বিশ্বমঞ্চে ক্রিকেটের ক্রেনস

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত ভূ-ভাগ আফ্রিকা মহাদেশ। তারই পূর্বে ভিক্টোরিয়া লেক বিধৌত দেশ উগান্ডা। প্রকৃতি যতখানি হাত খুলে দিয়েছে দেশটিকে, মানুষ ততটা না। ১৯৬২ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর শাসক ইদি আমিনের সময়কালে দুই যুগে অন্তত দুটি গৃহযুদ্ধে আট লাখ মানুষ নিহত হন উগান্ডায়। ১৯৮৬ সালে ইয়াওয়েরি মুসোভেনি গণতান্ত্রিকব্যবস্থায় নির্বাচিত হলেও, সেই থেকে এখনো পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছেন। দেশটির মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ তলানিতে, করের বোঝায় ন্যুব্জ সবাই। এর সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে আছে দুর্নীতি। এত সব দুঃসংবাদের মধ্যেই ক্রিকেট এনে দিয়েছে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত। আফ্রিকা অঞ্চল থেকে বাছাইপর্বের বৈতরণী উতড়ে উগান্ডা জায়গা করে নিয়েছে ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে।

ঐতিহাসিক এই মুহূর্ত আসে বৃহস্পতিবার। বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে রুয়ান্ডাকে ৯ উইকেটে হারানোর মধ্য দিয়ে। আগামী বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসরটি বসতে যাচ্ছে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও যুক্তরাষ্ট্রে। বদল এসেছে ফরম্যাটে। ২০ দেশ নিয়ে চারটি গ্রুপে করে শুরু হবে আসর। সেরা দুটি দল যাবে সুপার এইটে। সেখানে চার দলের দুই গ্রুপে লড়ে তারপর সেমি ও ফাইনাল। নামজাদা দেশগুলোর পাশাপাশি পাঁচটি অঞ্চল থেকে ১২টি দেশ থাকবে ওই ২০ দেশের তালিকায়। 

 


আফ্রিকা অঞ্চল থেকে সুযোগ ছিল দুটি দেশের। তার জন্য বাছাইপর্বের আসর বসে নামিবিয়াতে। অংশ নেয় আফ্রিকার ৭টি দেশ। জিম্বাবুয়ে, নামিবিয়া ও কেনিয়ার মতো ক্রিকেট বিশ্বের পরিচিত মুখগুলো নেমেছিল লড়াইয়ে। সেখানেই জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়াকে হারিয়ে দিয়ে চমক জাগায় উগান্ডা। চমকের ষোলকলা পূর্ণ হয় পঞ্চম আফ্রিকান দেশ হিসেবে উগান্ডা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার মধ্য দিয়ে। আসরে একমাত্র নামিবিয়ার কাছে হার মানে দেশটি। অপরাজিত থেকে উগান্ডার আগেই একই যোগ্যতা অর্জন করে নামিবিয়া। ১৯৯৮ সালে আইসিসির সহযোগী সদস্যের মর্যাদা পাওয়া উগান্ডা কোন জাদুমন্ত্রে বদলে গেল এতটা!

উগান্ডার জাতীয় পাখি ক্রেন। সেখান থেকে দেশটির পুরুষ দলকে ডাকা হয় ‘ক্রিকেটের ক্রেনস’ বলে। লরেন্স মাহাতলেনে, দক্ষিণ আফ্রিকার এই কোচ ক্যারিয়ারের ২৪ বছরের অভিজ্ঞতা সঙ্গী করে উগান্ডার দায়িত্ব নেন ২০২০ সালের জুলাইতে। এর আগে ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা অনূর্ধ্ব ১৯ দলের দায়িত্বে। তার সহযোগী হিসেবে উগান্ডার এই দলটির সঙ্গে ছিলেন জ্যাকসন ওগওয়ান। আশ্চর্যজনকভাবে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ঠিক আগের মাসেই দায়িত্ব ছেড়ে দেন লরেন্স। আফ্রিকার ‘ক্রিকেট ক্রেনস’দের সামলাবার ভার এখন জ্যাকসনের কাঁধে। দায়িত্ব নিয়ে বাছাইপর্ব খেলতে যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপে খেলতে পারার স্বপ্নই ভালো ক্রিকেট উপহার দিতে প্রেরণা হিসেবে যথেষ্ট। আমাদের হয়তো হারানোর কিছুই নেই তবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোই যে আমাদের লক্ষ্য সেটা দলের সবাই বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আজ আমরা যেখানে আছি, সেখানে আসতে সাহস জুগিয়েছে।’

ক্রিকেটের ক্রেনসরা কেবল সাহস দেখিয়ে থামেনি, জয় করেছে; শুধু এই বাছাইপর্ব না, ধারাবাহিকভাবে গত চার বছর ধরে। আইসিসি সিদ্ধান্ত নেয় ২০১৯ সাল থেকে সহযোগী দেশগুলোর খেলা টি২০ ম্যাচগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচের মর্যাদা পাবে। মে মাসে প্রথম আন্তর্জাতিক টি২০ ম্যাচে বতসোয়ানাকে হারিয়ে সফরের সূচনা করে উগান্ডা। ২০১৯-২০ সালে আরও ছয়টি ম্যাচ খেলে হারে চারটিতে। এরপর দায়িত্ব নেন লরেন্স। বদলাতে শুরু করে ক্রিকেট আচরণ। ২০২১ সালে ২২টি ম্যাচের মধ্যে ১৬টিতেই জেতে উগান্ডা। ২০২২ সালে খেলা ২৪ ম্যাচে জয় ১৮টিতে। আর এ বছর ২৭ ম্যাচের ২৪টিতেই জিতেছে ক্রিকেটের ক্রেনসরা। এমন ধারাবাহিক নৈপুণ্যের ফল হিসেবেই সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপে খেলবে দেশটি।

দেশটির ক্রিকেটের উত্থানে বড় অবদান রয়েছে রাজধানী কাম্পালার আজিজ দামানি স্পোর্টস ক্লাবের। ক্রিকেট দিয়ে দেশের তারুণ্যকে সুপথে রাখার প্রত্যয়ে ব্যাপক কাজ করেছে ক্লাবটি। উগান্ডার ব্যাটিং লাইনআপের বড় নাম পাকিস্তানে বেড়ে ওঠা রিয়াজাত আলী শাহ উগান্ডা জাতীয় দলে এসেছেন এই ক্লাব থেকেই। পাকিস্তানের বিলাল হাসানও ক্রিকেটের ডাকেই খেলছেন উগান্ডায়। একই রকম রোনাক প্যাটেল, দিনেশ নাকরানিরা ভারত থেকে এসে এখন উগান্ডার অংশ। সম্মিলিত এই দলটা বিগত সময়গুলোতে একসঙ্গে ক্রিকেট খেলছেন। তাদের মধ্যে বোঝাপড়া তাই দারুণ। এমন বড় আসরের আগে কোচের চলে যাওয়া তাই কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি দলটার সামনে।

রুয়ান্ডার সঙ্গে ম্যাচের আগে উগান্ডার অধিনায়ক ব্রায়ান মাসাবা তার দলকে আবেগ সামলে রাখতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘লক্ষ্য ঠিক রেখে দায়িত্ব সম্পন্ন করতে হবে।’ উগান্ডার ক্রিকেটাররা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পন্ন করেছেন। এখন তাদের উৎসবে মাতার সময়।