মনোনয়নপত্র জমাদানের সময় বাড়ানোর আবেদন কয়েকটি দলের

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন শেষ হচ্ছে আগামীকাল (৩০ নভেম্বর)। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং তৃণমূল বিএনপি নিজ নিজ দলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে নির্বাচনমুখী কয়েকটি ছোট দল তাদের প্রার্থী নিয়ে এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। তাই দলীয় প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি তারা। এমন পরিস্থিতিতে মনোনয়নপত্র জমাদানের তারিখ পেছানোর জন্য কয়েকটি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আবেদন করা হয়েছে।

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার তারিখ পেছানো হবে কি না– এ নিয়ে ইসির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বুধবার (২৯ নভেম্বর) এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও প্রধান নির্বাচন (সিইসি) কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি।  

তবে ইসির একটি সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপত্র জমাদানের তারিখ পেছানোর আবেদনটি বিবেচনায় রেখেছে কমিশন। সেক্ষেত্রে ২-৩ দিন সময় বাড়াতে পারে।

জানা গেছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বিএনএফ ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটসহ ইতিমধ্যে ইসিতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। ইসিকে দেওয়া চিঠিতে বিএনএফ জানায়, তারা আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের দল  থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। নির্বাচনের তারিখ অপরিবর্তিত রেখে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা এক সপ্তাহ বর্ধিত করা গেলে আরও বহু প্রার্থীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হতো।

অন্যদিকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় সাত দিন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে ইসিতে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট। এতে নিবন্ধিত দলটি জানায়, দেশে গণতন্ত্রের ধারাকে অব্যাহত রাখতে নির্বাচনের বিকল্প নেই। কিন্তু সেই নির্বাচন হতে হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক। আমরা চাই ৩০০ আসনে প্রার্থী প্রদানের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে। সেইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করব সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মনোনয়নপত্র জমাদানের তারিখ আরও সাতদিন বাড়িয়ে দেওয়া হোক।

এর আগে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তফসিল পেছানোর দাবি জানিয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। একইভাবে তফসিল পেছানোর দাবি জানিয়েছে বিএনপি জোট ছেড়ে আসা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। তিনি বলেছেন, জোটবদ্ধ নির্বাচন করতে চাইলে নির্বাচন কমিশনকে জানানোর যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তার সময় শেষ হয়ে গেছে। তবে আমরা আশা করি কমিশন তফসিল পেছাবে। 

ইসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নির্বাচন শেষ করতে চায়। বর্তমান কমিশন কোনোভাবেই সংবিধানের বাইরে যাবে না। তবে রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু আবেদন করেছে সেক্ষেত্রে ভোটের তারিখ ঠিক রেখে মনোনয়নপত্র জমাদানসহ অন্য তারিখ ৩-৪ দিন পেছালে কেনো সমস্যা হবে না। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয় তা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যাবে।

গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত, তা বাছাই হবে ১-৪ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৭ ডিসেম্বর। তার তিন সপ্তাহ পর হবে ভোটগ্রহণ। 

প্রার্থীতা প্রত্যাহারের পর ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ হবে। সেক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমার জন্য ১৪ এবং প্রচারের জন্য ১৯ দিন সময় দেওয়া রয়েছে। ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচার শেষ করতে হয়। অর্থাৎ ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ভোটের প্রচার চালানোর সুযোগ থাকবে। 

এদিকে যে সব রাজনৈতিক দল এখন পর্যন্ত নির্বাচনে আসেনি, তারা যদি আসতে চায় তাহলে ৩০ নভেম্বরের আগে কমিশনকে জানাতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে সংবিধান অনুযায়ী যখন যা করা প্রয়োজন নির্বাচন কমিশন তাই করবে। নির্বাচনের তারিখ পেছানোর সুযোগ নেই। 

তফসিল ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও তৃণমূল বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ২৯৮টি ও জাতীয় পার্টি ২৮৯টি আসনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। তৃণমূল বিএনপি ২৩০ আসনে দলের প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

অন্যদিকে তফসিল বাতিলের দাবিতে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি জোট ও দল আন্দোলন করে আসছে। তাদের দাবি, বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে।

গত ১৬ নভেম্বরও তফসিল ঘোষণার সময় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে সব দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সর্বদা স্বাগত জানাবে। পারস্পরিক প্রতিহিংসা, অবিশ্বাস ও অনাস্থা পরিহার করে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা ও সমাধান অসাধ্য নয়।

সংলাপের বার্তা দেওয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকেও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংলাপ হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরানোর দাবিতে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েও বিএনপি দ্বিধায় ছিল। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে তাদের আলোচনা হয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে নতুন জোট গড়ে বিএনপি ভোটে অংশ নেয়। তবে সব দলের অংশগ্রহণে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠে। বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো ভোটের দিন দুপুরের পর থেকে নির্বাচন বর্জন করেন।