বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে সারা পৃথিবী যখন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্পের ওপর জোর দিচ্ছে সে সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়োজন করা হয়েছে জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৮।
কার্বন নির্গমন কমানো নিয়ে এবারের সম্মেলনে হতে যাচ্ছে জোর আলোচনা। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থেকে ধরিত্রীকে রক্ষায় আজ বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) থেকে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক এই সম্মেলন; যেটি চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
কপ বা কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ হলো জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। বিশ্বের ১৯৭টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনে যুক্ত রয়েছে।
১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে জার্মানির বার্লিনে প্রথম কপ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে কপ-২৮ জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এবারের সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ অনেক বিশ্ব নেতাই অংশ নিচ্ছেন না। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ব্রিটেনের রাজা চার্লসসহ বেশিরভাগ রাষ্ট্রপ্রধান সম্মেলনে যোগ দেবেন। সবমিলিয়ে বিশ্বের ১৫০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া চীনসহ অনেক প্রভাবশালী দেশের প্রধান ছাড়া সারা বিশ্বের ত্রিশ হাজারেরও বেশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাংবাদিকরা এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
জীবাশ্ম জ্বালানি সমূহের মধ্যে অন্যতম জ্বালানি তেল কার্বন নির্গমনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। এর অন্যতম বড় উৎপাদক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। আর সেই দেশেই শুরু হয়েছে কার্বন নির্গমন কমানো নিয়ে আলোচনা। তাই একটি বৃহত্তম জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশে কপ-২৮ সম্মেলনের আয়োজনের বিরোধিতা করে আসছে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা।
তাদের এই প্রতিবাদের মধ্যেই কপ-২৮ সম্মেলনের সভাপতি করা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনকের প্রধান নির্বাহী ড. সুলতান আল-জাবেরকে। তিনি বলেন, আমাদের নষ্ট করার মতো সময় নেই। কার্বন নিঃসরণ কমাতে আমাদের এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বব্যাপী যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। যা মানুষ, জীবন এবং জীবিকা রক্ষা করায় ভূমিকা রাখবে।
বরাবরের মতো এবারের সম্মেলনেও বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল থাকছে। ২২ সদস্যের প্রতিনিধি দলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করা উচিত, নাকি জলবায়ুর ওপর শিল্পের প্রভাব কমাতে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়া উচিত; তা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন রয়েছে। সম্মেলনে সেই বিভাজন এবার আরও স্পষ্ট হতে পারে।
এদিকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন, বন্যা, খরা, দাবানল বেশি হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে; ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অন্তত ১ দশমিক ৬২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তা হলে একবিংশ শতাব্দী শেষ দিকে পৃথিবীর বুক থেকে প্রায় অর্ধশত দেশ সমুদ্রপৃষ্ঠে হারিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার তিনগুন বাড়াতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ লক্ষ্যে সম্মেলন চলাকালে একটি চুক্তি হতে পারে তাদের সঙ্গে। রয়টার্সের বরাত দিয়ে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা বলেন, একশোর বেশি দেশ এই চুক্তির পক্ষে আছে। তবে চীন ও ভারত এখনও পুরোপুরি এর পক্ষে তাদের সমর্থন জানায়নি।