দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে উভয় সংকটে পড়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। দল থেকে রওশন এরশাদের ছেলে সাদ এরশাদ ও ডাক্তার কে আর ইসলাম ছাড়া অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। এখন রওশন এরশাদ যদি তাদের প্রস্তাব মেনে অনুসারীদের রেখে নির্বাচনে যান তাহলে জাতীয় পার্টিতে তার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। অপরদিকে তিনি যদি নির্বাচনে না যান তাহলে জাপাতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে জি এম কাদেরের।
দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের হাতে থাকায় রওশনের কোনো ক্ষমতা নেই। কাল বৃহস্পতিবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষদিন। তবে এখন পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেননি রওশন। এদিকে গত এক সপ্তাহ ধরে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত তিনি সফল হননি। ফলে তিনি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জাপার দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, জি এম কাদের যেকোনো উপায়ে জাপায় একক কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চান। নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান না নিয়ে তলে তলে দর কষাকষি করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয় নির্বাচনে জিতে জাপা যদি বিরোধী দলের জায়গায় বসার যোগ্যতা অর্জন করে তাহলে জি এম কাদেরকে বিরোধী দলীয় নেতা বানানো হবে। দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে কাদেরের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
জাপা প্রতিষ্ঠাতা এরশাদের মৃত্যুর পর চেয়ারম্যান পদ নিয়ে দেবর-ভাবির বিরোধ চূড়ান্ত আকার লাভ করে। এই বিরোধে রওশনের পক্ষ নেওয়ায় ইতিমধ্যে একাধিক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন কাদের। এমনকি এই নেতাদের এবার দলের মনোনয়নও দেওয়া হয়নি।
জাতীয় পার্টির অন্যতম বড় নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য। এই আসন থেকে নির্বাচন করে তিনি সরকারের প্রতিমন্ত্রীও হয়েছিলেন। কিন্ত এরশাদের মৃত্যুর পর রওশনকে বাদ দিয়ে জি এম কাদেরকে বিরোধী দলীয় নেতার পদে বসাতে যে চিঠি দেওয়া হয় দলের মহাসচিব হিসেবে স্পিকারকে বলে তা আটকে দেওয়ার দায়ে রাঙ্গাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন চেয়ারম্যান। সেই বহিষ্কারাদেশ না ওঠায় এবার তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী। ৪ বারের এই সংসদ সদস্যকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। দলে তিনি রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত। রওশন এরশাদ মূলত যে সিদ্ধান্ত নেন তার রচয়িতা হিসেবে মনে করা হয় বিরোধী দলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ ও মূখপাত্র কাজী মামুনুর রশীদকে। এবার জাপা থেকে এই দুই নেতার জন্য মনোনয়ন চেয়েও পাননি রওশন এরশাদ। এখন এই নেতাদের বাদ দিয়ে নির্বাচনে গেলেও জাপায় রওশনের কিছু করার ক্ষমতা থাকবে না, ফলে তিনি তাদের না নিয়ে নির্বাচনে যাবেন না।
সর্বশেষ গত শনিবার রাতে রওশন এরশাদের বাসায় যান জি এম কাদের। সেখানে রওশন এরশাদ তার ছেলে সাদ এরশাদকে রংপুর-৩ আসনে মনোনয়ন না দিয়ে কাদের কেনো ফরম তুললেন সে বিষয়ে জানতে চান এবং বাবার আসনটি সাদকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ জানান বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেন রওশনপন্থী এক নেতা।
এই নেতা বলেন, জবাবে জি এম কাদের এই আসনে নির্বাচন করবেন বলে জানান এবং সাদকে রংপুর-২ ও ৪ আসন কিংবা অন্য যেকোনো আসনে নির্বাচন করার প্রস্তাব দেন। রওশন তাতে রাজী হননি। একই বৈঠকে দলের বহিষ্কৃত নেতা মসিউর রহমান রাঙ্গা, গোলাম মসীহসহ কয়েকজনের মনোনয়ন বিষয়ে কথা তোলেন। কিন্তু জি এম কাদের এ বিষয়ে তার আগের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তিনি বলেন দলের সব বিরোধে এরাই থাকে, তাই তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না।
এ অবস্থায় রওশন পন্থীরা তাকিয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে। তারা শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান। এর আগে মশিউর রহমান রাঙ্গা ও কাজী মামুনুর রশীদও দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছেন। কিন্ত গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত রওশন এরশাদ গণভবন থেকে ডাক পাননি বলে জানান মশিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ম্যাডাম নির্বাচনেও অংশ নেবেন না, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আর সাক্ষাৎ করবেন না।
স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন কি না এমন প্রশ্নে রাঙ্গা বলেন, আমি বৃহস্পতিবার আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে বসব। দল আমাকে মনোনয়ন দেয়নি, এখন তারা যদি আমাকে নির্বাচন করতে বলেন তাহলে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব।
রওশনপন্থী এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জি এম কাদের নির্বাচনে আসতে চাননি, তিনি বারবার নির্বাচনে না আসার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। এখন জি এম কাদের নির্বাচনে যাচ্ছেন আর রওশন হয়তো গ্যালারিতে বসে থাকবেন, এটাই রাজনীতি। এখন প্রধানমন্ত্রী যদি শেষ মুহূর্তে কোনো উদ্যোগ নেন তাহলে রওশন সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন; না হলে তিনি নির্বাচন থেকে বিরত থাকবেন। গত বছর দীর্ঘদিনের অসুস্থতা শেষে ব্যাংকক থেকে দেশে ফেরেন ম্যাডাম। সে সময়ও এই দুই নেতার দ্বন্দ্বে পার্টি ভাঙার উপক্রম হয়েছিল। এরপর (১৩ ডিসেম্বর, ২০২২) এই দুই নেতাকে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে ডেকে নিয়ে মীমাংসা করে দেন। আমি মনে করি এবারও প্রধানমন্ত্রী শেষ মুহূর্তে একটা উদ্যোগ নেবেন।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করব। এর মধ্যে রওশন এরশাদ ও সাদ এরশাদ চাইলে মনোনয়ন দেব। কিন্তু বহিষ্কৃত কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।
রওশন ও এরশাদপুত্রকে ছাড়া নির্বাচনে গেলে তৃণমূলের কর্মীরা মানবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দেখুন আমরা শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। এখন কেউ যদি নির্বাচনে না আসেন আমাদের তো কিছু করার থাকবে না। তৃণমূলের কর্মীরাও বিষয়টা জানেন এবং বুঝেন। আমি মনে করি না কোনো সমস্যা হবে।