আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। দেখিনি সে সময়ের মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট, ত্যাগ, সংগ্রাম। দীর্ঘ ৯ মাসের সে গল্পগুলো বলতে পারেন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধাদের যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তারা। তাদের কাছে আমরা বিজয়ের এই মাসে শুনব মুক্তিযুদ্ধের গল্প
আমি ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির গবেষণা সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। দেশ তখন আন্দোলনে উত্তাল। ’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকাজুড়ে গণহত্যা চালায়। সেসব ছিল ভীষণ আতঙ্কের দিন। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর জন্য সরকারি অফিসগুলোতে কাজকর্ম চলতে থাকে। আমাকেও নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত অফিস করতে হতো। সেসময় অনেকেই আমার মতো সরকারের অধীনে চাকরি যেমন করেছেন তেমনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন। তবে ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আমার বাবা-মা রাজশাহীতে ছিলেন। সেখানে অনেক বিহারি ছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের অনেক অত্যাচার করত। বাড়িঘর সম্পত্তিতে আগুন লাগিয়ে দিত। আমি তখন বাবা-মাকে বললাম তোমরা ঢাকায় চলে আসো। আমার এখানে চলে আসো।
সে সময়ে আমার নতুন চাকরি। আর আমি এমন অবস্থায় ছিলাম যে, চাকরিটি আমার লাগবে। তাই আমি নিয়মিত অফিস করতাম। আর অনেকেই বলেছিলেন যে, বিপদের আশঙ্কা নেই। চাকরি চালিয়ে যেতে।
তো, আমি নিয়মিত চাকরি করতাম। একদিন কবি হূমায়ুন কবীর বললেন যে, আপনার তো চাকরি আছে। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য তহবিল জড়ো করছি। যারা যুদ্ধ করছে তাদের এখন খুব অর্থাভাব, আপনি প্রতিমাসে কিছু টাকা দেবেন!
আমি বললাম, বলেন কত করে দেব? উনি বললেন, দুইশ করে দিয়েন।
আমি প্রতিমাসে বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুইশ টাকা দিয়ে দিতাম। উনিই এসে নিয়ে যেতেন। তারপর শীতের সময় বললেন, যারা যুদ্ধে গেছে তাদের তো শীতবস্ত্র নেই। এক কাপড়ে গিয়েছে। কিছু শীতবস্ত্র দিতে হবে। কিনে দিতে হবে না। বাড়ির পুরনো কাপড় দিলেই হবে। আত্মীয়স্বজনদেরও বলতে বললেন। আমি বললাম, ঠিক আছে। আত্মীয়স্বজনকে বলতেই সবাই এত এত কাপড় দিয়ে গেল। সেগুলো ওনার দেওয়া সুটকেসে ভরে আমি বাড়ি থেকে একটু সামনে নিয়ে ওনার বলা জায়গায় নিয়ে গেলাম। উনি সেখান থেকে নিয়ে গেলেন। এভাবেই কেটেছে একাত্তর আমাদের ঢাকায়। যে যেভাবে পেরেছে কিছু করার চেষ্টা করেছে। কেউ ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে, যারা অবরুদ্ধ ঢাকায় ছিল তারা সেখান থেকেই কিছু করার চেষ্টা করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। বঙ্গবন্ধুর আহ্বান অনুসারে, যার যা আছে তাই নিয়েই দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক
সভাপতি, বাংলা একাডেমি