দুর্নীতি কমাতে না পারলে টেকসই হয় না উন্নয়ন

অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিকল্প নেই। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি না থাকলে মুনাফা নিশ্চিত হয় না। দুর্নীতি কমাতে না পারলে উন্নয়ন টেকসই করা সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্যই নির্বাচন থাকা দরকার। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ কী চায় তা জানা যায়।

গতকাল বৃহস্পতিবার ‘জবাবদিহিতা ও টেকসই উন্নয়ন : বাস্তবায়ন অগ্রগতি’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমন মন্তব্য করেন সদ্য সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম। পেশাদার নিরীক্ষকদের শিক্ষণ ইনস্টিটিউট আইসিএবি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটন যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আইসিএবি মিলনায়নে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বক্তারা বলেন, বেসরকারি কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জন করা। তবে সার্বিক টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে সামাজিক ও পরিবেশগত দিকগুলো বিবেচনায় রাখা উচিত এবং এ জন্য তারা কী করছে সে বিষয়ে বার্ষিক প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা উচিত।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামসুল আলম বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি না থাকলে মুনাফা নিশ্চিত হয় না। তেমনি টেকসই উন্নয়নের জন্যও জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার। দুর্নীতি কমাতে না পারলে উন্নয়ন টেকসই করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শামসুল আলম বলেন, জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের (এমডিজি) পর এখন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কাজ করছে সরকার। এখানে যে ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া ১১টি প্রস্তাবের মধ্যে ১০টির প্রতিফলন আছে। কভিড-১৯ মহামারীর পর ইউক্রেন যুদ্ধ এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে কিছুটা সমস্যা তৈরি করেছে। তারপরও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, যেমন ভারত ও পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে, ১৯১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০১তম।

তিনি বলেন, আমাদের এ অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পেশাদার নিরীক্ষকরা বেসরকারি খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশের স্বার্থে তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, টেকসই উন্নয়নের ধারণা বেশিদিনের না হলেও আমরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন টেকসই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া নিয়ে যেমন উদ্বেগ আছে, তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টেকসই রিপোর্টিং-পদ্ধতিতে ঘাটতি আছে, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আশার কথা, অনেক প্রতিষ্ঠান টেকসই প্রতিবেদন দেওয়া শুরু করেছে। টেকসই প্রতিবেদন এবং নিশ্চয়তা এজেন্ডায় অর্থ ও নিরীক্ষা পেশাদারদের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।

সেমিনারে অংশ নিয়ে আইসিএবির সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান বলেন,  সরকার থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাই উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ধারাকে টেকসই করতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের লক্ষ্য ধরে রাখতে পরিবেশগত, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক চাহিদাগুলোও বিবেচনায় রাখতে সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতন হচ্ছে।

ডিএসইর চেয়ারম্যান ড. হাফিজ মুহম্মদ হাসান বাবু বলেন, উন্নয়নের ধারা দীর্ঘস্থায়ী না  হলে তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সব ধরনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না বলে মত দেন তিনি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটনের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড গভর্নম্যান্টের অ্যাকাডেমিক প্রোগ্রাম লিডার ড. ইয়ানকা মোজেস। তিনি বলেন, কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকা একক কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, এটা বৈশি^ক সমস্যা। জবাবদিহি শুধু কী করছেন, তার ওপর নয়, কী করার কথা ছিল, কিন্তু করছেন না, তার ওপরও দরকার।

ইয়ানকা মোজেস বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো মুনাফার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে বটে, কিন্তু এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাকে নিয়ে কাজ করলে এ লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের উন্নয়ন হয়। এসডিজির দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব, ভালো স্বাস্থ্য, ভালো শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা, সুপেয় পানি, শোভন কাজ, পরিবেশ রক্ষা করে উৎপাদন, শান্তি, সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছে। একটি কোম্পানি যখন বেশি বেশি কর্মী নিয়োগ করে, তখন একদিকে দারিদ্র্য হ্রাস ও ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার কাজে সহায়তা করে। আবার কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যখন দক্ষতা বৃদ্ধি করে, তখন শোভন কাজের লক্ষ্যও অর্জন হয়। অন্য লক্ষ্যগুলোও কোনো না কোনোভাবে সামাজিক, পরিবেশগত বা জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন কোম্পানির উন্নয়ন ও মুনাফায় বাধা সৃষ্টির জন্য নয় এমন মত দিয়ে বাংলাদেশে রানা প্লাজার ধসের পর অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের মতো ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতা জোট গঠনেরও প্রসঙ্গ তোলেন ইয়ানকা মোজেস। তিনি বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আগে থেকে সঠিক রীতিনীতি মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে জলবায়ু ঝুঁকি যেমন সহজে মোকাবিলা করতে পারবে, তেমনি আইনগত ও ব্যবসা পরিবেশে আগামীর সম্ভাব্য পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিও মোকাবিলায় সক্ষম হবে।

পরবর্তী সময়ে প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এ টি এম তারিকুজ্জামান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ প্রমুখ।