তি যুদ্ধবিরতি এসেছে। হামাস যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর আবেদন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও আগ্রহী এতে। পৃথিবীবাসীর চাওয়া এ যুদ্ধ এখানেই থেমে যাক। বিরতি থেকেই শুরু হোক ফিলিস্তিনের নতুন জীবন। যুদ্ধের ক্ষত আছে, তবু আনন্দ জাগুক তাদের মনে।