দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে যুক্তরাজ্যে চার বছর স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন নওয়াজ শরিফ। পাকিস্তানে বলাবলি চলছে, তিনি ও তার দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ (পিএমএল-এন) আছে দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সেনাবাহিনীর সুনজরে। এদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, নওয়াজকে সুবিধা দিতে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনও তৎপর। দেশে ফেরা নওয়াজের ক্ষমতায় ফেরার পথ সুগম করতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নিধারণে কূটকৌশল চলছে এবং সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এই অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার (২৯ নভেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধীদলগুলো পাকিস্তানে নির্বাচন-পূর্ব কারচুপি হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে। তারা এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না অভিযোগ করছে। এরই মধ্যে এবার নির্বাচন কমিশনও সীমানা পুনর্নিধারণ করা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
গার্ডিয়ান বলছে, সাম্প্রতিক জনশুমারির অজুহাতে নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাসে হাত দেয় পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন। অথচ দেশটির সদ্য বিদায় নেওয়া শাহবাজ সরকারের আমলে করা ওই জনশুমারিই বেশ বিতর্কিত। সেই বিতর্কিত জনশুমারির ভিত্তিতে করা নির্বাচনী এলাকা পুনর্নিধারণের বিরুদ্ধে পাকিস্তানজুড়ে ১৩০০ আপত্তি উঠেছে। একটি নির্বাচনী এলাকা নিয়ে বিতর্ক উঠছে জোরেশোরে। সেটি হলো বালোচিস্তানের হারনাই এবং সিবি এলাকাকে একটি সংসদীয় এলাকায় নিয়ে আসা। অথচ এই দু’টি এলাকার মাঝে দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটার, এছাড়া এ দুই এলাকার জলবায়ু, সংস্কৃতি এবং মানুষের মধ্যেও রয়েছে বেশ ভিন্নতা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এলাকা পুনর্নিধারণের অজুহাতে এবছরের নভেম্বরের নির্বাচন পিছিয়ে নেওয়া হয়েছে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে। বিরোধীদের অভিযোগ, যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে সদ্য বিদায় নেওয়া প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভাই নওয়াজ শরিফ যেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন সেই সুযোগ দিতেই সময়ক্ষেপণ করছে নির্বাচন কমিশন। নওয়াজ পাকিস্তানে তিন বার প্রধানমন্ত্রী পদে বসেছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি দেশের বাইরে স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন। এখন দেশে ফিরে দল ও নিজের অবস্থান সুসংহত করতে ব্যস্ত তিনি।
গার্ডিয়ানের ভাষ্যমতে, এবারের নির্বাচনে নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের সর্বসময় ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর পছন্দের প্রার্থী। আর সেনাবাহিনীই দেশটিতে সরকার প্রধান বানানোর নেপথ্যে থাকে। যদিও নওয়াজের শরিদের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ (পিএমএল-এন) সেনা পৃষ্ঠপোষকতার কথা অস্বীকার করে।
কিন্তু নির্বাচনী এলাকা পুনর্নিধারণ নিয়ে করা ৮০ শতাংশ অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দলকে সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে। এতে সামনের নির্বাচন যে কতটুকু সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পর্যবেক্ষক সংস্থা ফ্রি এন্ড ফেয়ার ইলেকশন নেটওয়ার্কও পাকিস্তানের নির্বাচন এলাকা পুনর্বিন্যাস নিয়ে প্রবল আপত্তি করেছে। প্রস্তাবিত নির্বাচনী এলাকার এক পঞ্চামাংশেই ভোটার সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা হয়নি।
বালোচিস্তানের রাজনীতিক দিনার দমকি অভিযোগ করেছেন, সাবেক মন্ত্রী নুর মোহাম্মদ দুমার সম্প্রতি নেওয়াজ শরিফের পিএমএল-এন দলে যোগ দিয়েছে। তাকে নির্বাচনী সুবিধা দিতেই ভৌগলিক দূরত্ব বিবেচনা না করেই হারনাই ও সিবিকে একটি নির্বাচনী এলাকায় পরিণত করার অপচেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন। এমনকি এজন্য কমিশন ঘুষও নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দিনার বলেন, ‘এটা হলো নির্বাচন-পূর্ব জালিয়াতি, কোনো ভৌগলিক দূরত্ব, সাংস্কৃতি পার্থক্য বিবেচনায় না নিয়ে বদ্ধ কক্ষে বসে তারা সিদ্ধান্ত নিলো এই দুই এলাকা মিলে একটি নির্বাচনী এলাকা হবে। অথচ এটা বাস্তবায়িত হলে একটি বিশাল এলাকার মানুষ ভোটই দিতে পারবে না। দিতে চাইলেও তাদের অন্তত ৫টি জেলা পার করে তবেই ভোট দিতে যেতে হবে।’
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেকের অভিযোগ কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে (পিটিআই) পাশ কাটিয়ে এই নির্বাচনী এলাকা পুনর্নিধারণ করা হচ্ছে। অথচ পাকিস্তানিদের মধ্যে ইমরানের দলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আপাতত একের পর এক মামলায় ইমরানকে কারাগারে থাকতে হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে ২০০ টির মতো মামলা আছে। এদিকে সেনা মনোনীত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রুদ্ধ কারাগারে ইমরানের বিচার করতে তোরজোড় চলছে। এমনকি এর বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের আদেশকেও ‘ইমরানের নিরাপত্তার অভাব’ দেখিয়ে অগ্রাহ্য করেছে সরকার।
পিটিআই নেতাদের অভিযোগ, আসন্ন নির্বাচনে ইমরান যেন অংশ নিতে না পারেন সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার দলকে বেকায়দায় ফেলতে নির্বাচনী এলাকা পুনর্নিধারণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বেশি পরিবর্তন আনা হচ্ছে ইমরানের দলের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের আসনগুলোতে। এই প্রদেশে ইমরানের দলকে চ্যালেঞ্জ করতে একেবারে নতুন একটি দলকেও দাঁড় করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন পিটিআই নেতাকর্মীরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র কথা বলেন গার্ডিয়ানের সঙ্গে। তিনি বলেন,’ প্রাথমিক আপত্তির ব্যাপারে বলতে গেলে, আমরা সব কিছু আইন মোতাবেক করছি। এখনো যেহেতু সব চূড়ান্ত হয়নি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি, তাই এ ব্যাপারে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারছি না।’