১৯২৩ সালের ২৭ মে নাৎসি জার্মানিতে এক ইহুদি পরিবারে জন্মেছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার।
জার্মানির মোট ইহুদী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ হাজারই পোলিশ-ইহুদী। নাৎসী সরকার তখন প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে জার্মানিকে ইহুদীমুক্ত করার জন্য।
১৯৩৮ সালে ১৫ বছর বয়সেই তাকে পরিবারসহ মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে ভিনদেশের উদ্দেশে পাড়ি জমাতে হয়। পরবর্তীতে পরিবারসহ নিউ ইয়র্কে থিতু হন কিসিঞ্জার।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় কিশোর কিসিঞ্জার দিনে শেভিং ব্রাশের ফ্যাক্টরিতে কাজ এবং জর্জ ওয়াশিংটন হাই স্কুলে নিয়মিত রাত্রীকালীন পড়া চালিয়ে গিয়েছিলেন। এছাড়া সিটি কলেজ অভ নিউ ইয়র্কে পড়ার সময় ১৯ বছর বয়সে কিসিঞ্জারকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স কোরের সাথে কাজ করেন।
বিশ বছর বয়সে নিজের নাম পাল্টে হেইঞ্জ কিসিঞ্জার থেকে হয়ে যায় হেনরি কিসিঞ্জার। সাথে সাথে জুটে যায় মার্কিন নাগরিকত্বও।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক সেমিনার পরিচালনার সুবাদে কিসিঞ্জারের সাথে অনেক আন্তর্জাতিক নেতাদের পরিচয় হয়। রকফেলার ব্রাদার্স-এর সাথেও কাজ করেছেন কিসিঞ্জার। ১৯৫৭ সালে তিনি হার্ভার্ডের লেকচারার এবং ১৯৬২ সালে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।
১৯৬৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে নিয়োজিত হন হেনরি কিসিঞ্জার। নতুন কর্তৃত্ব পেয়েই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন হেনরি কিসিঞ্জার। সে সময় ১৯৭০ এর দশকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অপর নাম ছিল 'হেনরি কিসিঞ্জার'।
ঐ সময়ের যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্ক নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। কিসিঞ্জার সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করেন, যেটা ডেটান্ট নামে পরিচিত। তার প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি (SALT) সম্পাদিত হয়।
হেনরি কিসিঞ্জারের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সাথে ভিয়েতনাম জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। ভিয়েতনামের যুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিল আমেরিকা। ভিয়েতনাম প্রসঙ্গে হেনরি কিসিঞ্জারকে যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দিয়েছেন অনেক সমালোচক।
কারণ, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় প্রতিবেশী কম্বোডিয়ায় নির্বিচার বোমা বর্ষণের অভিযোগে প্রচুর সমালোচনা ও নিন্দার মুখে পড়েন তিনি।
গোপনে তিনি কম্বোডিয়ার কম্যুনিস্ট ঘাঁটিগুলোতে বোমাবর্ষণের নির্দেশ দেন। প্রায় ২.৭ মিলিয়ন টনের সমপরিমাণ বোমা বর্ষণ করা হয় লাওস ও কম্বোডিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে। পুরো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও এত পরিমাণ বোমা ব্যবহার করা হয়নি। দেড় লক্ষের মতো নাগরিক নিহত হলেও কিসিঞ্জার এই সংখ্যাটিকে পঞ্চাশ হাজার বলে উল্লেখ করেন। পরে কংগ্রেসের হস্তক্ষেপে এই সিক্রেট বম্বিং বন্ধ হয়।
যদিও ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ায় তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে সমালোচকরা বলেন যে, কিসিঞ্জার মূলত ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর পরাজয় ঠেকাতে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
খোদ ঘরের পাশের মহাদেশ দক্ষিণ আমেরিকাকেও ছাড়েননি কিসিঞ্জার। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর অ্যালেন্দেকে উৎখাতেও ইন্ধন যুগিয়েছিলেন কিসিঞ্জার।
১৯৭৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন হেনরি কিসিঞ্জার। এই সময় তার ইচ্ছাতেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পরিবর্তন আসে। ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’ (একাধিক রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা) নামে পরিচিত এই কূটনৈতিক প্রয়াসে কিসিঞ্জার তৃতীয় ব্যাক্তি হিসেবে আরব দেশগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন সম্পর্কিত আলোচনায় সহায়তা করেন। সে সময় ১৯৭৩ সালে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে হওয়া ইয়ম কিংপুরের যুদ্ধ থামাতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্মরণ করেন কেউ কেউ।
ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যকার সুসম্পর্কই কিসিঞ্জারকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি ভেবেছিলেন এতে করে উপমহাদেশে সোভিয়েত প্রভাব মারাত্মক বেড়ে যাবে। তাই এই সমস্যা সমাধানে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর এসব কিছু হয়েছিল কিসিঞ্জারের তত্ত্বাবধানে।
তবে ভারত ও বাংলাদেশের কাছে ‘খলনায়ক’ হিসাবেই কুখ্যাত সাবেক এই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সমালোচনার মুখে পড়েছিল কিসিঞ্জারের ভূমিকা। আর এ কারণে নয়াদিল্লির সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছিল ওয়াশিংটনের। কারণ, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
হেনরি কিসিঞ্জার পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সমালোচিত একজন কূটনীতিবিদ। তার প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপই ছিল বিতর্কিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন কূটনীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাঁকে।
তার প্রয়াণের সাথে সাথে আমেরিকার কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় সমাপ্ত হল বলে মনে করছেন অনেকে।
সূত্র: উইকিপিডিয়া ও রোর মিডিয়া